২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আর্ন্তজাতিক

ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে বাংলাদেশে গণপিটুনিতে নিহত দ্বিগুণ

ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে বাংলাদেশে গণপিটুনিতে নিহত দ্বিগুণ

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দ্বিগুণ মানুষ গণপিটুনি বা মবসন্ত্রাসের শিকার হয়ে মারা পড়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)।

শনিবার (৩১ জানুয়ারি) এমএসএফের দেওয়া জানুয়ারি মাসের মানবাধিকার প্রতিবেদন এমন চিত্র উঠে এসেছে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং নিজেদের অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে প্রতি মাসে মানবাধিকার প্রতিবেদন তৈরি করে এমএসএফ।

মব সন্ত্রাসে মানুষ হত্যার ঘটনা এ সরকারের আমলে বেড়েছে উল্লেখ করে এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মব বা গণপিটুনির ২৯টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২১ জন। গত ডিসেম্বরে এ ধরনের ২৪টি ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ১০ জন।

এমএসএফ বলেছে, ‘গণপিটুনির ঘটনায় জানুয়ারিতে নিহত ও আহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে।’ মানবাধিকার সংগঠনটি মনে করে, আইন অবজ্ঞা করে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা অবশ্যই ফৌজদারি অপরাধ, যা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবেই গণ্য করা হয়ে থাকে।

জানুয়ারিতে ২৯টি ‘গণপিটুনির’ ঘটনা ঘটেছে জানিয়ে এমএসএফ বলছে, এসব ঘটনায় আহত ২১ জন মারা গেছেন; গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন ২৬ জন। গণপিটুনির শিকার ১৭ জনকে আহতাবস্থায় পুলিশে সোপর্দ করা হয়।

নিহতদের মধ্যে একজন ছিনতাইয়ের অভিযোগে, ১০ জন চুরির অভিযোগে, দুজন খুনের অভিযোগে, একজনকে ডাকাতি, একজনকে পরকীয়া, চারজনকে বাকবিতণ্ডা, একজনকে মাদক ব্যবসা এবং একজনকে চাঁদাবাজির অভিযোগে হত্যা করা হয়।

অন্যদিকে, আটজনকে ডাকাতির অভিযোগে, তিনজনকে চুরির অভিযোগে, দুজনকে পরকীয়া, একজনকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে, তিনজনকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী হওয়ার অভিযোগে এবং কটূক্তি, প্রতারণা, প্রেম এ ধরনের অপরাধজনিত কারণে ৯ জনকে ‘গণপিটুনি’ দিয়ে গুরুতর আহত করা হয়।

নির্বাচনি সহিংসতা: জানুয়ারিতে ৪ জনের মৃত্যু, আহত ৫০৯ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষের খবরের মধ্যে জানুয়ারি মাসে মোট ৬৪টি নির্বাচনি সহিংসতার তথ্য দিয়েছে বেসরকারি সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)।

এসব সহিংসতায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছে ৫০৯ জন। আর ডিসেম্বর মাসে সারাদেশে সাতটি সহিংসতায় একজনের প্রাণহানির পাশাপাশি ২৭ জন আহত হয়েছিলেন।

জানুয়ারি মাসের শেষ দিনে শনিবার সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এমএসএফ-এর মাসিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনি সহিংসতা ছিল এ মাসের অন্যতম ‘সবচেয়ে ভয়াবহ’ মানবাধিকার সংকট। এর বাইরে চলতি মাসে ২৪টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ২১৫ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে দুষ্কৃতিকারীর হামলায় মারা গেছেন ছয়জন।

আগের মাসে ১৬টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১২৪ জন আহত হয়েছিলেন। ওই মাসে দৃস্কৃতিকারীর হামলায় নিহতের সংখ্যা ছিল ৪ জনে। তুলনামূলক বিশ্লেষণে এমএসএফ বলছে, ‘এটি প্রমাণ করে যে জানুয়ারি মাসে নির্বাচনি প্রক্রিয়া কার্যত প্রাণঘাতী সহিংসতার দিকে যাচ্ছে।’
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ও এমএসএফ সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনি সহিংসতার ৬৪টি ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৩টি ঘটনা বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষের।

এছাড়া বিএনপির অন্তর্দ্বন্দে ১৩টি, বিএনপি-স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের ৯টি সংঘর্ষ, গণঅধিকার পরিষদ-স্বতন্ত্রের একটি এবং বিএনপি-এনসিপির মধ্যে একটি ঘটনা ঘটেছে। আর ২৪টি রাজনৈতিক সহিংসতায় বিএনপির অন্তর্দ্বন্দে ১৬টি, বিএনপি-আওয়ামী লীগের সংঘর্ষের দুটি এবং বিএনপি-জামায়াতের পাঁচটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ জন, যাদের সকলেই বিএনপির কর্মী ও সমর্থক।

এছাড়া অপমৃত্যুর শিকার হয়েছেন আরও ১০ জন; যাদের মধ্যে ৪ জন বিএনপির, ২ জন জামায়াতের, ২ জন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের, ১ জন কিশোর এবং ১ জন বৃদ্ধা রাজনৈতিক রোষানলে পুড়ে মারা গেছেন। কারা হেফাজতে মৃত্যু ১৫ জনের এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে কারা হেফাজতে মোট ১৫ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে, গত মাসে এ সংখ্যা ছিল ৯ জনে।

জানুয়ারিতে মৃত্যুর মধ্যে ৪ জন কয়েদি ও ১১ জন হাজতি রয়েছেন। ১১ জন মৃত হাজতি বন্দির মধ্যে ৫ জন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। কেরাণীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ২ জন, গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ১ জন এবং জামালপুর জেলা কারাগারে ১ জন কয়েদি মারা যান।

এছাড়া হাজতির মধ্যে কেরাণীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ২ জন, নরসিংদী জেলা কারাগারে, লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারে, নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে, পাবনা জেলা কারাগারে, পটুয়াখালী জেলা কারাগারে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে, মেহেরপুর জেলা কারাগারে, নওগাঁ জেলা কারাগারে ও রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে একজন করে বন্দি মারা গেছেন। তবে সব বন্দির মৃত্যু হয়েছে কারাগারের বাইরে হাসপাতালে।

মেহেরপুর কারাগারে নয়ন নামের এক কয়েদিকে চোখ বেঁধে দফায় দফায় মারধরের অভিযোগ উঠেছে দায়িত্বরত কারারক্ষী মিশু, হযরত ও হাবিব নামের তিনজনের বিরুদ্ধে।

এমএসএফ বলছে, কারাগারে বন্দিদের শারীরিক নির্যাতনের আইনি কোনো বৈধতা না থাকলেও নয়নকে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়েছে—এমন অভিযোগ করেছেন সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত একাধিক বন্দি।