ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র এবং বিভিন্ন দলের হয়ে মোট ৮০ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন। তাদের অনেকেই নিজের এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বিগ্ন। এই উদ্বেগ ও শঙ্কার কারণ হিসেবে হুমকি, চাপ, সংখ্যালঘু নির্যাতন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নানামুখী সাম্প্রদায়িক প্রচারণার কথা উল্লেখ করছেন তারা৷
তারা মনে করছেন, সরকার, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন নির্বাচনের জন্য অবাধ পরিবেশ এবং ‘লেভেল প্লেয়িং’ মাঠ নিশ্চিত করতে পারেনি। এ কারণে সংখ্যালঘু প্রার্থীরা নির্বাচনের আগের এবং পরের সময়কে নিজের এবং সমর্থকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন।
আসন্ন নির্বাচনে ৮০ জন সংখ্যালঘু প্রার্থীর মধ্যে ১২ জন স্বতন্ত্র। বাকিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭ জন সংখ্যালঘুকে মনোনয়ন দিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। এছাড়া বিএনপির ছয়জন, জাতীয় পার্টির চারজন, জামায়াতের একজন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র একজন সংখ্যালঘু প্রার্থী রয়েছে।
দেখা গেছে বিএনপি এবং জামায়াতের সংখ্যালঘু প্রার্থীরা নিরাপত্তা নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন নন। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার কারণে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভোটার উপস্থিতির হার কেমন হবে সে বিষয়ে তারা চিন্তিত। জাতীয় পার্টি, বাম দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অনেকে নিজেদের ও সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তায় ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে – এমন মত প্রকাশ করেছেন। নিরাপত্তা জোরদার করার বিষয়ে সরকার, নির্বাচন কমিশন, কিংবা পুলিশের দিক থেকে তৎপরতা কম বলে মনে করেন তারা। নানা সময় অভিযোগ জানিয়েও সদুত্তর পাননি বলেও অভিযোগ তাদের।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলন করে সংখ্যালঘু প্রার্থী এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের উদ্বেগ ও শঙ্কার বিষয়টি তুলে ধরেছে। চলমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণে এমন শঙ্কার উল্লেখ করে পরিষদ জানায়, জানুয়ারি মাসের ২৭ দিনে বাংলাদেশে ৪২টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে যার মধ্যে হত্যার ঘটনা ১১টি৷ ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পরিবেশ এবং প্রার্থীদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয় হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে।
সংখ্যালঘু প্রার্থীদের যত উদ্বেগ : সংখ্যালঘু প্রার্থীদের অনেকেই মনে করেন ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই পরিস্থিতি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে । বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ছয়জন এবং বাসদ (মাক্সবাদী) সাতজন সংখ্যালঘুকে মনোনয়ন দিয়েছে। বরিশাল-৫ আসনে বাসদের প্রার্থী, চিকিৎসক মনীষা চক্রবর্তী মনে করছেন প্রার্থী এবং সংখ্যালঘু ভোটার উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
মনীষা চক্রবর্তী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘শুধু সংখ্যালঘু ভোটার নয়, প্রার্থীরাও নিরাপদ নেই। প্রার্থী ওসমান হাদীকে হত্যা করে খুনি সীমান্ত পার হয়ে গেছে। সেটার বিচার হয়নি। সে তো সংখ্যালঘু ছিল না। এখানে সংখ্যালঘু-গুরু নির্বিশেষে সকলের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার হয়নি পুরোপুরি। এটাই প্রধান সমস্যা। সকলের নিরাপত্তা দেওয়া জরুরি। একইসঙ্গে ওসমান হাদী হত্যার বিচার হয়নি। দীপু দাসকে কীভাবে পুড়িয়ে মারা হয়েছে! সে বিচারও হয়নি।’’
তিনি আরো বলেন, ‘‘সংখ্যালঘুদের মধ্যে মব সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা যে সংখ্যালঘু – এই পরিচয় জানলে তাদের কোনো মবের শিকার হতে হয় কিনা, যেভাবে অহরহ মানুষকে ‘ভারতের দালাল’ আখ্যা দেওয়া হয়। এগুলো নিয়ে তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এগুলো আমরা প্রশাসনে বারবার বলেছি৷ বলেছি, তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য, এসব ক্ষেত্রে তাদের তদারকি বাড়ানোর জন্য।’’
রাজধানী ঢাকায় থেকেও একই রকম শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী বহ্নি বেপারী। ঢাকা-১০ আসন-এর প্রার্থী তিনি। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের মৌখিকভাবে অভিযোগ জানিয়েও ফল পাননি বলে দাবি তার।
