২.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ থাকার দাবি জানিয়েছে সৌদি আরব, যা বিরল খনিজের বৈশ্বিক দৌড়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত করতে পারে বলে আশা করছে দেশটি।
এই খনিজগুলোর মধ্যে সোনা, দস্তা, তামা ও লিথিয়ামের মতো দামী ধাতুর পাশাপাশি ডিসপ্রোজিয়াম, টারবিয়াম, নিওডিয়ামিয়াম এবং প্রাসিওডিয়ামিয়ামের মতো বিরল খনিজ উপাদান রয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটি। বৈদ্যুতিক গাড়ি, উইন্ড টারবাইন এবং দ্রুতগতির কম্পিউটিং—সবকিছুতেই এসব ব্যবহৃত হয়।
উল্লেখ্য, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং উন্নত সামরিক সরঞ্জামের মতো প্রযুক্তির মূলে রয়েছে এসব গুরুত্বপূর্ণ ও বিরল খনিজ। বর্তমানে এর উৎপাদনে রয়েছে চীনের একচেটিয়া আধিপত্য। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বের ৯০ শতাংশ পরিশোধিত এবং ৬০ শতাংশ উত্তোলিত বিরল মৃত্তিকা খনিজ চীনের নিয়ন্ত্রণে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে খনিজ অনুসন্ধানে সৌদি আরবের বাজেট ৫৯৫ শতাংশ বেড়েছে। যদিও এটি কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত খনিজ উত্তোলনকারী দেশগুলোর তুলনায় কম, তবুও দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোকে নতুন খনি ইজারা দেওয়ার কাজের গতি বাড়ানো হয়েছে।
তবে খনি অনুসন্ধান আর চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন এক নয়। খনি বিশ্লেষক হান্টার বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, খনি খাত দীর্ঘমেয়াদি। একটি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা তৈরি করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি ২৯ বছর পর্যন্ত সময় নিতে পারে।’ দেশটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাচ্ছে, খনি বিনিয়োগে কর হ্রাস করছে এবং প্রতিষ্ঠিত দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে।
ফিউচার মিনারেলস ফোরামে রাষ্ট্রায়ত্ত খনি কোম্পানি ‘মাদেন’ ঘোষণা করেছে, আগামী এক দশকে তারা ধাতু ও খনি খাতে ১১০ বিলিয়ন (১১ হাজার কোটি) ডলার বিনিয়োগ করবে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এবং খাতে মেধাবীদের আকৃষ্ট করার বিষয়ও রয়েছে। মাদেনের সিইও বব উইল্ট বলেন, ‘আমরা বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করি যে, একা এই কাজ করা সম্ভব নয়।’ সৌদি আরবের তেলের (বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মজুদ) তুলনায় তাদের খনিজ সম্পদের মূল্য এখনো নগণ্য। তবে দেশটি অন্য কারণে এই খাতে বিনিয়োগ করছে।
সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা। খনি খাতকে এর অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে ধরা হয়েছে। পরিকল্পনা কেবল খনিজ উত্তোলনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশীয় শিল্পের জন্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলাও এর অংশ। উদাহরণস্বরূপ, দেশটি বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনের জন্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান অবকাঠামো দেশটিকে অন্য দেশ থেকে আহরণ করা খনিজ পরিশোধনের আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।
হান্টার বলেন, ‘গ্লোবাল সাউথ এবং আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব বিবেচনায় নিলে… কৌশলগতভাবে এখানেই বেশি খনিজ প্রক্রিয়াজাত করা যৌক্তিক।’
সৌদি আরবের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের নজর কেড়েছে। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ভারী বিরল মৃত্তিকা উত্তোলনের পর তা চীনে পাঠাত। কিন্তু গত বছর চীন সামরিক কাজে ব্যবহৃত ভারী বিরল মৃত্তিকা রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে।
গত নভেম্বরে ওয়াশিংটন সফরের সময় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও শিল্প খাতে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। সেই চুক্তির অংশ হিসেবে খনিজ খাতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার কথাও বলা হয়। পেন্টাগনের সমর্থনপুষ্ট মার্কিন কোম্পানি ‘এমপি মেটেরিয়ালস’ ঘোষণা করেছে যে, তারা মাদেন এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সঙ্গে মিলে সৌদি আরবে একটি নতুন শোধনাগার তৈরি করবে। এর ৪৯ শতাংশ মালিকানা থাকবে এমপি মেটেরিয়ালস ও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের হাতে।
থিংক ট্যাংক ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেলস ইনস্টিটিউট’-এর কো-চেয়ার মেলিসা স্যান্ডারসন বলেন, প্রসেসিং হাব হিসেবে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তাদের ‘নির্ভরযোগ্য বিপুল জ্বালানি’। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি আরামকোর দক্ষতা কাজে লাগিয়ে উন্নত পরিশোধন পদ্ধতি উদ্ভাবন সম্ভব। তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমে চীনকে ছাড়িয়ে সৌদি আরব ‘কম খরচে ও পরিবেশবান্ধব প্রসেসর’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
তবে পরিবেশ রক্ষায় তাদের ভূমিকা কেমন হবে, তা এখনও দেখার বিষয়। সম্প্রতি জাতিসংঘের পরিবেশ সম্মেলনে কয়েকটি সম্পদশালী দেশ সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও খনির পরিবেশগত ক্ষতি কমানোর খসড়া প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল, যার মধ্যে সৌদি আরবও অন্যতম।
স্যান্ডারসন ইঙ্গিত দেন, খনি কেন্দ্র হিসেবে এই রূপান্তর সহজ হবে না। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং আফ্রিকান দেশগুলোর সঙ্গে সৌদি আরবের কূটনৈতিক সম্পর্কের মিশ্র পরিস্থিতি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে তিনি বলেন, সৌদি আরব মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর দিকে ঝুঁকতে পারে, যেখানে তাদের নিজস্ব খনিজ ভাণ্ডার রয়েছে এবং আরামকোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বিদ্যমান।
স্যান্ডারসন বলেন, ‘অনেক দিক থেকে সৌদি আরবের এই অর্থনৈতিক রূপান্তর দেশটির রাজনৈতিক অবস্থান উন্নত করার জন্যই করা হচ্ছে… যাতে ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারা অপরিহার্য এক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘এটি তাৎক্ষণিক লাভের খেলা নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতা, প্রভাব এবং অর্জনের কৌশল।’