১১ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অর্থনীতি

জ্বালানির দাম-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্ব অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ জানাল আইএমএফ

জ্বালানির দাম-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্ব অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ জানাল আইএমএফ

‘বিশ্ব অর্থনীতি এখন দুই বিপরীতমুখী শক্তির টানে রয়েছে। একদিকে জ্বালানি সরবরাহে নেতিবাচক ধাক্কা, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ঘিরে বিনিয়োগ ও চাহিদার ইতিবাচক প্রবাহ। কিন্তু বাস্তবে এ দুই শক্তির সম্মিলিত প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অর্থনীতিতে সমানভাবে পড়ছে না।’

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এ কথা বলেন। তার মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করা তৃতীয় প্রধান কারণ সরকারি ঋণের রেকর্ড পরিমাণ ও ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়া।

গত বুধবার (৭ অক্টোবর) ‘২০২৬ অ্যানুয়াল মিটিংস কার্টেন রেইজার’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। আইএমএফের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভার আনুষ্ঠানিক সূচনাপর্বের এ অনুষ্ঠানে সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারত্নমের সঙ্গে ফায়ারসাইড চ্যাটেও অংশ নেন তিনি। বক্তব্যে বৈশ্বিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি ও সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন জর্জিয়েভা।

আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আইএমএফের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে যে ধাক্কা তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে এর প্রভাব বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জর্জিয়েভা বলেন, আমাদের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে দেখা যাবে, বসন্তকাল থেকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। তবে সামগ্রিক গড়ের আড়ালে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য।

তিনি বলেন, এ বছর প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিগুলোতে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পঞ্চম বছরে, উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ চলছে অষ্টম মাসে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আরও অনেক সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। এসব সংঘাত মানুষের জীবন ধ্বংসের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও ক্ষতি করছে।

অন্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশেও প্রবৃদ্ধিতে তুলনামূলক ছোট ও বিচ্ছিন্ন আঘাত দেখা যাচ্ছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে এমন অর্থনীতি, যেগুলো জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত নীতিগত সক্ষমতা নেই।

তবে কয়েকটি দেশে প্রবৃদ্ধির হার বাড়তেও দেখা যাবে। আর এখানেই আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা।

জর্জিয়েভা বলেন, এআইকে ভালোবাসুন, অপছন্দ করুন কিংবা ভয় পান- এআই এখন বাস্তবতা। বিশ্ব অর্থনীতিতে বিভিন্ন দেশের আপেক্ষিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নির্ধারণে এটি দ্রুতই গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে।

জর্জিয়েভা বলেন, এআই খাতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ জিডিপির যে অনুপাতে হচ্ছে, তা রেলপথ নির্মাণ, বিদ্যুৎ গ্রিড স্থাপন কিংবা টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সময় হওয়া বিনিয়োগের মাত্রায় পৌঁছাবে এবং সম্ভবত তা ছাড়িয়েও যাবে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, এআই হার্ডওয়্যার ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিপণ্য এখন বিশ্বের মোট পণ্য বাণিজ্যের এক-দশমাংশেরও বেশি এবং এই অংশ ক্রমেই বাড়ছে।

তবে এই প্রক্রিয়া আজকের এআইনির্ভর অর্থনীতিগুলোকে এগিয়ে নিলেও বিশ্বের অধিকাংশ দেশের অর্থনীতিকে তা অনেকাংশে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। ফলে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।’

এআইয়ের প্রসার জ্বালানির চাহিদাও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর এখানেই আসে আমাদের বার্ষিক সভায় আলোচনার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- জ্বালানির ক্রমবর্ধমান ব্যয়। এর সঙ্গে বাড়ছে সার, খাদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্প উপকরণের দাম। এ বছর শক্তিশালী এল নিনোর কারণে খাদ্যনিরাপত্তা আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এসব কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমছে।

এখন পর্যন্ত জ্বালানির দামের ধাক্কা বড় হলেও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা, মজুত জ্বালানি বাজারে ছাড়া, সরবরাহব্যবস্থার দ্রুত অভিযোজন এবং চাহিদা ও সরবরাহের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।

তবে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি সরবরাহের প্রবাহ পুনরুদ্ধার এখনো অনিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও, ঝুঁকি, উচ্চ পরিবহন ব্যয় এবং অন্য কারণের প্রতিফলন হিসেবে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলার রয়েছে।

সরকারি ঋণের বৃদ্ধি বড় উদ্বেগ

জর্জিয়েভা বলেন, এখন আমরা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করা তৃতীয় প্রধান কারণটির দিকে আসছি- অতিরিক্ত রাজস্ব ঘাটতি, সরকারি ঋণের রেকর্ড পরিমাণ ও ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়া।

বিশ্বের সরকারি ঋণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে কোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে। ঋণের এই বোঝা শিগগির জিডিপির ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে উন্নত অর্থনীতিগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এসব দেশের কয়েকটিতে মোট সরকারি ঋণের পরিমাণও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। উদীয়মান বাজারের দেশগুলোর ঋণ-জিডিপি অনুপাত সাধারণত তুলনামূলকভাবে কম এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে তা আরও কম।

তবে এ তুলনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। উন্নত অর্থনীতির তুলনায় উদীয়মান বাজার ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কম, কারণ এসব দেশের রাজস্ব আয়ও তুলনামূলকভাবে কম।

সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপ

আন্তজাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রধান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ও সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমে মুদ্রানীতি নিয়ে বলি। অনেক দেশেই দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি সাড়ে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে। দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা এখনো স্থিতিশীল থাকায় আমরা কিছুটা স্বস্তি পাই।

এআই অবকাঠামো নির্মাণের ব্যাপক উত্থান মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করছে। জ্বালানি ও খাদ্যের ধাক্কাও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে। শুল্ক, প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় ও উচ্চ সরকারি ঋণও মূল্যস্ফীতির কারণ হতে পারে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক উচ্চ মূল্যস্ফীতির অভিজ্ঞতাও মানুষের স্মৃতিতে এখনো তাজা।

এ অবস্থায় অনেক দেশের মুদ্রানীতিতে সতর্কভাবে কঠোর অবস্থান নেওয়ার উপযুক্ত সময়। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংক অব জাপান সুদের হার বাড়িয়ে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছে, যা যথাযথ পদক্ষেপ। এতে ভবিষ্যতে নীতি সুদের হার নিয়ে বাজারের প্রত্যাশাতেও পরিবর্তন এসেছে।
জর্জিয়েভা বলেন, এআই খাতে অর্থনৈতিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রীভবন বাড়ছে। তাই মনে রাখা দরকার- নতুন প্রযুক্তির স্বল্পমেয়াদি প্রভাবকে আমরা সাধারণত বেশি মূল্যায়ন করি, আর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে কম মূল্যায়ন করি। এআই অবকাঠামোর বর্তমান উত্থান থেকে এর সুফল বাস্তবে পাওয়ার মধ্যবর্তী সময়েই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

কোম্পানিগুলোর শক্তিশালী আয় শেয়ারের দাম ও সম্পদের মূল্য বাড়াচ্ছে। তবে আয় প্রত্যাশার চেয়ে কম হলে হাইপারস্কেলার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চ ঋণভার এবং বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারে থাকা বিপুল বিনিয়োগ সেই হতাশাকে ব্যাপক অর্থনৈতিক ধাক্কায় রূপ দিতে পারে।