


আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান দিয়ে ঢেকে দেওয়ার একটা দুঃখজনক চেষ্টা গত বছরের ৫ আগস্টের পরপরই দেখা গেছে। বিএনপি এবং বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ বিভিন্ন বাম দলের সমালোচনা সত্ত্বেও তা বন্ধ হয়নি। এমনকি এমনও উক্তি করা হচ্ছে– ‘১৯৭১ সালের স্বাধীনতা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।’ গত ৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী এই উক্তির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মজিবুর রহমান গত ৪ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের সার্কিট হাউস মাঠে আটদলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আরও বলেছেন, আবু সাঈদ ও মুগ্ধ নাকি জীবন দিয়ে দ্বিতীয় স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।
অবশ্য জামায়াতের নায়েবে আমিরের এ বক্তব্যে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতার বিরোধিতার মধ্যেই তাদের রাজনীতি বেঁচে আছে। তাই যে কোনোভাবেই হোক ’৭১ তথা স্বাধীনতাকে ব্যর্থ প্রতিপন্ন করতে পারলে সাধারণ মানুষের কাছে ওই সময়ে তাদের ভূমিকাকে সঠিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সহজ হয়ে যায়।
লাখ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নিজ দেশের স্বাধীনতাকে ব্যর্থ প্রমাণের এমন নজির বিশ্বের আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। বিশ্বের অন্তত তিনটি দেশ সম্পর্কে জানি, যেসব দেশে দশকের পর দশক ধরে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ চলেছে, কিন্তু কোনো পক্ষই দেশের স্বাধীনতাকে ব্যর্থ বলেনি। দেশ তিনটি হলো আফগানিস্তান, সোমালিয়া ও লাইবেরিয়া। তিনটি দেশেই জাতিসংঘ কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে।
দ্বিতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধে (১৮৭৮-১৮৮০) পরাজিত হওয়ার পর আফগানিস্তান ব্রিটিশ শাসনাধীনে আসে। অতঃপর ১৯১৯ সালের ১৯ আগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তিলাভ করে। সেই থেকে আফগান জনগণ ১৯ আগস্টকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে উদযাপন করে আসছে। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর গত ১০৬ বছরে আফগান ইতিহাসে অনেক ঘটনা ঘটেছে; অনেকবার শাসকের বদল হয়েছে; এবং প্রায় প্রতিবারই রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। অনেক শাসককেই প্রতিপক্ষের হাতে খুন হতে হয়েছে। কিন্তু কেউ কখনও তাদের স্বাধীনতা নিয়ে কোনো বিতর্ক করেনি। সোমালিয়া কিংবা লাইবেরিয়াতেও প্রায় একই অবস্থা। দুটি দেশেই কয়েক দশক ধরে নিজেদের মাঝে যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই আছে। তারা তাদের স্বাধীনতাকে বিতর্কিত হতে দেয়নি বা দিচ্ছে না। কিন্তু আমাদের দেশে ৩০ লাখ মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জিত হলেও মাত্র ৫৪ বছরেই সেই স্বাধীনতাকে ব্যর্থ প্রমাণ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে একটি মহল।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বেশ কিছু দুর্বল দিক ছিল– সন্দেহ নেই। তবে এগুলো মূলত শাসক শ্রেণির দুর্বলতা। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধের সময় জনগণ যেসব স্বপ্ন দেখেছিল তার অনেক কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। এসব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হতেই পারে। তাই বলে স্বাধীনতা ব্যর্থ– এমনটা বলা যায় না। স্বাধীনতা ব্যর্থ হলে দেশ আর নিজের থাকে না। স্বাধীন হয়েছি বা আছি বলেই ওই সমালোচনা করতে পারছি।
