২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন কানাডার লেখক অ্যান কারসন। ‘ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রাণবন্ত সংলাপের মিশেলে তার দুঃসাহসিক ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্ম সমকালীন সাহিত্যের নতুন রূপরেখা তৈরি করেছে’ বলে উল্লেখ করেছে নোবেল কমিটি। আর সে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) নোবেল প্রাইজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া পোস্টে বলা হয়, অ্যান কারসন ১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টোতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালে ক্লাসিকস বা ধ্রুপদী সাহিত্যে ‘ওডি এত আমো এরগো সাম’ শীর্ষক তার গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। পেশাগত জীবনের পুরোটাজুড়ে কবিতা রচনার পাশাপাশি অনুবাদকর্ম এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন তিনি।
কারসনের সাহিত্যের মূল উপজীব্যই হলো শব্দের প্রতি ভাষাতাত্ত্বিকের তীব্র আকর্ষণ এবং নতুন অর্থের সন্ধানে কবির আকুলতার এক অপূর্ব মিলন। কার্সন নিজেও উল্লেখ করেছেন, শব্দের মূল উৎসই তার যাবতীয় সৃষ্টির প্রেরণা।
প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য থেকে তার অনুবাদগুলোকে মূল রচনার মতোই স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সাহিত্যকর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সাফোর খণ্ডিতাংশের ব্যাখ্যানুবাদ ‘ইফ নট, উইন্টার’ (২০০২), এবং সোফোক্লিসের ‘ইলেক্ট্রা’ (২০০১) ও ‘অ্যান্টিগোনে’ (২০১৫) এবং ইউরিপিডিসের ‘বাকাই’ (২০১৫)-এর মতো ট্র্যাজেডিগুলোর রূপান্তর। নব্বইয়ের দশকে কারসন কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এগুলোর মধ্যে ‘গ্লাস, আয়রনি, অ্যান্ড গড’ (১৯৯৫) গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ‘দ্য গ্লাস এসে’ অন্যতম।
একই দশকে প্রকাশিত হয় কারসনের অন্যতম সেরা সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত কাব্য-উপন্যাস ‘অটবায়োগ্রাফি অব রেড: আ নভেল ইন ভার্স’ (১৯৯৮)। ধ্রুপদী সাহিত্য ঐতিহ্যকে সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে রূপদানের ক্ষেত্রে তার যে অসামান্য দক্ষতা, এটি তারই এক উজ্জ্বল নিদর্শন। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের গ্রিক কবি স্তেসিকোরোসের ডানাযুক্ত লাল রাক্ষস ‘জেরিয়ন’-কে কেন্দ্র করে লেখা কবিতার খণ্ডাংশগুলোকে ভিত্তি করে আধুনিক ভাষা ও ভাবাবেগের নিপুণ প্রয়োগে তিনি এটি রচনা করেছেন।
লেখালেখির জীবনজুড়েই অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে রচনার নিত্যনতুন দুয়ার উন্মোচন করেছেন কারসন। এক্ষেত্রে ‘সাহিত্যিক রূপরেখা’ বা স্কেচিং তার কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘ফ্লোট’ গ্রন্থটি এর অন্যতম সাক্ষী। বিভিন্ন বিষয়ের ওপর লেখা ২২টি ছোট পুস্তিকার সমন্বয়ে গঠিত বইটি পাঠক নিজের ইচ্ছেমতো যেকোনও ক্রমে পড়তে পারেন।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘রং নরমা’ গ্রন্থটি বিভিন্ন পাঠ্যরীতির একটি বৈচিত্র্যময় সংমিশ্রণ। এতে বিভিন্ন শিল্প ও একাডেমিক ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছেন কারসন। দৃশ্যশিল্পী, নৃত্যপরিচালক, অপেরা ও নাট্য পরিচালকদের সঙ্গে তার যৌথ সৃষ্টিশীল কাজগুলো প্রমাণ করে, প্রথাগত সাহিত্যিক প্রত্যাশা ও নিয়মনীতিকে কতটা স্বাধীন ও মুক্তভাবে দেখেছেন তিনি। আর এ কারণেই ১৯৯০-এর দশক থেকে আন্তর্জাতিক শিল্প ও সাহিত্য অঙ্গনে তার কাজ এতটা অসামান্য প্রভাব ও গুরুত্ব বিস্তার করে চলেছে।
প্রসঙ্গত, গত বছর সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন হাঙ্গেরির ঔপন্যাসিক ও চিত্রনাট্যকার লাসলো ক্রাসনাহরকাই। আর কারসনের আগে প্রথম কানাডিয়ান হিসেবে ২০১৩ সালে সাহিত্য নোবেল অর্জন করেছিলেন ছোটগল্পকার অ্যালিস মানরো।

