৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরিতে “লেখকের অঙ্গন”র ২৫ তম আসর

গত ৩০ মে শনিবার নিউ ইয়র্কের কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরিতে নীরা কাদরীর পরিচালনায় লেখকের অঙনের ২৫ তম আসরে সাহিত্য অনুরাগী ও লেখকদের উপস্থিতিতে প্রবাসের মাটিতে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চাকে বেগবান করতে নিয়মিত আয়োজন লেখকের অঙ্গন”র ২৫ তম গ্রন্থালোচনা অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে ।

অনুষ্ঠানে আমেরিকার জনপ্রিয় শিশু সাহিত্যিক ক্যারোন হেসে’র নিউবেরী পদক বিজয়ী কাব্য উপন্যাস “আউট অফ দ্যা ডাস্ট” বইটি নিয়ে আলোচনা করেন দিমা নেফারতিতি। আমেরিকায় ১৯৩০ এর দশকে ওকলাহোমায় ভয়ংকর ধূলিঝড়, মহামন্দা, খরা পীড়িত এক কৃষক পরিবারের কিশোরী কন্যা বিলি জো এর কিশোর জীবনের উত্থান, পতন, মর্মন্তুদ দুর্ঘটনা, শোক কে শক্তিতে রূপান্তরিত করে, জীবনে ঘুরে দাঁড়াবার কাহিনী নিয়ে এই উপন্যাস। মনোজ্ঞ আলোচনায় দিমা নেফারতিতি বলেন, উপন্যাসের আঙ্গিক, বিষয়বস্ত এবং করুন জীবন বাস্তবতার সত্যান্বেষী বার্তা বইটির মূল আকর্ষণ। শোক কে শক্তিতে পরিণত করে আশা, সহনশীলতা, ক্ষমা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তথা মানবিকতার অমূল্য দীক্ষা’র কারণে বইটি সর্বস্তরের পাঠকের জন্যই একটি ক্ল্যাসিক অনুপ্রেরণামূলক বই।

স্বপন বিশ্বাস আলোচনা করেন প্রখ্যাত জার্মান লেখক হেরমান হেস এর “সিদ্ধার্থ” বইটি নিয়ে যা অনুবাদ করেছেন জাফর আলম। স্বপন বিশ্বাস তার মনোজ্ঞ আলোচনায় উল্ল্যেখ করেন, হারমান হেস ১৯২২ সালে এই বইটি জার্মান ভাষায় লিখেছিলেন। গৌতম বুদ্ধের অপর নাম সিদ্ধার্থ। সাধারণভাবে পরিজ্ঞাত বুদ্ধ কে অতিক্রম করে এই বইতে এক নতুন বুদ্ধ কে সৃষ্টির অনন্য প্রয়াস রেখেছেন লেখক হেরমান হেস। অজস্র দার্শনিক সংলাপে সমৃদ্ধ বইটিতে মানবাত্মার নির্বাণ লাভের প্রক্রিয়ার উপরে আলোকপাত করা হয়েছে। মানবজীবনে আধ্যাতিকতার চর্চার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে এই বইতে। লেখক হেরমান হেস চিহ্নিত করেছেন, অধ্যাত্বিকতা মানে জীবন বিমুখতা নয়, পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং পৃথিবীর সবকিছুকে ভালোবেসে বৈশ্বিক একতার সারথি হতে পারাই অধ্যাত্বিকতা।

অভিক সোবহান আলোচনা করেন রাহাত আবির এর ইংরেজি উপন্যাস “বেঙ্গল হাউন্ড” নিয়ে। অভিক সোবহান তার মনোজ্ঞ আলোচনায় উল্ল্যেখ করেন, বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত লেখক রাহাত আবির এর লেখা এই ইংরেজি বইটি একটি ঐতিহাসিক কল্পকাহিনীমূলক উপন্যাস, যা ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়। এর প্রেক্ষাপট ১৯৬০-এর দশকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাপূর্ণ ঢাকা শহর। এটি শেলি নামের এক হিন্দু ছাত্রী এবং রোক্সানা নামের এক মুসলিম মেয়ের করুণ প্রেমের গল্প, যারা ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে পালিয়ে যায়। উপন্যাসটিতে জাতীয়তাবাদ, প্রেম, বিচ্ছেদ এবং ব্যক্তিগত জীবনে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে জাদুবাস্তবতার উপাদানও রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তাদের এই দুর্ভাগ্যজনক প্রেমের কাহিনী উন্মোচিত হয়, যার পরিসমাপ্তি ঘটে বাংলাদেশ সৃষ্টির মাধ্যমে। এটি শুরুতে একটি একরৈখিক উপন্যাস মনে হলেও, সমান্তরালভাবে বিশদ চিত্রকল্প এবং আবেগীয় বর্নণার দুর্লভ সমন্বয়ও রয়েছে উপন্যাসের আঙ্গিকে। এর পড়তে পড়তে রয়েছে ম্যাজিক রিয়ালিজমের প্রকাশ।

