১৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অর্থনীতি

বাংলাদেশের ওপর শুল্ক কমিয়ে ১৯ শতাংশ করল যুক্তরাষ্ট্র, মার্কিন তুলায় তৈরি পোশাক পাবে শুল্কমুক্ত সুবিধা

বাংলাদেশের ওপর শুল্ক কমিয়ে ১৯ শতাংশ করল যুক্তরাষ্ট্র, মার্কিন তুলায় তৈরি পোশাক পাবে শুল্কমুক্ত সুবিধা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। এতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর দেশটির পাল্টা শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) কমে ১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই চুক্তির আওতায়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু (সিনথেটিক ফাইবার) দিয়ে তৈরি বাংলাদেশি তৈরি পোশাক দেশটিতে রপ্তানির ক্ষেত্রে শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে। বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টার দিকে ওয়াশিংটনে নিজ নিজ দেশের পক্ষে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিসন গ্রিয়ার।

এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী ও বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। এ চুক্তি নিয়ে গত বছরের এপ্রিল থেকে প্রায় ৯ মাস ধরে আলোচনা চলছিল।

এ চুক্তি নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে আলোচনা প্রক্রিয়ায় সার্বিক নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশংসা করেন গ্রিয়ার জেমিসন। সেই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলকে তাদের ‘অসাধারণ প্রচেষ্টার’ জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও উপযুক্ত করবে।

চুক্তি সইয়ের পর বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক এক নতুন ঐতিহাসিক স্তরে পৌঁছেছে। এর ফলে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের বাজারে আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রবেশাধিকার পাবে।

এর আগে বাংলাদেশের ওপর পাল্টা শুল্কহার ছিল ৩৭ শতাংশ, যা গত বছরের আগস্টে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। নতুন চুক্তির মাধ্যমে তা আরও এক শতাংশ কমানো হলো।

জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বলেন, ২০ শতাংশ থেকে শুল্কহার ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য আরও সুবিধা বয়ে আনবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র ও পোশাকপণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে উল্লেখযোগ্য গতি সঞ্চার করবে। তিনি বাংলাদেশের পক্ষে এই চুক্তির প্রধান আলোচক ছিলেন। চুক্তিটি সোমবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে। দুই দেশ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারি করলে এটি কার্যকর হবে।

সংশোধিত শুল্ক হারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানিকারক প্রধান দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের ওপর যেখানে ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, সেখানে ভারত কিছুটা কম ১৮ শতাংশ শুল্ক নিশ্চিত করতে পেরেছে। এছাড়া পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার পণ্যের ওপরও ১৯ শতাংশ হারে শুল্কারোপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে চীন এখনও শীর্ষ স্থানে রয়েছে। এর পরই ভিয়েতনামের অবস্থান। বর্তমানে বাংলাদেশ এই তালিকার তৃতীয় ও ভারত চতুর্থ অবস্থানে আছে।

গত বছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে শুল্ক কমানোর লক্ষ্যে ঢাকা জোর আলোচনা শুরু করে। নীতিনির্ধারকরা এর আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এ হার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।

বাণিজ্য সচিব বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের কোনো দেশকেই ১৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক সুবিধা দেয়নি। তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি সই হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্য চুক্তি হয়তো বাংলাদেশের ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলেছে; এর পেছনে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করতে পারে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ভারত বাড়তি নমনীয়তার সুবিধা পেয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের তেমন কোনো কারণ নেই বলে তিনি মনে করেন।

বাংলাদেশের স্বল্প শ্রমব্যয় ও কম উৎপাদন খরচের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি টিবিএসকে বলেন, ‘১৯ শতাংশ শুল্কারোপ করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে বাংলাদেশকে খুব একটা বেগ পেতে হবে না।’

শুল্ক সমন্বয়ের পাশাপাশি এ চুক্তিতে বেশ কিছু বাণিজ্যিক ও কৌশলগত প্রতিশ্রুতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত তুলা ব্যবহার করে বাংলাদেশে তৈরিকৃত পোশাকের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে মার্কিন প্রশাসন। এটি উভয় দেশের বস্ত্র খাতের সরবরাহ চেইনের জন্য লাভজনক হতে পারে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, বাণিজ্যিক টানাপোড়েন কমানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ২৫টি বিমান কিনতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ। এর আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকা।

এ চুক্তিতে আরও যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তা হলো—যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, গম, সয়াবিন ও এলএনজি আমদানি; ই-কমার্সের ওপর শুল্কারোপ না করা; মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড মেনে চলা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সংস্কারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবগুলোকে সমর্থন দেওয়া।

সরকার মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এ চুক্তির বিষয়ে জনগণকে অবহিত করতে পারে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র এখনও বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার।

গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮.৬৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৪.৯৫ বিলিয়ন ডলারের ও নিটওয়্যার রপ্তানি হয়েছে ২.৬০ বিলিয়ন ডলারের। এছাড়া হোম টেক্সটাইল রপ্তানি ১৫০ মিলিয়ন ডলারে ও ক্যাপ রপ্তানি ২৫৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলার মূল্যের তুলা আমদানি করেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৭৮ মিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট তুলা আমদানির ১০ শতাংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।