বহ্নি বেপারী বলেন, ‘‘সংখ্যালঘু ভোটারেরা আমার কাছে জানতে চেয়েছে, তারা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে পারবে কিনা- আমি সেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারি কিনা৷ আমি নিজেই তো আসলে এলাকায় নিরাপদে ঘুরতে পারবো সেরকম অনুভব করি না। যদিও প্রশাসন বলছে, কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু প্রশাসন তো প্রশাসনের জায়গায় বসে থাকে। ’’
বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক গোপালগঞ্জ-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী। এই আসনটি থেকে নির্বাচিত হতেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সেই আসনের প্রার্থী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকও ‘নির্বাচনের মাঠ’ সবার জন্য সমান অনুকূল নয় বলে অভিযোগ করলেন। বড় দলগুলো তার সমর্থকদের হুমকি-ধামকি দেয় বলেও অভিযোগ তার।
গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এখানে ৫ আগস্টের পর সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীও চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন। প্রকাশ্যে অনেকে আমাদের সঙ্গে কাজ করতে পারছে না। আমাদের কর্মীরা বিভিন্ন জায়গায় প্রচারণা চালাতে গেলে বড় রাজনৈতিক দলের কর্মীরা হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। এই অবস্থায় প্রচার প্রচারণা চালানো কঠিন।’’
পার্বত্য চট্টগ্রামে ১০ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। সেখানেও সংখ্যালঘুরা ভোট নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন বলে একাধিক প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। খাগড়াছড়ি আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া। এই আসনে মোট প্রার্থী ১১ জন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন সমীরণ দেওয়ান এবং ধর্মজ্যোতি চাকমা।
নিরাপত্তা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে ধর্মজ্যোতি চাকমা ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমি নিজের ভয় দূর করে দিয়েছি। সংখ্যালঘুদের ভয়-ভীতি দূর করার জন্যই আমি প্রচারে নেমেছি। আমি নির্বাচনে থাকলে সংখ্যালঘুরা ভোট দিতে যাবেন।’’
শঙ্কাহীন বিএনপি, জামায়াতের প্রার্থী : স্বতন্ত্র ও ছোট দলের প্রার্থীদের মতো বিএনপি ও জামায়াতের সংখ্যালঘু নেতারা নির্বাচনের মাঠকে এতটা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন না। নিজেদের নিরাপত্তার শঙ্কাও নেই বলে জানিয়েছেন তারা। তবে সংখ্যালঘু ভোটারদের মনে ভয় থাকার বিষয়টি তারাও স্বীকার করেছেন।
বিএনপির সংখ্যালঘু ছয় প্রার্থীর মধ্যে দুজন কেন্দ্রীয় নেতা। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গরেশ্বর চন্দ্র রায় ঢাকা-৩ এবং দলের ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী প্রার্থী হয়েছেন মাগুরা-২ থেকে।
সংখ্যালঘু প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে নিতাই রায় চৌধুরী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেনি তা বলবো না। তবে ব্যাপক কিছু হয়নি। দীপু দাসকে পুড়িয়ে মারার ঘটনাটা বেশি মর্মান্তিক হয়েছে। যেসব ঘটনা ঘটছে, সেসবে তো বিএনপি জড়িত নয়। আমরা বরং ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছি। ৫ আগস্টের পর থেকে আমরা সবসময় তাদের পাশে ছিলাম, আছি, যাতে তাদের মধ্যে কোনো ভয়-ভীতি না থাকে।’’
নিতাই রায় চৌধুরীর আশা, সারা দেশে সংখ্যালঘুরা ধানের শীষে ভোট দেবে। তিনি মনে করেন, সংখ্যালঘুরা ভোটকেন্দ্রে যাবে, ‘‘একটাই কারণে- তাদের রিয়েলাইজেশন হচ্ছে আমরা এখানকার নাগরিক, আমরা এখানে বসবাস করি। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য আছে। কৃষক- শ্রমিকেরা মাঠে কাজ করে। সর্বস্তরের মানুষ মনে করে, ভোট না দিলে বরং নিজেদের কোণঠাসা করে ফেলা হবে।’’
জামায়াতে ইসলামীর একমাত্র সংখ্যালঘু প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী। তিনি খুলনা-১ আসনে দাঁড়িপাল্লা মার্কায় নির্বাচন করছেন। এই আসনে মোট আটজন সংখ্যালঘু প্রার্থী। কৃষ্ণ নন্দী নিজের নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি দেখছেন না।
জামায়াতের হিন্দু শাখার ডুমুরিয়া উপজেলার সভাপতি কৃষ্ণ নন্দী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমার নিরাপত্তার কোনো অভাব নেই। কোনো হুমকিও পাইনি। নির্বাচনি পরিবেশও ভালো। সংখ্যালঘুদের আমি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দেবো। তারা আমার বুকের মধ্যে থাকবে। যে জিতুক যে হারুক সবসময় তাদের নিরাপত্তা দেবো।’’
