হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার ৫ দিনের মাথায় ক্যাটি জাকারিয়া তার পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তার অপ্রস্তুত উপস্থিতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর শেষ পর্যন্ত তাকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করলো।
গতকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) হোয়াইট হাউসের বরাত দিয়ে তার পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করে বিবিসি। তার পদত্যাগের কিছু সময় আগেই শুক্রবার বিকেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তাকে বলেছিলাম, যদি তুমি না চাও, তাহলে তোমার এটা করতে হবে না। সত্যি বলতে, তোমার জায়গায় আমি থাকলে, আমি আবারও ভেবে দেখতাম।’
এর আগে, দায়িত্ব নেয়ার পর গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) জাকারিয়া তার প্রথম সংবাদ সম্মেলনের জন্য ব্যাপক সমালোচিত হন। এ সংবাদ সম্মেলন কেবল ১৫ মিনিটের ছিলো, যেখানে তিনি সাংবাদিকদের করা মাত্র তিনটি প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলেন। তিনি গত কয়েক দিনে আত্মপক্ষ সমর্থনে পদটির জন্য তার যোগ্যতা এবং প্রস্তুতির ব্যাপারে সংবাদমাধ্যমগুলোর করা বেশ কঠিন কিছু প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।
প্রেস সেক্রেটারির “আইনজীবী” পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন
এর আগে সিডেন্ট ট্রাম্পের নতুন প্রেস সেক্রেটারি কেটি জাকারিয়ার আইনজীবী হিসেবে কাজ করার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল এবং হোয়াইট হাউস তার পক্ষও নিয়েছিল। গত সপ্তাহে জাকারিয়াকে নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প তাকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। বিবিসি জানায়, জাকারিয়াও নিজেকে আইনজীবী বলে পরিচয় দিয়েছেন।
কিন্তু মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে তাকে প্রশ্ন করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কোন স্টেটে তিনি আইনজীবী হিসেবে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় বার পরীক্ষায় পাস করেছেন? জবাবে জাকারিয়া বলেন, ‘আমি যখন চীনে গিয়েছিলাম।’ তবে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব স্টেটে তিনি বসবাস করেছেন, সেগুলোর কোনোটিতেই আইনজীবী হিসেবে তার নিবন্ধন থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি।
হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভেন চেউং জাকারিয়ার পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমেরিকার জনগণকে তথ্য জানাতে সাহায্য করার জন্য কেটি অনন্য যোগ্যতাসম্পন্ন এবং অত্যন্ত মেধাবী।’ নিজের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে চলতি সপ্তাহে এক বিবৃতিতে জাকারিয়া বলেন, ‘আমি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেনসংক্রান্ত আইন নিয়ে কাজ করেছি। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব যোগ্যতার সনদও আমার রয়েছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) “ক্যাম্পেইন ফর অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ নামের একটি নজরদারি সংস্থা ক্যালিফোর্নিয়ার বার অ্যাসোসিয়েশনে অভিযোগ জমা দিয়েছে। সংস্থাটি জাকারিয়ার বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, জাকারিয়া বারবার জনসমক্ষে নিজেকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এবং লাইসেন্স ছাড়াই আইন পেশায় কাজ করার যোগ্য বলে দাবি করেছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার আইনে এ ধরনের কাজ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ৪২ বছর বয়সী জাকারিয়া ২০১১ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার পেপারডাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতক হন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে আইন বিষয়ে ডিগ্রি থাকলেই আইনজীবী হিসেবে কাজ করার অনুমতি পাওয়া যায় না। এ জন্য সংশ্লিষ্ট স্টেটের বার পরীক্ষায় পাস করে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হয়। বুধবার (১৪ অক্টোবর) নিউইয়র্ক টাইমসকে জাকারিয়া জানান, সংবাদমাধ্যমে প্রথমবার নিয়মিত উপস্থিত হতে শুরু করার সময় নিজের পরিচয় কীভাবে দেবেন, তা জানতে তিনি পেপারডাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।
জাকারিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট তাকে নিজেকে ‘লইয়ার’ বলতে পরামর্শ দিয়েছিলেন, তবে ‘অ্যাটর্নি’ বলতে নিষেধ করেছিলেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন বিষয়ে স্নাতক হওয়ার পর জাকারিয়া ক্যালিফোর্নিয়ার বার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। তবে তিনি পাস করতে পারেননি। ক্যালিফোর্নিয়ার বার পরীক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।
বিষয়টি সম্পর্কে সরাসরি জানেন এমন এক ব্যক্তি সংবাদমাধ্যমটিকে জানিয়েছেন, বিয়ের পরিকল্পনা এবং হবু স্বামীর সঙ্গে চীনে যাওয়ার প্রস্তুতির সময়ের কাছাকাছি তিনি ওই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। পরে স্বামীর চাকরির কারণে জাকারিয়া চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে চলে যান। তার স্বামী যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। জাকারিয়া জানিয়েছেন, চীনে তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেনসংক্রান্ত আইন নিয়ে কাজ করেছেন।
তার পেশাগত যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি বেইজিংয়ের ঝং লুন আইন প্রতিষ্ঠানে সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। চীনে কেবল দেশটির নাগরিকেরাই আইনজীবী হিসেবে কাজ করার লাইসেন্স পেতে পারেন। বিদেশিরা আইন প্রতিষ্ঠানে অন্য পদে কাজ করতে পারেন।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে রক্ষণশীল ধারার বেতার অনুষ্ঠান ‘দ্য ক্লে ট্রাভিস অ্যান্ড বাক সেক্সটন শো’-তে জাকারিয়া বলেছিলেন, চীনে থাকার সময় তিনি আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন (আইএফসি) ও বিশ্বব্যাংকের হয়ে বাইরের পরামর্শক আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছিলেন। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বিবিসি বিশ্বব্যাংক ও আইএফসির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে বাইরের আইন প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিয়ে থাকে। তবে কোন কাজের দায়িত্ব কোন আইনজীবী পালন করবেন, তা সংশ্লিষ্ট আইন প্রতিষ্ঠানই ঠিক করে। জাকারিয়ার লিংকডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, তিনি ‘ফিক্স ক্যালিফোর্নিয়া’ নামের একটি রক্ষণশীল অলাভজনক সংস্থার প্রধান আইন উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী রিক গ্রেনেল।
























