২১শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র

বিদেশি শিক্ষার্থী কমায় যুক্তরাষ্ট্রের ৩.৪ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির শঙ্কা, ঝুঁকিতে ৪০ হাজার চাকরি

বিদেশি শিক্ষার্থী কমায় যুক্তরাষ্ট্রের ৩.৪ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির শঙ্কা, ঝুঁকিতে ৪০ হাজার চাকরি

ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর ইমিগ্রেশন আইন প্রয়োগের বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে থাকায় ২০২৬ সালের শরৎ সেমিস্টারে দেশটির অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ ৩.৪ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রায় ৪০ হাজার চাকরিও ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে নতুন এক বিশ্লেষণে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক শিক্ষা সংগঠন নাফসা।

নাফসা এবং জেবি ইন্টারন্যাশনালের যৌথ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শরতে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার কমে যেতে পারে। এই হ্রাসের সরাসরি প্রভাব পড়বে টিউশন ফি, বাসাভাড়া, খাবার, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় ব্যবসায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ব্যয়ের ওপর।

নাফসার হিসাবে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণে অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান ৩.৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কমতে পারে। এর সঙ্গে প্রায় ৪০ হাজার চাকরি হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে। ২০২৫ সালের তুলনায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক অবদান থেকে সমর্থিত চাকরির সংখ্যা প্রায় ৯ শতাংশ কমে যেতে পারে।

২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১১ লাখ ৭৮ হাজার। তারা দেশটির অর্থনীতিতে প্রায় ৪২.৯ বিলিয়ন ডলার অবদান রেখেছিলেন এবং ৩ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি চাকরিকে সমর্থন করেছিলেন।

নাফসার মধ্যম পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে প্রায় ১১ লাখ ৫ হাজারে নেমে আসতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এই সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ ৫৭ হাজারে নামার আশঙ্কা রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি চাপ পড়তে পারে গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে। নাফসা বলছে, আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়াই সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতির বড় কারণ। কিছু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আবেদনেও একই ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডক্টরাল প্রোগ্রামে আন্তর্জাতিক আবেদন ২১ শতাংশ কমেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অ্যাডমিশন কমেছে ১৭ শতাংশ।

কমন অ্যাপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আবেদন ৯ শতাংশ কমেছে। ভারতের শিক্ষার্থীদের আবেদন কমেছে ১৪ শতাংশ। নাইজেরিয়ার ক্ষেত্রে এই হার ১৭ শতাংশ এবং ঘানার ক্ষেত্রে ৩৪ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সংখ্যায় পতন বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটির তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা নেমে এসেছে ৩ লাখ ৩৮ হাজার ২৩০ জনে, যা গত ২৯ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত টানা ১০ মাস ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। এই সময়ে মোট পতন প্রায় ১২ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ের পতন ছিল মাত্র ৪.৪ শতাংশ।

এক বছরের ব্যবধানে জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় শিক্ষার্থীর মোট সংখ্যা ৮.৬ শতাংশ কমেছে। পোস্টগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে পতন আরও বেশি। এই পর্যায়ে ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক বছরে ১১.৩ শতাংশ কমে ২ লাখ ৬৬ হাজার ১০৪ জনে দাঁড়িয়েছে।

ভারত যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর অন্যতম প্রধান উৎস। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক উচ্চশিক্ষায় ভারতীয় শিক্ষার্থীদের বড় উপস্থিতি রয়েছে। ফলে এই শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর টিউশন আয় এবং গবেষণাভিত্তিক প্রোগ্রামেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমার পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছে নাফসা। এর মধ্যে ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্টের সংকট, ভিসা প্রসেসিংয়ে বিলম্ব, নতুন ইমিগ্রেশন নীতি, কিছু দেশের নাগরিকদের ওপর ট্রাভেল রেস্ট্রিকশন এবং পড়াশোনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

ভারত ও চীনের যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটগুলোতে স্টুডেন্ট ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট সীমিত বা বিলম্বিত হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় উৎস দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও চীন শীর্ষে থাকায় এই দুই দেশের পরিস্থিতি সামগ্রিক শিক্ষার্থী সংখ্যার ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।

এ ছাড়া এফ-১ শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘদিন চালু থাকা ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ ব্যবস্থার পরিবর্তে নির্দিষ্ট মেয়াদভিত্তিক থাকার নিয়ম চালুর সিদ্ধান্তও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। পাশাপাশি অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং বা ওপিটি কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনাও বিদেশি শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।

নাফসা বলছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি দিয়েই অর্থনীতিতে অবদান রাখেন না। তারা বাসাভাড়া, খাবার, পরিবহন, বিনোদন এবং অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয়ের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিকেও সচল রাখেন। ফলে শিক্ষার্থী কমলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরেও ব্যবসা ও চাকরির বাজারে প্রভাব পড়ে।

স্টেট হিসাবে সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য ক্ষতির মুখে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়া। সেখানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে গেলে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক অবদান হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

নিউইয়র্কে সম্ভাব্য ক্ষতি প্রায় ৪৭ মিলিয়ন ডলার। ম্যাসাচুসেটস ও মিশিগানে প্রায় ২৮ মিলিয়ন ৪০ লাখ ডলার করে এবং টেক্সাসে প্রায় ১৯ মিলিয়ন ৯০ লাখ ডলারের ক্ষতি হতে পারে।

তবে নাফসা স্পষ্ট করেছে, এগুলো চূড়ান্ত শিক্ষার্থী সংখ্যা নয়, বরং বর্তমান আবেদন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রত্যাশা এবং বিদ্যমান প্রবণতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি পূর্বাভাস। ২০২৬ সালের শরৎ সেমিস্টারের পূর্ণাঙ্গ এনরোলমেন্ট তথ্য প্রকাশের পর প্রকৃত পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণে দীর্ঘদিন বিশ্বের শীর্ষ গন্তব্যগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু আবেদন ও এনরোলমেন্টের সাম্প্রতিক পতন অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব শুধু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক অবস্থায় নয়, যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা, দক্ষ জনশক্তি এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।