৫ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শেষের পাতা

শিশুদের দৈনন্দিন কাজ শেখানোর ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা যে ভুল করে থাকেন

শিশুদের দৈনন্দিন কাজ শেখানোর ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা যে ভুল করে থাকেন

শিশুদের দৈনন্দিন কাজকর্ম শেখানোর বেলায় অভিভাবকেরা কোথায় কোথায় ভুল করেন, সেই বিষয়গুলো নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তুলে ধরেছেন এক মার্কিন শিক্ষিকা। ঘরের ছোট ছোট কাজে শিশুদের অংশগ্রহণ কীভাবে তাদের আত্মবিশ্বাস ও মনোযোগ বাড়ায় এবং পারিবারিক বন্ধন শক্ত করে, লেখাটিতে সেসব বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাগাজিন দি আটলান্টিকে প্রকাশিত লেখাটির সংক্ষেপিত অনুবাদ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

আমি যে মন্টেসরি স্কুলটি চালাই, সেখানে প্রতি বছর সেপ্টেম্বরে দুপুরের খাবারের পর শিশুদের ঘর পরিষ্কারের কাজ করতে দেওয়া হয়। তারা ঝাড়ু আর ছোট ডাস্টপ্যান হাতে পুরো ঘরে ছোটোছুটি করে। এতে ঘর তো পরিষ্কার হয়ই না, বরং আগের চেয়ে আরও বেশি অপরিষ্কার হয়ে যায়।

এই কাজ যদি শিক্ষকদের দিয়ে করানো হতো, তাহলে দেখা যেত ঘর একদম ঝকঝকে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য শুধু একটি পরিষ্কার ক্লাসরুম নয়। আমরা শিশুদের দায়িত্ববোধ, আত্মবিশ্বাস ও কাজ করার সক্ষমতা বিকাশে সহায়তা করতে চাই। এভাবে শিশুদের কাজের সুযোগ দেওয়ায় দেখা গেল তিন-চার মাসের মধ্যেই তাদের ঝাড়ু দেওয়ার দক্ষতা আগের চেয়ে বেশ উন্নত হয়েছে। কিছুদিন পর দেখা গেল, তারা কোনো রকম নির্দেশনা ছাড়াই নিজে থেকে পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে শুরু করেছে।

মন্টেসরি স্কুলের ক্লাসরুমে বছরের পর বছর কাজ করার পর আমি ভেবেছিলাম, একইভাবে আমার পরিবারেও দায়িত্ব নেওয়ার একটি সংস্কৃতি আপনা-আপনিই গড়ে উঠবে। কিছু ভুল না করলে হয়তো সেটাই হতো।

আমার বড় মেয়ে যখন ছোট, তখন ও একবার কেক বানানোর জন্য বাটিতে থাকা বাটার নেড়েচেড়ে দেখছিল। আমি ওর হাত থেকে চামচটি কেড়ে নিয়েছিলাম। আরেকবার আমার ছেলে একা একা একটি প্যান্ট ভাঁজ করতে চাচ্ছিল। আমি তৎক্ষণাৎ প্যান্টটি নিয়ে আরও সুন্দরভাবে ভাঁজ করে দিয়েছিলাম। এ ধরনের আরও অনেক ছোট ছোট ঘটনার পর আমি লক্ষ্য করলাম, আমার সন্তানদের মধ্যে অন্যকে সাহায্য করার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। গবেষকেরাও আমাকে জানালেন, এমনটা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের সমাজে ঘরের বেশিরভাগ কাজ এখনো মা-বাবাকেই করতে হয়। ২০০৯ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর করা এক গবেষণায় দেখা যায়, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুরা ঘরের কাজের মাত্র ৩ শতাংশেরও কম করে থাকে।

ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক লুসিয়া আলকালা জানান, বর্তমানে অনেক অভিভাবক ঘরের কাজ বলতে বোঝেন শুধু শিশুর নিজের উপকারে লাগবে এমন কাজ। যেমন- নিজের ঘর পরিষ্কার করা। পরিবারের সবার উপকারে আসবে এমন কাজগুলো তারা শিশুদের ক্ষেত্রে তেমন গুরুত্ব দিয়ে ভাবেন না।

