যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর যখন তাঁর তথাকথিত “লিবারেশন ডে” শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দেন, তখন চীন চাইলে শুল্কের চাপে বিভ্রান্ত ও অস্বস্তিতে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও অংশীদারদের কাছে টানতে এক ধরনের কূটনৈতিক সৌহার্দ্যের প্রচেষ্টা চালাতে পারত। কিন্তু বাস্তবে বেইজিং উল্টো পথ বেছে নেয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত করার সাহস দেখানো দেশগুলোর প্রতি হুমকি দেয় বেইজিং। একই সঙ্গে চীন যখন তার গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা প্রকাশ করে, তখন সেটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রকে নয়, পুরো বিশ্বকেই লক্ষ্য করে নেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেওয়া এক উচ্চঝুঁকির কৌশলগত বাজি। যুক্তরাষ্ট্রের অবহেলিত মিত্রদের স্বস্তি দেওয়ার বদলে, বেইজিং চেয়েছিল তাদের সংকট আরও ঘনীভূত করতে, যাতে ওয়াশিংটনের আচরণে বিচলিত দেশগুলো বুঝতে পারে—চীনের বিরুদ্ধাচরণ করলেও অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হয়।
এই হিসেবনিকেশের পেছনে ধারণা ছিল, শেষ পর্যন্ত এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে চাইবে। আর যখন তারা সেই পথে যাবে, তখন তারা বেইজিংয়ের স্বার্থের প্রতিও তুলনামূলকভাবে বেশি নমনীয় হবে।
এই কৌশল এখন ফল দিতে শুরু করেছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর মতো— ইউরোপেরো একের পর এক দেশের নেতা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে বেইজিং সফরে আসছেন। যদিও মানবাধিকার, গুপ্তচরবৃত্তি, নির্বাচনে হস্তক্ষেপ কিংবা অসম বাণিজ্যের মতো যেসব ইস্যুতে আগে এসব দেশের সঙ্গে মতবিরোধ ছিল, সেগুলোতে চীন খুব সামান্যই ছাড় দিয়েছে। এই কূটনৈতিক তৎপরতা ইতোমধ্যেই ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। শুক্রবার তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ব্রিটেন ও কানাডার জন্য তাদের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হিসেবে চীনের দিকে তাকানো “বিপজ্জনক”।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্ররা একান্ত প্রয়োজনেই চীনমুখী হয়েছে। আর ট্রাম্পের অস্থির বিশ্বব্যবস্থার দিকে এগোনোর ঘটনাও এখানে প্রভাব ফেলেছে। এখানেই সুযোগ পাচ্ছে বেইজিং।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক এবং চীনের রাজনীতি বিশ্লেষক সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা জোনাথন সিন বলেন, “চীন (যুক্তরাষ্ট্রের) মিত্রদের ওপর চাপ লাঘব না করে বরং তা আরও জোরালো করেছে, যাতে তারা বেইজিংয়ের অবস্থানের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়। এখন দেখা যাচ্ছে, বেইজিংয়ের এই ধৈর্যশীল নীতি সুফল দিচ্ছে।”
এই প্রবণতার স্পষ্ট উদাহরণ মিলেছে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সাম্প্রতিক চীন সফরে। ২০১৮ সালের পর এটিই কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম চীন সফর, যেখানে বছরের পর বছর ধরে চলা শীতল সম্পর্ক থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
স্টারমার স্পষ্ট করে জানান, তাঁর প্রধান অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবসায়িক চুক্তি করা। এ জন্য তিনি হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী কর্মী ও ব্রিটিশ নাগরিক জিমি লাইয়ের কারাবাসের মতো বিতর্কিত বিষয়গুলো এড়িয়ে গেছেন। স্টারমারের সমালোচকদের মতে, তাঁর সরকার সাম্প্রতিক সময়ে লন্ডনে একটি বিশাল নতুন চীনা দূতাবাস অনুমোদন দিয়ে বেইজিংয়ের কাছে নতি স্বীকার করেছে—যদিও আশঙ্কা রয়েছে, এই দূতাবাস যুক্তরাজ্যের মাটিতে চীনের গুপ্তচর কার্যক্রম বাড়ানোর সহায়ক হবে।
একইভাবে, প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথম কানাডীয় নেতা হিসেবে এই মাসেই বেইজিং সফর করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তিনি এমন এক দেশের সঙ্গে “বাস্তববাদী” পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন, যে দেশটি নিকট অতীতে কানাডীয় নাগরিকদের কারাবন্দি করেছে, কানাডার নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে প্রকাশ্যে অপমান করেছে।
তবু কার্নি অতীতের তিক্ততা না ঘেঁটে চীনের সঙ্গে একটি “নতুন কৌশলগত অংশীদারত্ব” ঘোষণার পাশাপাশি চীনের কিছু বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির ওপর শুল্ক কমাতে সম্মত হন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার স্বার্থে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহাবস্থানের নীতি থেকে সরে আসতেও প্রস্তুত।
জোনাথন সিন বলেন, “গত বছর এই সময়ে যা কল্পনাও করা যেত না, বেইজিং পরিস্থিতিকে তার চেয়েও অনেক দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের পক্ষে নিয়ে এসেছে।” কিছু চীনা বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে না নতি স্বীকার করায়—চীনের প্রতি একধরনের ভূরাজনৈতিক সমীহও তৈরি হয়েছে।
বেইজিংয়ের রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ওয়াং ইওয়েই বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি কমানো এখন আমেরিকার মিত্রদের প্রয়োজন। সেই বিবেচনায় স্বাভাবিকভাবেই তারা চীনকে বেছে নিচ্ছে।”
তিনি বলেন, “চীনের শক্তি সম্মান আদায় করেছে। চীনের অবস্থানও সম্মান আদায় করেছে।”
