


পঁয়ত্রিশ বছর আগে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে মাত্র ১৯ বছর বয়সী বাংলাদেশের সামনে নতুন এক অভিযাত্রার সূচনা হয়েছিল। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিযাত্রা। এরপর পদ্মা-মেঘনা-যমুনা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে; স্বপ্ন দেখার পালা ফুরায়নি। এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে কতটা চেষ্টা হয়েছে আর কতটা বিঘ্ন সৃষ্টি করা হয়েছে, সে হিসাব করে এখন লাভ নেই। মধ্যখানে শুধু অধরা স্বপ্নের বেচাকেনায় ঘুরপাক খেয়েছে দেশ; ঝরে গেছে কত প্রাণ!
দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর গণতান্ত্রিক রূপান্তরে ৩৫ বছর সময় নিঃসন্দেহে খুব বেশি নয়। কিন্তু রূপান্তর প্রক্রিয়াটি কতটুকু এগিয়েছে– সে প্রশ্ন করাই যায়। সাড়ে তিন দশকে গণতন্ত্র শুধু নাগরিকের লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেওয়ার অধিকার; এটুকুই আমরা জেনেছি। যারা নির্বাচনে জিতেছেন তারা গণতন্ত্রের বিজয় দেখেছেন। যারা পরাজিত হয়েছেন তারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে মাঠে নেমেছেন।
নির্বাচন অবশ্যই গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, যদি তা সুষ্ঠু হয়। কিন্তু এর বাইরে এ শাসন ব্যবস্থার যে আরও কিছু মানদণ্ড, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে, সেগুলো যেন সযত্নে নাগরিকের সামনে থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। মানবাধিকার, আইনের শাসন, জবাবদিহি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও সমাজ, স্বাধীন সংবাদ মাধ্যম, নাগরিকের মর্যাদা ও নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। বরং এমন ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেখানে নাগরিকের মূল্যই সবচেয়ে কম। ভোটের বাক্সে বন্দি রাখা গণতন্ত্রকে রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাই করা হয়নি।
তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী ’৯০-এর ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করলে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘গণতন্ত্রকে আমরা শক্তিশালী রূপ দিতে চাই।’ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘আজ গণতন্ত্রের বিজয় নিশ্চিত হতে চলেছে’ (সংবাদ, ৭ ডিসেম্বর, ১৯৯০)। পরিহাসের বিষয়, এর পরের ৩৫ বছরের প্রায় পুরোটা সময় এই দুটি দল সরকার পরিচালনা করেছে। কিন্তু গণতন্ত্র শক্তিশালীও হয়নি, তার বিজয়ও নিশ্চিত হয়নি। এমনকি যে নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সেই নির্বাচনও আর সুষ্ঠু হচ্ছে না। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ’৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরের নির্বাচনেই উল্টোপথে যাত্রা শুরু। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারে থাকা দলের ব্যাপক অনীহা বরাবরই লক্ষণীয়। প্রতিটি নির্বাচন ঘিরে দলগুলোর তীব্র বৈরিতা দেশকে বারবার ঝুঁকিতে ফেলেছে; গণতন্ত্রের পথকে প্রায় রুদ্ধ করে তুলেছে।
এ সুযোগে দেখা মিলেছে ছদ্ম শাসনের। যেমনটি ঘটেছে ২০০৭ সালে। ১/১১-খ্যাত ওই ঘটনায় দুই বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সামনে রেখে চলেছে কার্যত সেনাশাসন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারকে সেনাবাহিনী মাঠে থেকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
পার্থক্য হলো, ওয়ান-ইলেভেনে নির্বাচন আদায়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে একযোগে আন্দোলন করতে হয়েছিল। আর এবার সেনাপ্রধানের কাছ থেকেই প্রথম নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়ের ঘোষণা আসে। ৫ আগস্টের পর বিএনপি বারবার নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছিল। এ নিয়ে সরকারের নীরবতায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে সেনাপ্রধানই প্রথম ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন হতে পারে বলে জানান। অবশ্য তাঁর এ মন্তব্যকে সরকারের তরফে ‘ব্যক্তিগত মত’ বলে উল্লেখ করা হয়। ১/১১-তে সংস্কারের নামে রমরমা চলা মাইনাস টু ফর্মুলা এখন মাইনাস ফোরে উন্নীত হয়েছে, এমন কথাও শোনা যায়।
শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ দশকটি ছিল কঠোর নিয়ন্ত্রিত। পরপর তিনটি সাজানো একতরফা নির্বাচন, গৃহপালিত বিরোধী দল, কঠোরভাবে বিরোধী দল ও মত দমন এবং অলিগার্কের ব্যাপক বিকাশে গণতন্ত্র রুদ্ধ হয়ে পড়ে। গণঅভ্যুত্থানের পর তা অর্গলমুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছিল। তবে ১৬ মাস পর মনে হচ্ছে, সে আশার আলো বরং উজ্জ্বল হওয়ার পরিবর্তে টিমটিম করে জ্বলছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি, মব সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, বিনা বিচারে আটক, মতপ্রকাশে বাধা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, মধ্যরাতে সাংবাদিককে তুলে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। নানা বাহানায় আকারে ইঙ্গিতে বা প্রকাশ্যেও নির্বাচনবিরোধী কথা এখনও শোনা যায়।
শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরোধিতা করে গণতন্ত্রের দাবিতে যেসব দল সক্রিয় ছিল, ’২৪-এর ৫ আগস্টের পর তারাই অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে। এর পরও ১৬ মাস ধরে বিএনপিকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য লড়তে হচ্ছে। অনেক জল ঘোলা করে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন দেওয়ার কথা বলা হলেও রাজনীতিকদের কথায় মাঝেমধ্যেই ভিন্ন কিছুর আশঙ্কার ইঙ্গিত মেলে।
গণতন্ত্রের বিকাশে দরকার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবল নিয়মতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কিন্তু প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে তীব্র বৈরিতা ও অবিশ্বাস রাজনীতির সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ায় গণতন্ত্র এখনও থিতু হতে পারেনি। অবশ্য গণতন্ত্রের জন্য যতটুকু লড়াই ফলপ্রসূ হয়েছে, তা হয়েছে এ দুটি দলেরই বদৌলতে এবং অগণতান্ত্রিক শক্তির যত আঘাত এসেছে, তাও এসেছে তাদের ওপরেই।
দুই মাস পর হয়তো একটি নির্বাচন হবে। কিন্তু গণতন্ত্র কতটা ফিরবে, বলা মুশকিল। ’৯০-এর রূপরেখা তিন জোট সম্মত হয়েই ঘোষণা করেছিল, তা কার্যকর হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই সনদ নামে যে সংস্কার প্রস্তাব গণভোটে পাঠাচ্ছে, সেটিকে প্রতারণামূলক বলে বিএনপি সমালোচনা করেছে। কাউকে ঠেকানো আর কাউকে প্রাধান্য দেওয়ার যে অভিযোগ, তার জবাবও মেলেনি। একরাশ অবিশ্বাসের মধ্যে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ‘বোঝা’ নিয়ে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা কতটা আন্তরিকতার প্রকাশ ঘটায়, সেটাই এখন দেখার পালা। আদনান মনোয়ার হুসাইন: সহকারী বার্তা সম্পাদক, সমকাল