রসায়নে নোবেল পেলেন ফ্রান্সের অঁরি কাগান এবং জাপানের কেনসো সোআই
চলতি বছর রসায়নে নোবেল পেয়েছেন ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি কাগান এবং জাপানের বিজ্ঞানী কেনসো সোআই। অণুসমূহের মিরর ইমেজ সংক্রান্ত গবেষণা, জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অরৈখিক প্রভাব এবং অসমমিত সংশ্লেষণে স্ব-অনুঘটনের ভূমিকা আবিষ্কারের জন্য তাদের যৌথভাবে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে। তাদের এই গবেষণা চিকিৎসাক্ষেত্রে ওষুধ তৈরির উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) নোবেল জুরি এক বিবৃতিতে জানায়, ‘অসমমাত্রিক জৈব সংশ্লেষণে নন-লিনিয়ার ইফেক্টস এবং স্ব-অনুঘটন আবিষ্কারের জন্য’ তাদের এই সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞানী কাগান ফ্রান্সের অর্সে অবস্থিত ‘ইউনিভার্সিটি প্যারিস-সুদ’-এর সঙ্গে যুক্ত এবং ৯৫ বছর বয়সী বিজ্ঞানী সোআই টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেলে সুইডেনের স্টকহোমে অবস্থিত রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস বিজয়ীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে।
গত বছর রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তিন বিজ্ঞানী। বায়ুমণ্ডল থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস শোষণ বা মরুভূমির আবহাওয়া থেকে জলীয় বাষ্প আহরণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী এক বিশেষ আণবিক কাঠামো উদ্ভাবনের জন্য তাদের এই পুরস্কার দেয়া হয়েছিল।
চলতি বছর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল ঘোষণার মধ্য দিয়ে নোবেল মৌসুম শুরু হয়। গত সোমবার (৫ অক্টোবর) যৌথভাবে তিন বিজ্ঞানীকে এ পুরস্কার দেয়া হয়। তাদের উদ্ভাবন আলোর সাহায্যে মস্তিষ্কের কার্যাবলী উন্মোচনের পথ সুগম করেছে। এরপর মঙ্গলবার পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান এক বিজ্ঞানী। বিরল প্রজাতির নিউট্রিনো রহস্য উন্মোচনে অবদান রেখেছেন তিনি।

পদার্থবিজ্ঞানে এককভাবে নোবেল পেলেন ফ্রান্সিস হালজেন
চলতি বছর পদার্থবিজ্ঞানে এককভাবে নোবেল পেয়েছেন বেলজিয়ামের বংশোদ্ভুত মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন। মহাকাশ থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তকরণ এবং আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাকে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস নোবেলজয়ী হিসেবে কণাবিষয়ক পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেনের নাম ঘোষণা করে। নোবেল কমিটি জানিয়েছে, ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং জ্যোতির্পদার্থগত উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারে নির্ণায়ক অবদানের’ জন্য হালজেনকে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে।
নিউট্রিনো হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও প্রায় ভরহীন কণা, যা সাধারণ পদার্থের সঙ্গে খুব কমই মিথস্ক্রিয়া করে। ফলে এগুলো শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। মহাবিশ্বের দূরবর্তী ও শক্তিশালী বিভিন্ন উৎস সম্পর্কে জানতে নিউট্রিনোর গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ।
আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি অ্যান্টার্কটিকার বরফের প্রায় দেড় কিলোমিটার গভীরে স্থাপন করা একটি বিশাল বৈজ্ঞানিক গবেষণা ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করা হয়।
এ বছরের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, যা একাধিক বিজয়ী থাকলে তাদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। তবে এ বছর পুরস্কারটি এককভাবে পেয়েছেন ফ্রান্সিস হালজেন।