এই সুযোগ কাজে লাগাতে দেরি করেনি বেইজিং। ট্রাম্পের আগ্রাসী পদক্ষেপ—শুল্ক আরোপ থেকে শুরু করে ভেনেজুয়েলা, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে বিমান হামলা—চীনকে, কিছুটা অপ্রত্যাশিতভাবেই, নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ও বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থার রক্ষক এবং গ্লোবাল সাউথের নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ করে দিয়েছে।
চীন দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করে আসছে। গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিয়ে ট্রাম্প যে ন্যাটোর ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছেন, তা এই প্রচেষ্টাকে আরও সহজ করেছে। ন্যাটো জোটকে বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে দেখে।
ডিসেম্বরে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ চীন সফরে গেলে (এ সময় সিচুয়ান প্রদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীদের ভিড়ে পড়েন তিনি), তারপর থেকেই পশ্চিমা নেতারা একের পর এক শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য বেইজিংমুখী হচ্ছেন।
বর্তমান অস্থির বিশ্ব পরিস্থিতিতে চীনকে অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করছেন শি। কানাডা ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি আয়ারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিনল্যান্ডের নেতারাও চীন সফর করেছেন। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের আসার কথাও রয়েছে।
থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জন এল. থর্নটন চীন সেন্টারের পরিচালক রায়ান হাস বলেন, “ট্রাম্প যখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঐতিহ্যগত অংশীদারদের মধ্যে বিভাজন বাড়াচ্ছেন, তখন চীন বসে বসেই কূটনৈতিক লাভ কুড়িয়ে নিচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ায় বেইজিংয়ের জন্য কূটনীতিতে ভুল করার সুযোগও বেড়েছে। এসব দেশকে কাছে টানতে চীনকে ছাড় দিতে হচ্ছে না; কেবল নিজেদের মূল লক্ষ্যগুলোতে দৃঢ় ও পূর্বানুমেয় নীতিতে থাকলেই হচ্ছে।”
এর ফলে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার প্রতি চীনের সমর্থন বা গত বছরে চীনের রেকর্ড ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক বাণিজ্য উদ্বৃত্তের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ইউরোপ ও পশ্চিমা মিত্রদের পক্ষে চাপ সৃষ্টি করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এতে করে বেইজিংয়ের দাবি করা স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ান আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে, এবং তাইওয়ানের ওপর চীন নিজস্ব চাপও বাড়াবে। ইতোমধ্যে, কানাডার দুই সংসদ সদস্য সরকারের অনুরোধে তাদের তাইওয়ান সফর সংক্ষিপ্ত করেছেন—প্রধানমন্ত্রী কার্নির চীন সফরের ঠিক আগে।
মার্কেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট ফেলো ও র্যান্ড চায়না রিসার্চ সেন্টারের গবেষক ইয়ানমেই শি বলেন, “বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে দেশগুলো যেন সীমা অতিক্রম না করে, তা নিশ্চিত করতে বেইজিং তার হাতে থাকা সব উপায়ই ব্যবহার করবে।”
তিনি বলেন, কানাডা ও চীনের ভূমিকা যেন উল্টে গেছে। একসময় কানাডার প্রধানমন্ত্রীদের বেইজিং সফর মানেই ছিল পারমাণবিক শক্তি বা উন্নত শিল্পপ্রযুক্তির প্রস্তাব। এবার কার্নি চীনের বৈদ্যুতিক গাড়িকে কানাডার বাজারে প্রবেশাধিকার দেওয়ার বিনিময়ে কানাডীয় ক্যানোলা তেল আমদানির ওপর বেইজিংয়ের শুল্ক কমানোর সুবিধা আদায় করেছেন। ইয়ানমেই শি বলেন, “এই ঘটনা চীনের প্রযুক্তি ও শিল্পোন্নয়নের উত্থান এবং পশ্চিমা বিশ্বের প্রযুক্তি ও শিল্প সক্ষমতার অবক্ষয়ের এক করুণ প্রতিচ্ছবি।”
পশ্চিমা নেতাদের এই সারিবদ্ধ সফর চীনের জন্য এক বড় প্রচারণাগত সাফল্য এনে দিয়েছে। এর আড়ালে চাপা পড়েছে দেশের ভেতরের বাস্তবতা—মন্দাগ্রস্ত অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানে দুর্বল হয়ে পড়া সামরিক নেতৃত্ব। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের এক শিরোনামে বলা হয়, “অস্থির বিশ্বে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চীনের কূটনীতি পরিচালনা করছেন শি।”গত মাসে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রসঙ্গ আরেকটি শিরোনামে লেখা হয়, “দাভোসে চীনের প্রতি প্রশংসা ছিল আন্তরিক।”
তবে কিছু চীনা বিশ্লেষক মনে করেন, পশ্চিমা দেশগুলোর এই নতুন ভারসাম্যের প্রচেষ্টা আসলে তাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান পরিবর্তনের চেয়ে বরং স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত সমাধান। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করেছে, যার ওপর ভর করে তার মিত্ররা সমৃদ্ধ হয়েছে। বিপরীতে, চীন রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ও অতিরিক্ত রপ্তানির মাধ্যমে অনেক দেশের বাজারে চাপ সৃষ্টি করে তাদের হতাশ করেছে।
সাংহাইভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ শেন ডিংলি বলেন, “পশ্চিমা বিশ্বের দিক থেকে এটি চীনের দিকে কোনো মৌলিক ঝুঁকে পড়া নয়, বরং নিছক একটি স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত প্রতিকার। – দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস