১৪ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র

সন্তানদের সামনেই আটক অভিবাসী দম্পতি, ১৮ বছরের মেয়ের কাঁধে চার ভাইবোনের দায়িত্ব

সন্তানদের সামনেই আটক অভিবাসী দম্পতি, ১৮ বছরের মেয়ের কাঁধে চার ভাইবোনের দায়িত্ব

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা স্টেটের পাম বিচ কাউন্টিতে গাড়ি থামিয়ে এক অভিবাসী দম্পতিকে আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত টহল বাহিনী। পুরো ঘটনাটি ঘটে তাদের পাঁচ সন্তানের সামনেই। বাবা-মাকে নিয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া ১৮ বছর বয়সী মেয়েটিকে এখন একাই ১৬ থেকে ৩ বছর বয়সী চার ভাইবোনের দেখভালের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে।

স্থানীয় গণমাধ্যম ডব্লিউএলআরএনের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে গত ৯ আগস্ট রোববার লেক ওয়ার্থ বিচ এলাকায়। পরিবারটির বড় মেয়ে ওয়েন্ডি ডোমিঙ্গো, যিনি জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, জানান, আগের দিনই তিনি ১৮ বছরে পা রেখেছিলেন। সেদিন সকালে পরিবারের সবাই গির্জায় যান। পরে স্কুল খোলার আগে ছোট ভাইবোনদের জন্য জুতা কিনতে একসঙ্গে বের হন।

গাড়িটি চালাচ্ছিলেন ওয়েন্ডি। তার বাবা আব্রাহাম ডোমিঙ্গো ও মা মারিয়া লেইভা ছিলেন যাত্রী। মিলিটারি ট্রেইল সড়কে হ্যাভারহিল এলাকার কাছে পৌঁছালে মার্কিন সীমান্ত টহল বাহিনীর সদস্যরা তাদের গাড়ি থামানোর সংকেত দেন। ওয়েন্ডি বলেন, জীবনে কখনও ভাবেননি যে একই সময়ে তার বাবা ও মাকে নিয়ে যাওয়া হবে।

তার ভাষায়, “আমি এখন চার ভাইবোনের দায়িত্বে। আমাদের একেবারে একা রেখে গেছে।” ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দেখা যায়, ছোট ভাইবোনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েছে এবং বাবা-মা সন্তানদের জড়িয়ে ধরে বিদায় জানাচ্ছেন।

ভিডিওতে এক কর্মকর্তাকে স্প্যানিশ ভাষায় পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায়। আরেক কর্মকর্তা ওয়েন্ডিকে ইংরেজিতে জানান, গাড়ির নিবন্ধন তথ্য অনুযায়ী এটি একজন ‘নন-সিটিজেন’-এর নামে নিবন্ধিত। গাড়িটি ওয়েন্ডির বাবার নামে নিবন্ধিত ছিল। ঘটনার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সীমান্ত টহল বাহিনী কোনো মন্তব্য করেনি।

তবে মার্কিন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ (ডিএইচএস) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে জানায়, ওই দম্পতি আইন ভঙ্গ করেছেন। সংস্থাটির ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের আইন ভঙ্গের সিদ্ধান্ত তারাই নিয়েছেন এবং সেই সিদ্ধান্তের পরিণতির দায়ও তাদেরই, যেমন কোনো মার্কিন নাগরিক অপরাধ করে কারাগারে গেলে তার সন্তানদের ওপরও প্রভাব পড়ে।

ডিএইচএস জানায়, আব্রাহাম ডোমিঙ্গোর বিরুদ্ধে আগে গার্হস্থ্য সহিংসতার অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে পাম বিচ কাউন্টির আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আনা সেই অভিযোগ পরে প্রসিকিউটররা প্রত্যাহার করেন। গার্হস্থ্য সহিংসতা বিষয়ক একটি কোর্স সম্পন্ন এবং মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নের পর তিনি প্রবেশন পান।

অন্যদিকে মারিয়া লেইভার আশ্রয় আবেদন-সংক্রান্ত আপিল একটি ফেডারেল আদালত খারিজ করে দিয়েছিল। আদালত তার যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগের নির্দেশও বহাল রাখে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোমিঙ্গো ও লেইভা প্রায় ২০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন।

এই ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে তাদের সন্তানদের ওপর। ওয়েন্ডি জানান, বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক সব সময় ভালো ছিল না। তবে গত এক বছরে তাদের সম্পর্ক অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল।

চলতি বছরের বসন্তে লেক ওয়ার্থ কমিউনিটি হাই স্কুল থেকে স্নাতক হওয়ার পর তিনি প্রথমে একটি রেস্তোরাঁয় এবং পরে একটি হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কে কাজ শুরু করেন। একই সঙ্গে পাম বিচ স্টেট কলেজে আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তি বিষয়ে পড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। এ জন্য তিনি আর্থিক সহায়তাও পেয়েছিলেন।

কিন্তু বাবা-মা অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হেফাজতে যাওয়ার পর সেই পরিকল্পনা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পরিবারের খরচ চালাতে তাকে দুটি চাকরি করতে হতে পারে। ফলে কলেজে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। ওয়েন্ডি বলেন, তার পরিবারের মতো আরও অনেক পরিবার একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তার অভিযোগ, “আমেরিকাকে আবার মহান করার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এতে আমাদের মতো মানুষের স্বপ্নই ভেঙে যাচ্ছে।”

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন অবৈধভাবে বসবাসকারী অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে। প্রশাসনের লক্ষ্য, চলতি ও আগামী অর্থবছরে প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ মানুষকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অপসারণ করা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে কংগ্রেস অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগকে চার বছরে ১৭০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। এই নীতির প্রভাব দক্ষিণ ফ্লোরিডাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বহু অভিবাসী পরিবারের ওপর পড়ছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও অভিবাসন অধিকারকর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।