২৭শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির আভাসে কমল যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ির ঋণের সুদ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে একটি প্রাথমিক সমঝোতা চুক্তি ( মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং) হওয়ার পর বিশ্ব অর্থনৈতিক বাজারে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।

এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি কেনার ঋণের সুদের হার বা ‘মর্টগেজ রেট’ গত এক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ী ক্রয়ে ঋণ প্রদানের বড় প্রতিষ্ঠান ‘ফ্রেডি ম্যাক’। গত সোমবার (২২ জুন) সংবাদমাধ্যম ফক্স ফাইভ আটলান্টার এক বিশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি সাময়িক শান্ত হওয়া এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের মুনাফা কমে আসায় মর্টগেজের এই পতন ঘটেছে।

ফ্রেডি ম্যাকের প্রাইমারি মর্টগেজ মার্কেট সার্ভের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ বছর মেয়াদী ফিক্সড বা স্থায়ী মর্টগেজের গড় হার গত সপ্তাহের 6.52% থেকে কমে এখন 6.47%-এ দাঁড়িয়েছে। গত বছরের ঠিক এই সময়ে এই সুদের হার ছিল 6.81%। ফ্রেডি ম্যাকের প্রধান অর্থনীতিবিদ স্যাম খাটার এক বিবৃতিতে বলেন, “সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য প্রমাণ করছে যে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়ী ক্রেতারা বাজারে ফিরছেন। খুচরা বিক্রি বৃদ্ধি এবং নতুন বাড়ি কেনার আগ্রহ বাড়ার কারণে বাজারে আবাসনের চাহিদা আগের চেয়ে কিছুটা উন্নত হচ্ছে।” একই সময়ে ১৫ বছর মেয়াদী ফিক্সড মর্টগেজের গড় হারও সামান্য কমে 5.84% থেকে 5.81%-এ নেমে এসেছে।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক সপ্তাহে ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হওয়া তীব্র সামরিক অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারগুলো চরম অস্থিতিশীল ছিল, যার ফলে মর্টগেজ রেটও বেশ উঁচুতে অবস্থান করছিল। তবে গত ১৭ জুন ফ্রান্সের এক শীর্ষ বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিশেষ সমঝোতা স্মারকে (MoU) সই করেন, যেখানে ইরানি কর্মকর্তারাও দূর থেকে যুক্ত হয়ে স্বাক্ষর প্রদান করেন। এই সাময়িক চুক্তির শর্ত অনুযায়ী—অবিলম্বে সব ধরনের সামরিক হামলা বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের ওপর থেকে কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে তাদের আটকে থাকা বৈদেশিক সম্পদ অবমুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। স্থায়ী চুক্তির জন্য দুই দেশকে ৬০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে।

রিয়েলটর ডটকম-এর সিনিয়র অর্থনীতিবিদ অ্যান্থনি স্মিথ বলেন, “বিগত সপ্তাহগুলোতে আমরা দেখেছি যে শান্তি আলোচনার সামান্য অগ্রগতির পরেই আবার নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হচ্ছিল। তবে এবারের পরিস্থিতি অনেক বেশি আশাব্যঞ্জক, কারণ স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই খসড়া চুক্তিতে সই করেছেন।” সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের মর্টগেজ রেট সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’-এর সুদের হারের সাথে যুক্ত না থাকলেও, এটি ১০ বছর মেয়াদী যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি নোটের মুনাফার (Yield) সাথে ওঠানামা করে, যা গত ১৯ জুন শুক্রবার বিকেলে 4.45%-এর কাছাকাছি ছিল।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ গত বুধবার (১৭ জুন) এক নীতি নির্ধারণী বৈঠকে তাদের মূল সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। ইরান সংকটের কারণে বাজারে এখনও মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি থাকায় ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশ-এর নেতৃত্বে এই প্রথম কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার 3.5% থেকে 3.75% এর ঘরেই রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ফেডের ওপেন মার্কেট কমিটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, জ্বালানি খাতসহ কিছু নির্দিষ্ট সেক্টরে সরবরাহ ঘাটতির কারণে মূল্যস্ফীতি এখনও তাদের নির্ধারিত 2% লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ স্মিথ ফেড চেয়ারম্যানের এই পদক্ষেপের বিষয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, নতুন চেয়ারম্যান ওয়ারশ দায়িত্ব নিয়েই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে সুদের হার সহজে কমানোর দিন আপাতত শেষ এবং মূল্য স্থিতিশীল রাখাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট কোনো ভবিষ্যৎ নির্দেশনা না দেওয়ায় বাজার কিছুটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আর এই কারণেই ইরান যুদ্ধবিরতির সুফলের পরেও মর্টগেজ রেট যতটা দ্রুত কমার কথা ছিল, ফেডের কঠোর অবস্থানের কারণে তা হয়তো কিছুটা ধীর গতিতে কমবে। তবে সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের এই চুক্তি মার্কিন আবাসন খাতে বড় ধরণের স্বস্তি নিয়ে এসেছে। সংবাদ সুত্র রিয়েলটর.কম