সব ধরনের নন ইমিগ্র্যান্ট বা অস্থায়ী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বিদেশিদের স্থায়ীভাবে বসবাসের (গ্রিন কার্ড) জন্য আবেদন করতে হলে অবশ্যই নিজেদের দেশে ফিরে যেতে হবে—গত শুক্রবার (২২ মে) এমন একটি নতুন নীতি ঘোষণা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর মাধ্যমে গত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা একটি নিয়মের আমূল পরিবর্তন করা হলো।
ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস) এর মুখপাত্র জ্যাক কালার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘এখন থেকে বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া, অস্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা কোনো বিদেশি নাগরিক যদি গ্রিন কার্ড পেতে চান, তবে তাকে অবশ্যই আবেদন করার জন্য তার নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে। বিদেশি নাগরিকরা যখন তাদের নিজ দেশ থেকে আবেদন করবেন, তখন স্থায়ী বসবাসের অনুমতি প্রত্যাখ্যান করার পর যারা গোপনে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যায় এবং অবৈধভাবে বসবাস করে, তাদের খুঁজে বের করে বিতাড়িত করার প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে।’ এই ঘোষণাটি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিদেশিদের জন্য বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া সীমিত করার লক্ষ্যে বর্তমান প্রশাসনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার সবশেষ পদক্ষেপ।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে থাকা লাখ লাখ বিদেশি নাগরিক—যারা মার্কিন নাগরিকদের বিয়ে করেছেন, স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক ভিসাধারী, এবং শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী—তারা দেশ না ছেড়েই গ্রিন কার্ডের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন। তবে নতুন নীতিমালার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যারা অ-অভিবাসী ভিসায় (বিশেষ করে শিক্ষার্থী, সাময়িক কর্মী এবং পর্যটক) যুক্তরাষ্ট্রে আসেন, তারা খুব অল্প সময়ের জন্য এবং নির্দিষ্ট একটি উদ্দেশ্যে আসেন। ইউএসসিআইএস এই পরিবর্তনকে ‘আইনের মূল উদ্দেশ্য ফিরিয়ে আনা’ এবং ‘আইনি ফাঁকফোকর’ বন্ধ করা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘শিক্ষার্থী, সাময়িক কর্মী বা পর্যটন ভিসায় আসা অ-অভিবাসীরা স্বল্প সময়ের জন্য এবং নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। আমাদের ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি যাতে তাদের সফর শেষ হলে তারা দেশ ছেড়ে চলে যান। তাদের এই সফর গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে কাজ করতে পারে না।’
সংস্থাটি জানিয়েছে, এ পরিবর্তনের ফলে অধিকাংশ আবেদন বিদেশে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলার অফিসগুলোর মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে। এতে ইউএসসিআইএস তাদের সীমিত সম্পদ সহিংস অপরাধ ও মানবপাচারের শিকারদের ভিসা, নাগরিকত্ব আবেদন এবং অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক কাজে ব্যবহার করতে পারবে।
তবে ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ থাকলে কিছু আবেদনকারীকে এ নিয়মের বাইরে রাখা হতে পারে। যদিও ইউএসসিআইএস এখনো স্পষ্ট করেনি কোন পরিস্থিতিকে ‘বিশেষ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এতে কর্মকর্তাদের সীমাহীন বিবেচনাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে ইউএসসিআইএস জানিয়েছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সুবিধা বা জাতীয় স্বার্থে ভূমিকা রাখেন, তারা হয়তো দেশটিতে থেকেই আবেদন করতে পারবেন। অন্যদের নিজের দেশে গিয়ে আবেদন করতে হবে।
নতুন এই সিদ্ধান্তকে ট্রাম্প প্রশাসনের বৈধ অভিবাসন সীমিত করার ধারাবাহিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ৫০টি দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা বন্ড কর্মসূচি সম্প্রসারণ করে। এর আওতায় আবেদনকারীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জামানত নেওয়া হতে পারে।
গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) ঘোষণা করে যে, গ্রিন কার্ডের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া শরণার্থীদের ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট’ (আইসিই) আটক করতে পারবে। এই নীতিটি মূলত ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট’-এর একটি ধারার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রে আসার এক বছর পরও যে সব শরণার্থী গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করবেন না, তাদের অবশ্যই পুনরায় ডিএইচএস-এর ‘হেফাজতে’ ফিরে যেতে হবে। এর মাধ্যমে ২০১০ সালের একটি স্মারক (মেমো) বাতিল করা হয়েছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল যে—যুক্তরাষ্ট্রে আসার এক বছরের মধ্যে কোনো শরণার্থীর স্থায়ী আইনি মর্যাদা পাওয়ার আবেদন করতে ব্যর্থ হওয়া তাদের আইনগতভাবে আটকে রাখার ভিত্তি হতে পারে না।
জানুয়ারিতে ৩৯টি দেশের নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতাও কার্যকর করে ট্রাম্প প্রশাসন।
এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে হোয়াইট হাউসের কাছে এক আফগান নাগরিকের গুলিতে এক সেনা নিহত হওয়ার পর পুরো গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়া রিভিউয়ের ঘোষণা দেয় ইউএসসিআইএস। ওই আফগান নাগরিক ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন এবং তার ভিসার মেয়াদ বারবার বাড়ানো হয়েছিল। এই রিভিউয়ের পর আবেদনকারীদের নিজ দেশের পরিস্থিতিকে অভিবাসন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নেতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচনা করার নিয়ম চালু করা হয়।
ওই মাসেই ওবামা ও বাইডেন প্রশাসনের আমলে আসা প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার শরণার্থীর গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়া স্থগিত করে ট্রাম্প প্রশাসন। একই সঙ্গে তারা একটি কঠোর ‘পাবলিক চার্জ’ নিয়ম প্রস্তাব করে, যার মাধ্যমে সরকারি সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন এমন যেকোনো ব্যক্তির গ্রিন কার্ড প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ তৈরি হয়। পরবর্তীতে গত ডিসেম্বরে ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে এক শুটার (যিনি ডিভি লটারি বিজয়ী ছিলেন) কর্তৃক হামলার পর ‘ডাইভারসিটি ভিসা’ (ডিভি) লটারি কর্মসূচি স্থগিত করে ট্রাম্প প্রশাসন। এই কর্মসূচির আওতায় প্রতি বছর বিভিন্ন দেশের ৫০ হাজার নাগরিককে লটারির মাধ্যমে গ্রিন কার্ড দেওয়া হতো।
বর্তমানে এই স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে একটি আইনি লড়াই চলছে এবং এই চক্রের মেয়াদ আগামী সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া ক্ষমতার শুরুর দিকেই ট্রাম্প প্রশাসন জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার নিয়মটি বাতিল করার পদক্ষেপ নিয়েছিল, যার ফলে সাময়িক ভিসাধারীদের সন্তানদের স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
গ্রিন কার্ডের এই নতুন নীতি ইতিমধ্যেই বড় ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অভিবাসন আইনজীবী এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, অনেক আবেদনকারীর নিজ দেশে ফিরে যাওয়া নিরাপদ নয়, কিংবা আবেদন করার জন্য তাদের দেশে কোনো মার্কিন দূতাবাসই নেই।
উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালের আগস্টে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর থেকে আফগানিস্তানে মার্কিন দূতাবাস বন্ধ রয়েছে। সমালোচকরা এই নীতির একটি মৌলিক বৈপরীত্যের কথা উল্লেখ করেছেন, কারণ অনেক দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী অভিবাসী ভিসা প্রসেস করার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেক আবেদনকারী গ্রিন কার্ড পাওয়ার কোনো অগ্রগতি ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের জন্য তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন।
ক্যাটো ইনস্টিটিউটের ইমিগ্রেশন স্টাডিজের ডিরেক্টর ডেভিড বিয়ার এক নিবন্ধে লিখেছেন, এই পদক্ষেপের ফলে মেধাবী ব্যক্তিরা অন্য দেশে চলে যাবেন এবং এটি মার্কিন ব্যবসায়ের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে কমিয়ে দেবে। এই নীতিটি কখন থেকে কার্যকর হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। এর আগেও মার্কিন আদালত ট্রাম্পের একাধিক অভিবাসন নীতিতে স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। তাই আইনি সংগঠনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত অভিবাসীদের কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে ইমিগ্রেশন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।