‘দি অ্যানথ্রোপলজি অব চাইল্ডহুড’-এর লেখক ও সম্পাদক ডেভিড এফ ল্যান্সি আমাকে বলেছিলেন, ‘অনেক মা-বাবাই তাদের সন্তানদের নিজেদের যত্ন নেওয়া বা পরিবারের জন্য কিছু করার ব্যাপারে জবাবদিহির মধ্যে রাখেন না।’

এই ‘জবাবদিহি না থাকার’ বিষয়টি হয়তো শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ ঘরের কাজ থেকে শিশুর শেখার অনেক সুযোগ থাকে। এসব কাজে গভীর মনোযোগ, পরিকল্পনা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা লাগে। এসব দক্ষতা মিলেই যেকোনো কাজ সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার ক্ষমতা তৈরি করে।

ঘরের কাজ শিশুদের এক ধরনের ভেতরের তৃপ্তি দেয়। ধরুন, একটি শিশু একগাদা কাপড় ভাঁজ করছে- এটা বিশৃঙ্খলা থেকে শৃঙ্খলা আনার একটি প্রক্রিয়া। এই সাফল্য দেখে শিশুটি বিশ্বাস করতে শেখে যে নির্দিষ্ট একটি কাজ সে সফলভাবে করতে পারবে। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

ল্যান্সির মতে, ঘরের কাজ শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতাই নয়, সামাজিক সম্পর্ক গড়তেও সাহায্য করে। কাজের মাধ্যমে শিশুরা পরিবারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা সাধারণত অন্যদের সাহায্য করতে এবং সমর্থন দিতে আগ্রহী থাকে।

অনেক অভিভাবক জানান, তাদের বাচ্চারা সাহায্য করতে চায় না। এটা আংশিকভাবে সত্যও। তবে গবেষণা বলছে, শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের কাজ অনুকরণ করে থাকে। ওরা এলোমেলোভাবে কাজ করে কাজ আরও বাড়িয়ে দেবে- এই কারণে মা-বাবা অনেক সময় শিশুদের দূরে সরিয়ে রাখেন। এতে শিশুর আগ্রহ কমে যায়।

আসলে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের ঘরের কাজে যুক্ত করা যায়, যদি অভিভাবকরা সুযোগ দেন। এজন্য শুরুতেই বাবা-মাকে শিশুর প্রতি ধৈর্যশীল এবং একইসঙ্গে কোমল আচরণ দেখাতে হবে।

শিশুমনোবিজ্ঞানী কারা গুডউইনের মতে, মা-বাবাকে মাঝে মাঝে কিছুটা কঠোরও হতে হবে। কারণ, শুরুতে শিশুরা দায়িত্ব নিতে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করে। তবে ধীরে ধীরে কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পারা থেকে ওরা এক ধরনের তৃপ্তি পায়।

সব শুনতে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে মোটেও তা নয়। তবে আমি বিশ্বাস করি, শিশুদের বাস্তব জীবনে প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখানো অত্যন্ত জরুরি।
যদিও আমি নিজের অজান্তেই আমার বড় দুই সন্তানকে ঘরের কাজ থেকে বিমুখ করে ফেলেছিলাম- একজনকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করে, আরেকজনকে কাজ থেকে সরিয়ে রেখে।

তবে এখন আমার চার সন্তান। গত কয়েক বছরে আমি শিখেছি কীভাবে তাদের সাহায্য করার ইচ্ছাকে স্বাগত জানাতে হয়। একবার গবেষক গ্যাসকিনস আমাকে বলেছিলেন, ‘শিশুরা তাদের প্রিয়জনদের জন্য কিছু করতে চায়।’ কথাটি একেবারেই সত্য। আমি যখন আমার সন্তানদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম- তোমরা কেন ঘরের কাজ করো? তারা সবাই একই উত্তর দিয়েছিল, ‘তোমাকে সাহায্য করতে চাই বলেই করি।’ মূলত তারা আমার কাছ থেকে শুধু অনুমতির অপেক্ষায় ছিল। – দ্য আটলান্টিক