২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ধর্ম অবমাননা, গুজবের আদালত ও দিপুর পোড়া লাশ

দিপু চন্দ্র দাস আর নেই। কিন্তু দিপুকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো উঠে এসেছে, সেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দিপুকে নৃশংস হত্যার দায় রাষ্ট্রের। সমাজেরও।
দিপু ছিলেন একজন পোশাক শ্রমিক। বয়স পঁচিশের একটু বেশি। জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময় পার করছিলেন তিনি। পরিবারের ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ময়মনসিংহের ভালুকার একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে দিপু হয়ে উঠেছিলেন উন্মত্ত জনতার শিকার। প্রথমে মারধর। তারপর গাছে ঝুলিয়ে পিটিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা। শেষ পর্যন্ত আগুন।

দিপুর পোড়া দেহ প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। যেন ভয় দেখানোর নারকীয় আয়োজন। এর মাধ্যমে দেওয়া হলো এক সুনিপুণ বার্তা, ভিন্ন পরিচয়ের মূল্য হলো জীবন কেড়ে নেওয়া। এই নৃশংসতা কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি বিচ্ছিন্নও নয়। এটি দীর্ঘদিনের সামাজিক অসুখের এক ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ। ঘটনার শুরু কোথায়? ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে। প্রমাণ কী? কারও কাছে নেই।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বলছে, কেউ সরাসরি শোনেনি। কেউ দেখেনি। কোনো ফেইসবুক পোস্টও পাওয়া যায়নি। সেই রামু থেকে নাসিরনগর পর্যন্ত ফেইসবুক পোস্টের দোহাই দিয়ে হিন্দু-বৌদ্ধদের ঘরবাড়ি পোড়ানো হয়েছে। কেউ কিছু শোনেনি, দেখেনি, তবু দিপুর নামে অভিযোগ ছড়িয়েছে। গুজব ছড়িয়েছে। আর সেই গুজবই হয়ে উঠেছে মৃত্যুদণ্ড। এই দেশ কি গুজবের আদালতে চলে যাচ্ছে? এখানে কি আর আইন কাজ করে না?

দিপুর বাবা রবি চন্দ্র দাসের বক্তব্য রাষ্ট্রের জন্যও বিব্রতকর। ছেলের মৃত্যুর খবর তিনি পেয়েছেন ফেইসবুক থেকে। সরকারের কেউ যোগাযোগ করেনি। কোনো শোকবার্তা নেই। কোনো নিরাপত্তার আশ্বাস নেই। একজন নাগরিক নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রের এমন নীরবতা শুধু দুঃখজনক নয়, ভয়ঙ্করও বটে।

কারণ নীরবতা বার্তা দেয়। আর সেই বার্তা ভালো নয়।

ঘটনার সময় অন্তত ২০ জন ভিডিও করছিলেন। কেউ কাউকে থামাবার চেষ্টা করেননি। কেউ পুলিশ ডাকেননি। কেউ বলেনওনি—এটা অপরাধ। এই নির্লিপ্ত দর্শকসত্তা আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের বড় প্রমাণ। আমরা কি ধীরে ধীরে সহিংসতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি? অন্যের মৃত্যু কি আমাদের বিনোদন হয়ে উঠছে? আমাদের বিবেক কি একটু খানিক বিচলিত হয় না?

এখানে আরেকটি প্রশ্ন ওঠে। কারখানার ভূমিকা কী? অভিযোগ উঠেছে, ফ্লোর ম্যানেজার দিপুকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করে উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দেন। পুলিশে না দিয়ে জনতার হাতে তুলে দেওয়া কোন আইনে বৈধ? কারখানা কি শ্রমিকের নিরাপত্তার দায় নেয় না? একজন মানুষকে বলি দিয়ে কি প্রতিষ্ঠান বাঁচানো যায়?

রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দোষীদের শাস্তি দেওয়া হবে। এ কথা নতুন নয়। আমরা বহুবার শুনেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—শাস্তি কত দ্রুত? কত দৃষ্টান্তমূলক? সবচেয়ে বড় কথা সামাজিক প্রতিরোধ কোথায়? কারণ বিচার শুধু ঘটনার পর নয়। বিচার শুরু হয় ঘটনার আগেও।

এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটাকে একক বা আকস্মিক বলার সুযোগও নেই। বরং এটি একটি ধারাবাহিকতার অংশ, যা বাংলাদেশ বহু বছর ধরে দেখে আসছে। আমরা রামু ও নাসিরনগরের তাণ্ডব দেখেছি। দুর্গাপূজার মণ্ডপে হামলার দৃশ্যও আমাদের অচেনা নয়। কখনো ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে, কখনো কথিত কটূক্তির অভিযোগে, আবার কখনো নিছক গুজব ছড়িয়েই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভয়াবহ সহিংসতা ঘটাতে দেখেছি। উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রংপুরের তারাগঞ্জে দলিত সম্প্রদায়ের দুই ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা এখনও দগ্দগে ক্ষত হয়ে আছে। এবার সেই একই চিত্র দেখা গেল একটি পোশাক কারখানায়—যেখানে একজন শ্রমিককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হলো। ঘটনার ধরন বদলেছে এবার। শুধু পিটিয়ে খুন করে ক্ষ্যান্ত হয়নি তথাকথিত উত্তেজিত জনতা, লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটিয়েছে। অবশ্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে কবর থেকে পীরের লাশ তুলে এনে পোড়াবার ঘটনা দেখেছি রাজবাড়ীতে।

সংখ্যালঘুরা প্রতিবারই গুজবের গজবে পড়ে। প্রতিবারই গুজব আগে ছড়ায়, তারপর উন্মত্ত জনতা জড়ো হয়, এরপর আঘাত নেমে আসে সবচেয়ে দুর্বল অংশের ওপর। আর সবশেষে দেখা যায় ধীর তদন্ত, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া ও ভুক্তভোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষা। এই পুনরাবৃত্ত চিত্র প্রমাণ করে, সমস্যাটি কোনো একটি ঘটনার নয়; সমস্যাটি আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার কাঠামোতেই গেঁথে গেছে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ বাংলাদেশে এখন ভয়ঙ্কর অস্ত্র। এই অভিযোগ তুলতে প্রমাণ লাগে না। শুনেছি—এইটুকুই যথেষ্ট। তারপর শুরু হয় উত্তেজনা। জমায়েত। স্লোগান। আর শেষে লাশ। মনে হয় কোন ভোজের আয়োজনের মতো কিংবা মধ্যরাত্তির বারবিকিউ পার্টির মতো। মতের অমিল হলো, ব্যাস ধরে জ্যন্ত পুড়িয়ে মার। এই প্রবণতা যদি এখনই না থামে, তাহলে পরের দিপু কে? আজ হিন্দু। কাল ভিন্ন মতাবলম্বী মুসলমান। পরশু যে কোন কেউ। এই আয়োজন শুরু হলো সবেই, শেষ কিন্তু নয়। প্রকৃতির নিয়মই এমনটাই। ছেড়ে দেয় কিন্তু ছাড় দেয় না। এখানে বিষয় সংখ্যালঘু বনাম সংখ্যাগুরু নয়। বিষয় হলো মানবতা বনাম বর্বরতা।

বাংলাদেশের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে। নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলে। কিন্তু বাস্তবে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হলে সেই সংবিধান ‘কাজীর গরু‘ হয়ে যায়, যা ‘কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই’।

অন্তর্বর্তী সরকার বলেছে, নতুন বাংলাদেশে এমন সহিংসতার জায়গা নেই। এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। শুধু গ্রেপ্তার নয়। দরকার দ্রুত বিচার। দরকার প্রকাশ্য জবাবদিহিতা। দরকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। রাষ্ট্র যদি নিহতের পরিবারকে একা ফেলে দেয়, তাহলে সেটাও এক ধরনের সহিংসতা। দিপুর পরিবার শুধু বিচার চায় না। তারা চায় স্বীকৃতি। চায় রাষ্ট্র স্বীকার করুক—হ্যাঁ, দিপু আমাদের নাগরিক ছিল। তার জীবন মূল্যবান ছিল।

এই ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। বিশ্বজুড়ে সমালোচনা হচ্ছে। রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। কিন্তু আমরা কি আত্মসমালোচনা করছি? আমরা কি প্রশ্ন করছি, আমাদের সমাজ কোথায় যাচ্ছে? ধর্ম কি মানুষ মারতে শেখায়? নাকি মানুষই ধর্মকে হাতিয়ার বানাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই দিতে হবে।