২১শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র

বিদেশি শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার নিয়মে বড় পরিবর্তন ঠেকাতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের

বিদেশি শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার নিয়মে বড় পরিবর্তন ঠেকাতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের

যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি শিক্ষার্থী, এক্সচেঞ্জ ভিজিটর ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের বৈধভাবে থাকার নিয়মে বড় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসন এর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে উচ্চশিক্ষা, শ্রমিক ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর একটি জোট।

আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন নিয়ম আটকে দিতে গত ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার ম্যাসাচুসেটসের ফেডারেল আদালতে মামলা এবং প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞার (ইনজংশন) আবেদন করা হয়েছে।

মামলাটি দায়ের করেছে মোট আটটি সংগঠন। এগুলো হলো – নাফসা: অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেটরস, প্রেসিডেন্টস অ্যালায়েন্স অন হায়ার এডুকেশন অ্যান্ড ইমিগ্রেশন, অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিপেনডেন্ট কলেজেস অ্যান্ড ইউনিভার্সিটিজ ইন ম্যাসাচুসেটস, আমেরিকান ফেডারেশন অব টিচার্স, গ্র্যাজুয়েট লেবার অর্গানাইজেশন এএফটি লোকাল ৬৫১৬, ইউনাইটেড অটো ওয়ার্কার্স, ইউএডব্লিউ লোকাল ২৩২২ এবং সাংবাদিকদের সংগঠন দ্য নিউজগিল্ড-সিডব্লিউএ।

⁠মামলাটি হচ্ছে ‘প্রেসিডেন্টস অ্যালায়েন্স অন হায়ার এডুকেশন অ্যান্ড ইমিগ্রেশন বনাম ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি’। ১৮ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে ৮১ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগেই সেটি সাময়িকভাবে আটকে দিতে আদালতের কাছে প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা চেয়েছে বাদীপক্ষ।

নতুন নিয়মের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন বিদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময়সীমা নিয়ে। বর্তমানে অধিকাংশ এফ-১ শিক্ষার্থী ও জে-১ এক্সচেঞ্জ ভিজিটর ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ ব্যবস্থায় থাকেন। অর্থাৎ নির্ধারিত শিক্ষাগত বা বিনিময় কর্মসূচির শর্ত ঠিকভাবে মেনে চললে তাদের আই-৯৪ রেকর্ডে আলাদা নির্দিষ্ট শেষ তারিখ না রেখেই বৈধভাবে অবস্থানের সুযোগ থাকে।

ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নিয়মে এই দীর্ঘদিনের ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হবে। এফ-১ শিক্ষার্থী ও জে-১ এক্সচেঞ্জ ভিজিটরদের তাদের কর্মসূচির মেয়াদ অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অনুমতি দেওয়া হবে, তবে একবারে সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত। অর্থাৎ চার বছরের কম সময়ের প্রোগ্রাম হলে সেই প্রোগ্রামের নির্ধারিত সময়ই প্রযোজ্য হতে পারে, আর চার বছরের বেশি হলে প্রাথমিক অনুমোদন চার বছরের বেশি হবে না।

কোনো শিক্ষার্থীর ডিগ্রি বা গবেষণা শেষ করতে অনুমোদিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় প্রয়োজন হলে তাকে অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করতে হবে। মামলার নথি অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত আবেদন, ফি এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী বায়োমেট্রিক তথ্য বা সাক্ষাৎকারের প্রয়োজন হতে পারে। বাদীপক্ষের আশঙ্কা, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি পিএইচডি ও গবেষণা কর্মসূচিতে থাকা বিদেশি শিক্ষার্থীরা এতে বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়বেন।

মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে অনেক পিএইচডি প্রোগ্রাম শেষ করতে চার বছরের বেশি সময় লাগে – কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণত ছয় থেকে সাত বছরও প্রয়োজন হয়। চার বছরের ব্যাচেলর ডিগ্রিও অনেক শিক্ষার্থীর নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় নিতে পারে। ফলে বাদীপক্ষের দাবি, শিক্ষার্থী বৈধভাবে পড়াশোনা চালিয়ে গেলেও নতুন ব্যবস্থায় তাকে আলাদাভাবে থাকার মেয়াদ বাড়ানোর সরকারি অনুমোদনের ওপর নির্ভর করতে হবে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা গুরুত্বপূর্ণ – নতুন নিয়মটি শুধু পাসপোর্টে থাকা ‘ভিসা স্ট্যাম্পের মেয়াদ’ চার বছরে সীমাবদ্ধ করার বিষয় নয়। এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর একজন এফ, জে বা আই স্ট্যাটাসধারী কতদিন বৈধভাবে অবস্থানের অনুমতি পাবেন – সেই ‘পিরিয়ড অব অ্যাডমিশন’ বা অনুমোদিত অবস্থানের সময়সীমা নিয়ে। ফলে ভিসার মেয়াদ এবং যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদিত অবস্থানের সময়কে একই বিষয় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