পদার্থবিজ্ঞানের পুরস্কারটি বিজ্ঞানের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়। এর আগে এ পুরস্কার পেয়েছেন আলবার্ট আইনস্টাইন, মেরি কুরি, পিয়েরে কুরি, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ও নিলস বোরের মতো বিজ্ঞানীরা।
গত বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছিলেন জন ক্লার্ক, মিশেল ডেভোরে ও জন মার্টিনিস। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য পরীক্ষার মাধ্যমে দেখানোর জন্য তাদের এ পুরস্কার দেয়া হয়।

চিকিৎসায় নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী
২০২৬ সালের নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণা শুরু হয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞান দিয়ে। চিকিৎসাবিদ্যায় অনবদ্য অবদান রাখায় চলতি বছর যৌথভাবে নোবেল পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির তিন চিকিৎসাবিজ্ঞানী। গত সোমবার ০৫ অক্টোবর চলতি বছর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।
২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন কার্ল ডেইসেরথ, পিটার হেগেমান ও জর্জ নাগেল। আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল এবং অপটোজেনেটিকস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের জন্য এই তিন বিজ্ঞানীকে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, প্রতিবছর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করে সুইডেনের স্টোকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট। এবারের চিকিৎসাবিজ্ঞানের পুরস্কারের মধ্য দিয়ে চলতি বছরের নোবেল পুরস্কার ঘোষণা শুরু হলো।
এর আগে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মেরি ব্রুনকো ও ফ্রেড র্যামসডেল এবং জাপানের শিমুন সাকাগুচিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। ‘পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স’ বা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা কীভাবে নিজস্ব কোষ ও বাইরের ক্ষতিকর উপাদানের মধ্যে পার্থক্য করে—এ বিষয়ে তাদের আবিষ্কারের জন্য এই পুরস্কার দেয়া হয়েছিল।
এর আগে ২০২৪ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের দুই চিকিৎসাবিজ্ঞানী ভিক্টর অ্যামব্রোস ও গ্যারি রাভকুনকে। মাইক্রো আরএনএ আবিষ্কার এবং পোস্ট ট্রান্সক্রিপশন জিন নিয়ন্ত্রণে অবদান রাখায় তাদের ওই পুরস্কার দেয়া হয়েছিল।
আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে সুইডেনের রাজা কার্ল ষোড়শ গুস্তাফ বিজয়ীদের হাতে নোবেল পদক তুলে দেবেন। পরে স্টকহোম সিটি হলে অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী নোবেল ভোজ। প্রতিটি পুরস্কারের সঙ্গে ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা অর্থমূল্যের পুরস্কার দেয়া হয়, যা ১০ লাখ ইউরোর কিছু বেশি বা ১২ লাখ ইউ এস ডলারের সমান।
প্রসঙ্গত, ১৯০১ সাল থেকে দেয়া হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার নোবেল। এ পুরস্কারটির নামকরণ করা হয়েছে সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের নাম অনুসারে। ঊনবিংশ শতকের এই বিজ্ঞানী শক্তিশালী বিস্ফোরক ডিনামাইট আবিষ্কার করে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছিলেন।
তিনি উইল করে গিয়েছিলেন যে তার যাবতীয় অর্থ থেকে যেন প্রতি বছর পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসা, শান্তি ও সাহিত্য—এই ৫টি খাতে বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিদের পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই পুরস্কারের নামকরণ হবে তার নামে। ১৯৬৯ সাল থেকে এই ৫ বিভাগের সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনীতিও।



















