৩০শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আর্ন্তজাতিক

কানাডার সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের জেরে ‘লেক ওন্টারিও’র নাম ‘লেক আমেরিকা’ রাখলেন ট্রাম্প

কানাডার সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের জেরে ‘লেক ওন্টারিও’র নাম ‘লেক আমেরিকা’ রাখলেন ট্রাম্প

কানাডার সঙ্গে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের জেরে দুই দেশের সীমান্তে অবস্থিত পাঁচটি ‘গ্রেট লেকস’ বা হ্রদের একটির নাম পরিবর্তন করার এক নির্বাহী আদেশে সই করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুবসব সরকারি সংস্থাকে নির্দেশ দিয়ে এই আদেশে সই করেন যে, এখন থেকে সব ধরনের অফিশিয়াল নথিপত্র ও নথিতে কানাডার ‘লেক ওন্টারিও’-কে ‘লেক আমেরিকা’ হিসেবে উল্লেখ করতে হবে। এর আগে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে তিনি একতরফাভাবে ‘মেক্সিকো উপসাগর’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘আমেরিকা উপসাগর’ রাখার একই ধরনের চেষ্টা করেছিলেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘ভেবে দেখুন, আমাদের একটি উপসাগর আছে, একটি হ্রদও আছে। এখন শুধু একটি মহাসাগর দরকার। তাই হয়তো আটলান্টিক অথবা প্রশান্ত মহাসাগরের নামও আমাদের পরিবর্তন করতে হবে।’

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরকারি নথিপত্রে যেকোনো স্থান বা ল্যান্ডমার্কের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়ার আইনি এখতিয়ার রয়েছে, তবে তিনি কানাডা সরকার বা সীমান্তের কোনো সাধারণ নাগরিককে এই নাম পরিবর্তন মানতে বাধ্য করতে পারেন না।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় দুই বছর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া এবং বর্তমানে জীবনযাত্রার ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ব্যর্থতায় হতাশ হয়ে পড়া ভোটারদের আকৃষ্ট করতেই ট্রাম্প এই জাতীয়তাবাদী চাল চেলেছেন।

একই সঙ্গে ট্রাম্প আমেরিকার পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের ওপর অনর্থক চাপ সৃষ্টি করছেন, কারণ তাঁর বিশ্বাস—মিত্র দেশগুলো স্বাধীন রাষ্ট্রের মতো আচরণ করে আমেরিকার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করছে, অথচ তাদের উচিত মার্কিনদের অনুগত হয়ে থাকা।

হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে এই আদেশে সই করার সময় ট্রাম্প স্পষ্ট করেন যে—আমেরিকার সামরিক ছত্রছায়ায় থাকার সুবাদে কানাডা যেভাবে মাফিয়াদের মতো ‘সুরক্ষা ফি’ বা প্রোটেকশন মানি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, তার ওপর ক্ষোভ থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘আপনারা জানেন, আমরা কোনো অর্থ ছাড়াই কানাডাকে রক্ষা করি। আমরা এর বিনিময়ে কিছুই পাই না। কানাডাকে রক্ষা করার জন্য তারা আমাদের কোনো টাকা দেয় না, কিন্তু আমরা তাদের রক্ষা করি এবং তারা তা বোঝে।

উদাহরণস্বরূপ, আমরা বরফ কাটার জাহাজ (আইসব্রেকার) কিনেছি। তারা সেগুলো ব্যবহার করতে চায়। আমাদের কাছে ১১টি নতুন আইসব্রেকার আসছে এবং তারা সেগুলো ব্যবহার করতে চায়। অথচ তারা কোনো কিছুর জন্যই টাকা দেয় না। তারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মতো আচরণ করতে চায়, কিন্তু তারা কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র নয়।’

তিনি গাড়ি উৎপাদন কারখানার উদাহরণ দিয়ে বলেন, এই অটোমোবাইল শিল্পকে সম্পূর্ণভাবে কানাডা থেকে সরিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা উচিত।

চীন ও উত্তর কোরিয়ার স্বৈরশাসকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখলেও কেন তিনি কানাডার মতো একটি ঐতিহ্যবাহী বন্ধু রাষ্ট্রকে ক্ষেপিয়ে তুলছেন—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প কানাডা সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। গত সপ্তাহে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কের জবাবে কানাডাও পাল্টা শুল্ক আরোপ করে, যা ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরো বলেন, ‘কানাডার কর্মকর্তারা আমাদের সঙ্গে খুবই খারাপ আচরণ করেছেন। তারা বাজে মানুষ। তারা আমাদের কৃষকদের ওপর ৪০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে।’ তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং তাঁর প্রথম মেয়াদে স্বাক্ষরিত নতুন বাণিজ্য চুক্তি থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্য ক্ষেত্রে আলোচনার জন্য কানাডাই ‘সবচেয়ে কঠিন দেশ’। তিনি অভিযোগ করেন, কানাডিয়ানরা সবকিছুতেই নিজেদের ‘বিশেষ অধিকার’ রয়েছে বলে মনে করে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে টিকটক-এ পোস্ট করা একটি ভিডিওতে ট্রাম্প এই নাম পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ভিডিওতে তিনি গ্রেট লেকসের একটি মানচিত্র দেখিয়ে বলেছিলেন যে তিনি বৃহস্পতিবার ২৭ আবঠিক কী করতে যাচ্ছেন। ৮০ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট ভিডিওতে বলেন, ‘আমরা একটি ছোট পরিবর্তন করতে যাচ্ছি; আমরা একে লেক ওন্টারিওর চেয়ে ভিন্ন কিছু বলব। আমরা একে লেক আমেরিকা বলব। আর এর জন্য কেবল একটি ভালো কলম এবং কিছুটা বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন।’ এরপর তিনি একটি শার্পি কলম দিয়ে মানচিত্রে লেক ওন্টারিও নামটি কেটে তার ওপরে “লেক আমেরিকা” লিখে দেন।

কানাডার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের এই ভৌগোলিক আক্রমণ দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার সম্পর্ককে নজিরবিহীন ফাটলের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কানাডিয়ান সংবাদপত্র ‘দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম কানাডিয়ান প্রতিরক্ষা বাহিনী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন বা আক্রমণের মুখে আত্মরক্ষার একটি প্রতীকী মহড়া পরিচালনা শুরু করেছে।

গত বছরের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একাধিকবার কানাডাকে দখল করার এবং একে আমেরিকার ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ বানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। আর সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে, তিনি আর্কটিক বা সুমেরু অঞ্চলে কানাডার ভূখণ্ডের ‘দুর্বলতা’ এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টির ওপর পুনরায় মনোযোগ দিয়েছেন।

একই সময়ে, ৮০ বছর বয়সী এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ন্যাটোর আরেক মিত্র ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ‘গ্রিনল্যান্ড’-এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ইচ্ছার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছেন। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ড তাদের প্রয়োজন এবং এই লক্ষ্য অর্জনে তারা প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগসহ সব ধরনের বিকল্প পথ খোলা রাখছে। – ইনডিপেন্ডেন্ট, নিউইয়র্ক পোস্ট থেকে