যে দৃষ্টিকোণ থেকেই আলোচনা করুন; আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য ছিল বিজাতীয় পাকিস্তানি শাসন থেকে মুক্তি। তিন হাজার কিলোমিটার দূর থেকে কেউ একজন এসে মাথার ওপর বসে শাসন করবে– এটা মানতে পারেনি এ দেশের মানুষ। এরপর ভাষা, সংস্কৃতিসহ জাতিগত ভেদ-বৈষম্য তো ছিলই। এসবের বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধরেছিল এ দেশের মানুষ এবং তারা সফলও হয়েছে। নিজেদের জন্য নতুন দেশ হয়েছে, নতুন মানচিত্র হয়েছে; হয়েছে নতুন পতাকা, নতুন জাতীয় সংগীত। আর এসবের মালিকানা কেবলই এই দেশের মানুষের। এটাই স্বাধীনতা। এখানে প্রথম আর দ্বিতীয় বলতে কিছু নেই।
কেউ কেউ বলেন এবং সত্যি কথাই বলেন, ’৭১-এ ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জিত হলেও আপামর জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি। এ কথায় অতিশয়োক্তির কিছু নেই। কিন্তু সত্যি তো এটাও যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল আওয়ামী লীগের মতো একটা বুর্জোয়া-আধা বুর্জোয়া মাল্টিক্লাস দলের নেতৃত্বে। মুক্তিযুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টি ও অন্য বামপন্থিদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু তাদের এই অংশগ্রহণ যুদ্ধের, এবং যুদ্ধপরবর্তী সময়ের রাজনীতি ও সরকার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে ছিল না। ফলে স্বাধীনতার পর থেকেই ধনবাদী পথে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে, যেখানে সমষ্টির ওপর গোষ্ঠীস্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে। গণঅভ্যুত্থান কি তাকে উল্টাতে পেরেছে? বরং গোষ্ঠীতন্ত্র নতুনভাবে জেঁকে বসেছে।
আমাদের সংবিধানের চার মূলনীতির একটি সমাজতন্ত্র। আওয়ামী লীগ তাকে উপেক্ষা করেছে। কথাটা সত্য। আবার এটাও সত্য, আওয়ামী লীগ তো সমাজতন্ত্রের দল নয়; বুর্জোয়া দল। একটা বুর্জোয়া দলের কাছ থেকে সমাজতন্ত্র আশা করাটা নির্বুদ্ধিতা। তা ছাড়া মনে রাখা দরকার, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কোনো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ছিল না; এটা ছিল একটা জনযুদ্ধ। ধনী-গরিব সব শ্রেণির মানুষ এতে অংশগ্রহণ করেছে। নেতৃত্ব ছিল ধনীদের হাতে, তাই শোষণমুক্তির প্রশ্নটি স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে নিছক স্লোগান হয়ে রইল। কিন্তু সে কারণে মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বাধীনতাকে ব্যর্থ বলার কোনো সুযোগ নেই।
স্বাধীনতার পর মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি বলে আওয়ামী লীগকে দায়ী করাই যায়। তার আগে স্বীকার করতে হবে– আওয়ামী লীগ এ দেশের মানুষের জাতীয়তাবাদী চেতনাকে শানিত করে স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে; তাকে একটা পরিণতি দিয়েছে। পরের কাজটুকু যাদের করার কথা ছিল, তারা সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। বামপন্থিরা ব্যর্থ হয়েছেন স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সময়োপযোগী অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলন গড়ে তুলতে। আর শাসকরা পুরোনো শোষণমূলক ব্যবস্থা জারি রেখেছে। দুবারের সামরিক শাসনের কথা বাদ দিলে গত ৫৪ বছরে তিনটি রাজনৈতিক দল দেশ পরিচালনা করেছে। দায় এই তিনটি দল ও তাদের সহযোগীদের ওপর বর্তাবে। এ সহযোগীদের মধ্যে জামায়াতও ছিল– কে না জানে!
মূল কথা, ব্যর্থ হয়েছে গত ৫৪ বছরে দেশ শাসনকারী দলগুলো; তাদের সঙ্গে যুক্ত রাজনীতিকরা। তাই স্বাধীনতাকে ব্যর্থ বলা যায় না। কেউ এমনটা বললে তা হবে স্বাধীনতার বিরোধিতারই নামান্তর। মোশতাক আহমেদ: অবসরপ্রাপ্ত পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার, জাতিসংঘ ও কলাম লেখক