শিক্ষার্থীদের জন্য শুধু সময়সীমাই পরিবর্তন হচ্ছে না। নতুন নিয়মে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন, শিক্ষার লক্ষ্য পরিবর্তন এবং পরবর্তী শিক্ষামূলক কর্মসূচিতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন বিধিনিষেধ রয়েছে। বাদী সংগঠনগুলোর দাবি, এতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক একাডেমিক সিদ্ধান্তের ওপর অভিবাসন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ বাড়বে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক চাপও বৃদ্ধি পাবে।

বিদেশি সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের “আই” স্ট্যাটাসে সাধারণভাবে একটি অ্যাসাইনমেন্টের মেয়াদ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২৪০ দিনের জন্য থাকার অনুমতি দেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে তাদেরও মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

চীনা পাসপোর্টধারী নির্দিষ্ট সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সময়সীমা ৯০ দিন রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ গত বছরের আগস্টে প্রথম এই পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয়। প্রায় ২২ হাজার মতামত পাওয়ার পর চলতি বছরের ১৭ জুলাই চূড়ান্ত নিয়ম প্রকাশ করা হয়।

দীর্ঘদিনের ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ ব্যবস্থা তুলে দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের অনুমোদন চালুর পক্ষে প্রশাসনের যুক্তি হলো – এর মাধ্যমে বিদেশিদের অবস্থান ও অভিবাসন আইন মেনে চলার বিষয়টি নিয়মিতভাবে পর্যালোচনার সুযোগ বাড়বে।

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ দায়ের করা মামলার বিরোধিতা করে জানিয়েছে, নতুন ব্যবস্থা ভিসা জালিয়াতি ঠেকানো এবং অভিবাসন ব্যবস্থায় তদারকি জোরদারের জন্য প্রয়োজন।

অন্যদিকে মামলা দায়ের করাদের দাবি, সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে এই নিয়ম আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংবাদিকদের ওপর নতুন প্রশাসনিক বোঝা তৈরি করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক মেধাবীদের আসার আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।

সাংবাদিকদের সংগঠন দ্য নিউজগিল্ড-সিডব্লিউএও বিষয়টিকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। সংগঠনটি বলছে, বিদেশি সাংবাদিকদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সক্ষমতা যদি বারবার সরকারের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এই কারণেই উচ্চশিক্ষা ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি সাংবাদিকদের সংগঠনটিও মামলার বাদী হয়েছে।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্যও এই মামলার ফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নিয়ম কোনো একটি দেশের জন্য নয় – এফ-১ স্ট্যাটাসে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর সাধারণভাবে প্রযোজ্য। ফলে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থী এবং ইতোমধ্যে সেখানে থাকা সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরাও নিয়মটির আওতায় পড়তে পারেন। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি পিএইচডি, গবেষণা বা একাধিক পর্যায়ের উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা থাকলে পরিবর্তনটির প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে এখনই বিদেশি শিক্ষার্থীদের বর্তমান বৈধ অবস্থান বাতিল হচ্ছে না। নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার নির্ধারিত তারিখ ১৫ সেপ্টেম্বর। তার আগেই মামলাকারীরা আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছে। ফলে আদালত প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা (ইনজাংশন) দেয় কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিষেধাজ্ঞা এলে নতুন ব্যবস্থা অন্তত সাময়িকভাবে আটকে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে মামলাটি এখন শুধু একটি অভিবাসন বিধির আইনি লড়াই নয় – যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে আসা বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গেও সরাসরি জড়িয়ে গেছে।

একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে নির্দিষ্ট সময়সীমা অভিবাসন ব্যবস্থায় নজরদারি শক্তিশালী করবে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্বকারী আট সংগঠন বলছে এতে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক মেধা আকর্ষণের সক্ষমতাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখন চূড়ান্ত দৃষ্টি ম্যাসাচুসেটসের ফেডারেল আদালতের দিকে।