২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি বাবা-মেয়ের ১৭টি ম্যাকডোনাল্ডস

নজরুল মিন্টো : ফাস্ট ফুডের দুনিয়ায় ম্যাকডোনাল্ডসকে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বিশ্বজুড়ে এর রেস্টুরেন্টের সংখ্যা ৪৫ হাজারের বেশি। প্রতিদিন প্রায় সাত কোটি মানুষ এসব রেস্টুরেন্টে খাবার খান। এই বিশাল নেটওয়ার্কের ১৭টি রেস্টুরেন্টের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন বাংলাদেশির অসাধারণ সাফল্যের গল্প।

তাঁর নাম শাহাব হায়দার। একসময় এই ম্যাকডোনাল্ডসেই কর্মী ছিলেন তিনি। নতুন দেশে অন্য অনেক অভিবাসীর মতো চাকরি দিয়েই শুরু হয়েছিল তাঁর জীবন। আজ শাহাব ও তাঁর মেয়ে ইয়াসমিন হায়দার ১৭টি ম্যাকডোনাল্ডস রেস্টুরেন্টের মালিক-পরিচালক। তাঁদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন ৭৫০ জনের বেশি মানুষ।

বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে শাহাবের এই যাত্রাকে ম্যাকডোনাল্ডসও তাদের ‘Golden Opportunities’ প্রচারণায় তুলে ধরেছে। সেখানে তাঁর পথচলাকে বলা হয়েছে প্রায় সাত হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে একজন ম্যাকডোনাল্ডস মালিক-পরিচালক হয়ে ওঠার গল্প। তবে কর্মী থেকে মালিক হওয়ার এই পথ তৈরি হয়েছে বছরের পর বছর কাজ আর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে।

সাত বছর ম্যাকডোনাল্ডসে কাজ করতে করতেই শাহাব একটি রেস্টুরেন্টের ভেতরের জগৎ চিনেছেন। গ্রাহকসেবা, খাবারের মান, পরিচ্ছন্নতা, কর্মীদের সমন্বয়, সবকিছুই ছিল তাঁর প্রতিদিনের কাজের অংশ। কখন কোথায় সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কীভাবে একটি দলকে চালাতে হয় এবং প্রতিদিন একই মান ধরে রাখতে হয়, সেই শিক্ষাও এসেছে কাজের মধ্য দিয়েই। অনেকের কাছে চাকরি কেবল জীবিকার পথ। শাহাবের কাছে সেটিই হয়ে উঠেছিল ব্যবসা শেখার স্কুল।

এরপর আসে জীবনের বড় মোড়। একসময় যে ম্যাকডোনাল্ডসে তিনি কর্মী ছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠানেরই একটি রেস্টুরেন্টের মালিক হওয়ার সুযোগ আসে তাঁর সামনে। Hyder Investments নামে গড়ে ওঠে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। প্রথম ম্যাকডোনাল্ডস রেস্টুরেন্টটি ছিল মিনেসোটার ক্রিস্টাল শহরে।

প্রথম রেস্টুরেন্টটি হাতে পাওয়াই অবশ্য শেষ কথা ছিল না। সেটিকে সফলভাবে চালানোই ছিল আসল পরীক্ষা। কর্মী, গ্রাহক, আয়-ব্যয় থেকে শুরু করে ম্যাকডোনাল্ডসের নির্ধারিত মান বজায় রাখা, সবকিছুর দায় এখন তাঁর। আগের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তখন বড় কাজে দেয়। রেস্টুরেন্টের কাজ তাঁর কাছে নতুন ছিল না, বদলে গিয়েছিল শুধু দায়িত্বের পরিধি। প্রথম রেস্টুরেন্টটি সফলভাবে দাঁড় করানোর পরই শুরু হয় ব্যবসা বাড়ানোর পরের অধ্যায়।

ক্রিস্টাল থেকে শুরু হওয়া তাঁর ব্যবসা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে মিনিয়াপোলিস-সেন্ট পলসহ টুইন সিটিজের বিভিন্ন এলাকায়। ম্যাপল গ্রোভ, ব্রুকলিন পার্ক, শ্যামপ্লিনসহ বিভিন্ন জায়গায় একে একে বাড়তে থাকে তাঁর ম্যাকডোনাল্ডস রেস্টুরেন্টের সংখ্যা।

একটি থেকে দুটি, দুটি থেকে তিনটি। এভাবেই বাড়তে থাকে শাহাবের ব্যবসা। ২০২০ সাল নাগাদ তাঁর পরিচালিত ম্যাকডোনাল্ডস রেস্টুরেন্টের সংখ্যা পৌঁছে যায় ১৭টিতে। সময়ের সঙ্গে মেয়ে ইয়াসমিন হায়দারও যুক্ত হন ব্যবসায়।

একসময় চাকরির জন্য যে প্রতিষ্ঠানের দরজায় ঢুকেছিলেন শাহাব, আজ তাঁর পরিচালিত রেস্টুরেন্টগুলোই শত শত মানুষের কর্মস্থল। যে মানুষটি নিজে শুরু করেছিলেন একজন কর্মী হিসেবে, তাঁর প্রতিষ্ঠানেই এখন কাজ করেন ৭৫০ জনের বেশি মানুষ।

২০১৩ সালে ইয়াসমিন নিজের ম্যাকডোনাল্ডস ব্যবসা শুরু করেন। দুটি রেস্টুরেন্ট দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর ব্যবসা পরে নয়টিতে পৌঁছায়। শাহাবকে যেখানে শুরু করতে হয়েছিল একেবারে নিচ থেকে, ইয়াসমিনের সামনে ছিল বাবার বহু বছরের অভিজ্ঞতা ও গড়ে তোলা একটি ভিত্তি। বাবার দীর্ঘ পথচলা তাই মেয়ের শুরুটাকে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছিল। এক প্রজন্মের পরিশ্রম এভাবেই পরের প্রজন্মের শুরুর জায়গাটি বদলে দিয়েছে।

নতুন দেশে এসে অনেককেই নিজের আগের পরিচয় পাশে রেখে আবার শুরু করতে হয়। কারও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আছে, অথচ প্রথম চাকরি হয় দোকানে। কেউ দেশে কর্মকর্তা ছিলেন, নতুন দেশে এসে উবার চালান। কেউ ব্যবসায়ী হয়েও আবার শুরু করেন একেবারে নিচ থেকে। প্রবাসজীবনে এমন গল্প অচেনা নয়। কিন্তু প্রথম চাকরিটিই শেষ পরিচয় হয়ে থাকতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। শাহাব হায়দারের জীবন তারই একটি বড় উদাহরণ।
তথ্যসূত্র:
McDonald’s Corporation
Hyder Investments
Yasmin Hyder business profile
নজরুল মিন্টো টরন্টো থেকে প্রকাশিত দেশেবিদেশে পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও প্রকাশক