বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্বিতীয় সন্তান সায়মা। পেশায় মনোবিজ্ঞানী, অটিজ়ম বিশেষজ্ঞ। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাঁকে পাঁচ বছরের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিকর্তা পদে নিয়োগ করেছিল।
পদের অপব্যবহার, শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ভুল তথ্য, আর্থিক দুর্নীতি-সহ পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগের খাঁড়া ঝুলছিল মাথার উপর। সেই সমস্ত বিষয় নিয়ে তদন্ত শুরু হতেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে পদত্যাগ করলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজ়েশন (হু)-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক অধিকর্তা পদের দায়িত্ব ছিলেন সায়মা। যদিও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগই অস্বীকার করেছেন হাসিনা-কন্যা।
২০২৩ সালের নভেম্বরে এই পদের নির্বাচন হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির ভোটাভুটিতে এই গুরুত্বপূর্ণ পদটিতে জয়লাভ করেন হাসিনা-কন্যা। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে হু তাঁকে পাঁচ বছরের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিকর্তা পদে নিয়োগ করেছিল।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে শেখ হাসিনা ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়। সেই তদন্তের আওতায় উঠে আসে হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের নামও। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৫ সালের মার্চে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দু’টি মামলা দায়ের করে।
দুদকের তদন্ত এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যেই সায়মাকে হু-র দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে ছুটিতে যেতে বলা হয়। এই ছুটিটি ছিল বেতনহীন। এর পর দীর্ঘ সময় তিনি ওই ছুটিতেই ছিলেন এবং দায়িত্বে ফিরতে পারেননি। হু-র তদন্ত এবং বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগকে ঘিরেই তাঁর দায়িত্ব পালন নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল বলে মত সংশ্লিষ্ট মহলের।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) প্রধান টেড্রস অ্যাডানম গেব্রিয়েসাসের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান সায়মা। পদত্যাগপত্রে তিনি জানান, হু-র আঞ্চলিক অধিকর্তা হিসেবে নিজের দায়িত্ব কার্যকর ভাবে পালন করতে তাঁকে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সংস্থাটির নেতৃত্বের প্রতি তাঁর আস্থা ও বিশ্বাস আর আগের মতো নেই।
পদত্যাগ করার সময় সায়মা জানান, প্রায় এক বছর ধরে বেতন না পাওয়ায় তাঁর আর্থিক পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছিল। এই পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ও পদার্থবিজ্ঞানী ওয়াজেদ মিয়া এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্বিতীয় সন্তান সায়মা। ১৯৯৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতক হন। এর পর ২০০২ সালে ক্লিনিক্যাল মনস্তত্ত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন হাসিনা-কন্যা।
২০০৪ সালে স্কুল মনস্তত্ত্বের উপর বিশেষজ্ঞ ডিগ্রিও অর্জন করেন। ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় থেকেই সায়মা বাংলাদেশের মহিলাদের উন্নয়ন ও তাঁদের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর এই গবেষণা সে সময় বিশেষ স্বীকৃতিও পায়। ফ্লরিডা অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স তাঁর গবেষণাকে ‘শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনা’ হিসেবে স্বীকৃতিও দিয়েছিল।
২০০৪ সালে স্কুল মনস্তত্ত্বের উপর বিশেষজ্ঞ ডিগ্রিও অর্জন করেন। ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় থেকেই সায়মা বাংলাদেশের মহিলাদের উন্নয়ন ও তাঁদের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর এই গবেষণা সে সময় বিশেষ স্বীকৃতিও পায়। ফ্লরিডা অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স তাঁর গবেষণাকে ‘শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনা’ হিসেবে স্বীকৃতিও দিয়েছিল।
খন্দকার মাশরুর হোসেনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সায়মা। দম্পতির তিন কন্যা এবং এক পুত্র রয়েছে। ২০২১ সালে এই দম্পতির বিবাহবিচ্ছেদ হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদ থেকে অনির্দিষ্ট কালের ছুটিতে যাওয়ার পর থেকে সায়মা রয়েছেন দিল্লিতেই।
জুলাই গণ অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা বাংলাদেশের পাশাপাশি কানাডারও নাগরিক বলে দাবি করা হয়েছে বাংলাদেশের একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনে। যদিও তিনি বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক পদের জন্য নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন।
তাঁর এই দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েও বাংলাদেশের হয়ে হু-এর পদের জন্য লড়াই করার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল সেই সময়। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, দুর্নীতি প্রতিরোধকারী সংস্থাগুলি নির্বাচনের প্রাক্কালে দাবি তোলে তিনি যদি দ্বৈত নাগরিক হয়ে বাংলাদেশের মনোনয়নে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যান, সেটা নৈতিক ভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সায়মার বিরুদ্ধে দু’টি মামলা করে। এই মামলাগুলোতে অভিযোগ করা হয়েছে যে, তিনি তাঁর পদ সুরক্ষিত করার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা বিষয়ে জালিয়াতি করেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলেছে।

এর মধ্যে রয়েছে চীন সফরকে কেন্দ্র করে আর্থিক প্রতারণা এবং তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার অভিযোগ। অভিযোগ, সূচনা ফাউন্ডেশনকে ব্যাঙ্ক থেকে প্রায় ২৮ লক্ষ ডলার পাইয়ে দিতে প্রভাব খাটিয়েছিলেন সায়মা। এমনকি সায়মার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একটি জমি অবৈধ ভাবে অধিগ্রহণের অভিযোগ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
তবে সায়মার আইনজীবীরা এই অভিযোগগুলির বিরোধিতা করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন। সমস্ত অভিযোগ খারিজ করে গত ৩ জুলাই হু-কে একটি চিঠি দেন অভিযুক্তের আইনজীবীরা।
বাংলাদেশের প্রথম সারির এক সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, হু-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিকর্তা পদে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সায়মাকে মনোনয়ন দেওয়ার পর থেকেই স্বজনপোষণের অভিযোগ উঠেছিল। আন্তর্জাতিক মহলের একাংশের দাবি ছিল, তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা হওয়ার কারণেই সায়মাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল।
ফলে তাঁর যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি মনোনয়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। তবে স্বজনপ্রীতির এই অভিযোগ সায়মা বা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে কখনও স্বীকার করা হয়নি।
হু-র আঞ্চলিক অধিকর্তার পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পদে থাকা ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা, রোগ প্রতিরোধ এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কোনও সংক্রামক রোগ বা জনস্বাস্থ্য সঙ্কট দেখা দিলে পরিস্থিতি মোকাবিলাতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকে।
হু-র সদস্য দেশগুলির প্রতিনিধিরা ভোটের মাধ্যমে আঞ্চলিক অধিকর্তাকে নির্বাচিত করেন। নির্বাচিত ব্যক্তি সাধারণত পাঁচ বছরের জন্য এই দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালে সায়মা সদস্য দেশগুলির ভোটে হু-র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিকর্তা নির্বাচিত হয়েছিলেন।
সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সায়মাকে শুধু ছুটিতে পাঠানো নয়, তাঁকে হু-র আঞ্চলিক অধিকর্তার পদ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। একটি সূত্রের দাবি, ১২ অক্টোবর সায়মার পদে নিয়োগের জন্য মনোনয়ন আহ্বান করত হু। ডিসেম্বরে মনোনয়নের বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করার কথা ছিল হু-র। সদস্য দেশগুলির কাছ থেকে মনোনয়ন চাওয়া হত। মনোনয়নগুলি যাচাই-বাছাই পর্বের পর ২৪ জানুয়ারি নতুন আঞ্চলিক অধিকর্তা নির্বাচনের পরিকল্পনা ছিল। সেই আবহেই অর্থাভাব, আস্থাহীনতার কথা জানিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পদ ছাড়লেন হাসিনার কন্যা সায়মা। – আনন্দবাজার.কম থেকে