স্টিফেন ক্রেনস্কি’র লেখা শিশুতোষ জীবনী “লিওনার্দো দা ভিঞ্চি” নিয়ে আলোচনা করেন আরিফ মাহমুদ শৈবাল। মনোজ্ঞ আলোচনায় আরিফ মাহমুদ শৈবাল উল্ল্যেখ করেন, ২০২০ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ১২৮ পৃষ্ঠার এই বইটি ৮-১২ বছর বয়সী (তৃতীয় থেকে সপ্তম শ্রেণি) শিশুদের জন্য তৈরি করা হয়েছে এবং এতে এই ইতালীয় বহুবিদ্যাবিশারদ লিওনার্দো দা ভিঞ্চি’র জীবনকে একজন শিল্পী ও দূরদর্শী উদ্ভাবক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বইটিতে তাঁর জীবনের প্রধান মাইলফলকগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেমন: ফ্লোরেন্সের কাছে একটি পাহাড়ের চূড়ার গ্রামে তাঁর শান্ত শৈশব। মোনা লিসার মতো তাঁর শৈল্পিক শ্রেষ্ঠকর্ম। তাঁর ভবিষ্যৎমুখী নকশা এবং প্রকৌশলগত ধারণা (যেমন প্যারাসুট, হেলিকপ্টার এবং সাঁজোয়া ট্যাঙ্ক), যা তৈরির প্রযুক্তি আসার বহু শতাব্দী আগেই তিনি সৃষ্টি করেছিলেন। আরিফ মাহমুদ শৈবাল উল্ল্যেখ করেন, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি’র চিত্রকলার অনুপ্রেরণা ছিল বিজ্ঞান এবং ভিঞ্চি তার প্রতিটি শিল্পকর্মে, শৈল্পিক প্রয়াসে “আর্ট ফর রিজন” আদর্শকে উপজীব্য করেছেন। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি’র চিত্রকলা সেকারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী শিল্প সারথিদের অনুপ্রেরণার বাতিঘর।

এ.বি.এম. সালেহ উদ্দিন, গবেষক ওবায়দুল্লাহ মামুন সম্পাদিত “একুশের কথা, একুশের চেতনা” বইটি নিয়ে আলোচনা করেন। লেখক, গবেষক ওবায়দুল্লাহ মামুন এর উপস্থিতিতে মনোজ্ঞ আলোচনায় এ.বি.এম. সালেহ উদ্দিন উল্ল্যেখ করেন, “একুশের কথা, একুশের চেতনা” ২১ জন সক্রিয় ভাষা সৈনিকের স্মৃতিধর্মী ২১ টি প্রবন্ধের এক অনন্য সংকলন। অমর একুশ কেবল একটি তারিখ বা সংখ্যা নয় এটি আমাদের চেতনা এবং অস্তিত্বের প্রতীক। একুশের আদর্শে উজ্জীবিত হয়েই অর্জিত হয়েছে আমাদের মহান স্বাধীনতা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সরদার ফজলুল করিম, তাজউদ্দীন আহমদ, আলাউদ্দিন আল আজাদ, এম. আর. আখতার মুকুল সহ ২১ জন বরেণ্য এবং সক্রিয় ভাষা সৈকিনদের এই দুর্লভ প্রবন্ধগুলোয় আমরা জানতে পারি আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অনেক অজানা, দুর্লভ তথ্য, প্রাবন্ধিকদের স্মৃতির গহ্বরে সঞ্চিত অরোও অনেক অজানা স্মৃতি। যা আমাদেরকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়।

অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ওবায়দুল্লাহ মামুন, বদরুন নাহার, সৈকত সহ কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। পরিশেষে অনুষ্ঠানটির পরিচালক নীরা কাদরী তার মনোজ্ঞ সমাপনী আলোচনায় সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। নীরা কাদরী বলেন, আজকের এই প্রযুক্তি ও দ্রুতগতির বিশ্বে, সাহিত্য একটি অপরিহার্য বিষয়। সাহিত্য আমাদের চিন্তার উন্মেষ ঘটায়, আমাদেরকে আরো মানবিক করে তোলে। শিল্প-সাহিত্য একটি সার্বজনীন ভাষা হিসেবে কাজ করে এবং সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও ইতিহাসের দলিল হিসেবে ভূমিকা রাখে। তাই বই পড়া হোক আমাদের নিত্যকার প্রিয় অভ্যাস। প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুসারে