


ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে গাজার শান্তি প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দানকারী পিস কাউন্সিল থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। ইরাক যুদ্ধের কারণে আরব রাষ্ট্রগুলোর আপত্তির মুখে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনায়, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় টনি ব্লেয়ারকে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে রাখা হয়েছিল।
তবে ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দিয়ে ব্রিটেনকে এই যুদ্ধে জড়ান টনি ব্লেয়ার। এ সিদ্ধান্তের কারণে তার প্রতি আরব নেতাদের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস–এর এক প্রতিবেদনে আলোচনায় জড়িত সূত্রদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, ব্লেয়ারকে নীরবে শীর্ষ দায়িত্বের ভূমিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যদিও তাকে সাইডলাইনে কোনো ভূমিকায় রাখা হতে পারে।
ট্রাম্পের ঘোষিত সম্ভাব্য “বোর্ড অব পিস”-এ এখন পর্যন্ত ব্লেয়ারই ছিলেন একমাত্র প্রকাশ্যে আলোচিত প্রার্থী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট গত অক্টোবরে বলেছিলেন, তিনি ব্লেয়ারকে পছন্দ করেন, তবে শান্তি প্রক্রিয়ায় যুক্ত অন্যান্য দেশগুলোর তার প্রতি সমর্থন মিলবে কি না—সেটি যাচাই করা জরুরি।
তিনি বলেন, “টনিকে আমি সব সময়ই পছন্দ করি, কিন্তু তিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কি না—সেটা জানতে হবে। আমি নিশ্চিত হতে চাই যে টনি সবার কাছেই জনপ্রিয় হবেন, কারণ আমি সত্যিই জানি না।”
কূটনৈতিক এক সূত্র ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানান, ব্লেয়ারের “অন্য কোনো ধরনের ভূমিকা” থাকতে পারে—কিন্তু তা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হবে না এবং শান্তি বোর্ডেও নয়। ওই কর্মকর্তা আরও বলেছেন, “আমেরিকানরা তাকে পছন্দ করে, ইসরায়েলিরাও পছন্দ করে, কিন্তু এ অঞ্চলের আরব ও মুসলিম নেতাদের মধ্যে আপত্তি রয়েছে।”
সুস্পষ্টভাবে কোন কোন আরব নেতা ব্লেয়ারের ব্যাপারে আপত্তি তুলেছেন—তা জানা যায়নি। তবে চলতি বছরেই মিসরে ব্লেয়ারের সম্ভাব্য সফর নিয়ে দেশটিতে তীব্র জনরোষ ও রাজনৈতিক বিরোধিতা দেখা গিয়েছিল— সেখানে গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তার কেন্দ্রীয় ভূমিকা তো দূরের কথা।
মিসরের সাবেক মন্ত্রী কামাল আবু আইতা দ্য নিউ আরব–কে বলেন, “ব্যক্তিগতভাবে ব্লেয়ারকে আমরা বিশ্বাস করি না—তিনি উপনিবেশিক উত্তরাধিকারসংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তি। মিসরীয়রা গাজার যেকোনো ধরনের দখলের বিরোধী। গাজা কেবল তার অধিবাসীরাই শাসন করবে।”
ব্লেয়ারের সম্ভাব্য আঞ্চলিক সহযোগীদের অবস্থানও এখন অনেকটাই ম্রিয়মাণ। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সংযুক্ত আরব আমিরাত—অতীতে ব্লেয়ারকে অর্থের বিনিময়ে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি সেই আমিরাতই গাজায় স্থিতিশীলতা আনতে যে আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে—তাতে যোগ না দেওয়ার কথা বলেছে। টনি ব্লেয়ার এখনো যুক্তরাজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক বিতর্কিত এক রাজনীতিবিদ—ইরাক যুদ্ধে ব্রিটেনকে সম্পৃক্ত করার তার সিদ্ধান্তের কারণে।
২০০৩ সালে লন্ডন, আম্মান, বৈরুত ও কায়রোসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল এই যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের যোগদানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। তখন প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থাতেই দেশটিতে তার জনপ্রিয়তা নেমে গিয়েছিল মাইনাস ২০ পয়েন্টে।
পরবর্তীতে ইরাক যুদ্ধ নিয়ে স্যার জন চিলকটের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়—সাদ্দাম হোসেনের শাসন থেকে আসা হুমকি ব্লেয়ার অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরেছিলেন। টনি ব্লেয়ার ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও জনগণকে বলেছিলেন, সাদ্দামের গণবিধ্বংসী অস্ত্রের হুমকি ঠেকাতে এটাই নাকি তার হাতে ‘শেষ বিকল্প’; কিন্তু সেটি যে মোটেও সত্য নয়— চিলকট কমিশনের প্রতিবেদন তা-ও স্পষ্ট করেছে। এ প্রতিবেদনের পর তার জনপ্রিয়তা আরও কমে যায়।
ইরাকের প্রতিবেশী দেশগুলোও সাদ্দাম হোসেনের শাসকগোষ্ঠী পতনের পর এক দীর্ঘ নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়। পুরো অঞ্চলজুড়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে জিহাদি গোষ্ঠীগুলো। যেখান থেকে পরবর্তীতে আইসিসসহ অনেক সন্ত্রাসবাদী শক্তির উত্থান ঘটে এবং এদের ব্যবহার করে আঞ্চলিক শক্তিগুলো প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নামে।
ব্লেয়ার ২০০৭ সালে ব্রিটিশ রাজনীতি ছাড়েন, জনপ্রিয়তা তলানিতে পৌঁছে যাওয়ার পর। এরপর তিনি কোয়ার্টেট (ফিলিস্তিনের শান্তি প্রক্রিয়া তদারককারী যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও জাতিসংঘের সমন্বিত সংস্থার) প্রতিনিধি হিসেবে ইসরায়েল–ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন।
২০১৫ সাল পর্যন্ত ওই দায়িত্বে ছিলেন তিনি—যদিও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা তাকে ইসরায়েলপন্থী বলে বারবার অভিযোগ করেছে।
পরবর্তীতে তার প্রতিষ্ঠিত ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল চেঞ্জ–কেও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়—কারণ ২০১৮ সালে সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ডের পরও তারা সৌদি সরকারের পরামর্শক হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল।