সংখ্যালঘু নিপীড়নে জামায়াতের অতীতের ভূমিকা প্রসঙ্গে কৃষ্ণ নন্দী বলেন, ‘‘কোনো ব্যাপার না। একাত্তর আর ছাব্বিশ সাল এক না।’’
জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ : বিভিন্ন সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় গিয়ে প্রর্থীরা ভোট চাইছেন। কেন্দ্রে কারা কতটা মন থেকে সংখ্যালঘুদের উপস্থিতি প্রত্যাশা করছেন তা বোঝার চেষ্টা করছেন সংখ্যালঘুরা। কারণ, কিছু কিছু প্রার্থীর ভোট চাওয়ার ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া জামায়াতের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করার অভিযোগও তুলছেন কোনো কোনো প্রার্থী।
ঢাকা-১০ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী বহ্নি বেপারী বলেন, ‘‘একেবারেই আশা করতে পারছি না যে, শেষ পর্যন্ত সংখ্যালঘু ভোটারেরা কেন্দ্রে যেতে পারবে। সেটা শুধু ঢাকায় নয়, ঢাকার বাইরেও। অনেক জায়গায় সংখ্যালঘুরা বলছে, তারা ভোট দিতে যাবে না। এমনকি জামায়াতের একটা প্রচ্ছন্ন হুমকি আছে যে, যদি ভোট দিতে না যায় তাহলে সংখ্যালঘুরা নিরাপদে থাকবে। নিরাপত্তা জামায়াত দেখবে। যদি ভোট দিতে যায়, তাহলে নিরাপত্তা দেখতে পারবে না।’’
গোপালগঞ্জ-৩ আসনের প্রার্থী, হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক অভিযোগ করেছেন, বড় দলগুলোর পক্ষ থেকে তার সংখ্যালঘু সমর্থকদের দেশে থাকতে দেওয়া হবে না বলেও হুমকি দেয়া হচ্ছে।- প্রণব বল, জার্মান বেতার ডয়চে ভেলের প্রতিনিধি
এ অভিযোগ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মো. শাহজাহান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এটা একেবারেই অবান্তর অভিযোগ। আমরা যদি সংখ্যালঘুদের নিরুৎসাহিত করি, তাহলে জামায়াত কেন সংখ্যালঘুদের মধ্য থেকে প্রার্থী দিলো! এ সমস্ত পুরনো বয়ান। এবারের নির্বাচনে আমরা পলিসি সামিট দিয়েছি। দেশ কীভাবে পরিচালিত হবে, সংখ্যালঘুদের অধিকার কী – সবকিছু পরিষ্কার করা হয়েছে। আমরা মনে করি, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সংখ্যালঘুরা আমাদের প্রচুর ভোট দেবে।’’
এদিকে, নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিলে ‘জীবন স্বচ্ছল হবে’ এমন আশ্বাসও দেওয়া হচ্ছে প্রচারণার মাঠে। এই ধরনের আশ্বাসকেও ভোটার উপস্থিতি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী সংখ্যালঘু প্রার্থীদের চাপে ফেলবে বলে মনে করছে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ।
এ প্রসঙ্গে পরিষদের নেতা নির্মল রোজারিও বলেন, ‘‘পত্রিকায় দেখেছি, জীবনমান পরিবর্তন করে দেবে, অর্থ দেবে – তাদের এমন আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। এটা যদি হয়, সেটা অনৈতিক কাজ। ভোটের বিনিময়ে কেন অর্থ দিতে হবে? এটা গণতন্ত্রের জন্য ভালো নয়। অর্থের বিনিময়ে যারা ভোট নিতে চায়, তাদের উদ্দেশ্য ভালো নয় – দুরভিসন্ধিমূলক।’’
জনগোষ্ঠীর নেতারা যা ভাবছেন
সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তি ও সংগঠনের নেতারাও জনগোষ্ঠীর ভোটে অংশগ্রহণ এবং ভোট পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত। কারণ, অতীতে নির্বাচনের আগে-পরে বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-নির্যাতনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া যখন-তখন সংখ্যালঘুদের ‘আওয়ামী লীগ’ কিংবা ‘ভারতীয়’ ট্যাগ দেওয়া হয়- এটাও ভয়ের কারণ।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি নির্মল রোজারিও ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘অতীতের অভিজ্ঞতায় অনেক সময় দেখা গেছে, ভোটের কারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন নিপীড়িত-নিষ্পেষিত হয়েছে। এর ফলে তাদের মনের মধ্যে ভয় ও সঙ্কোচ কাজ করে। সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে, কিংবা নির্বাচনকে সফল করার জন্য যেসব সংস্থা কাজ করছে, তাদের এক্ষেত্রে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য যাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।’’
নির্মল রোজারিও আরো বলেন, ‘‘সংখ্যালঘুরা কোনো বিশেষ দলকে ভোট দেয় না। সংখ্যালঘুরা মুক্তিযুদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িকতার চেতনায় বিশ্বাস করে। যারা ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাসী, তাদের মূলত ভোট দিতে চায় সংখ্যালঘুরা। একটা সম্প্রীতিপূর্ণ দেশ হবে, একটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হবে- যেখানে সকল ধর্মের মানুষ সমান অধিকার পাবে- এই প্রত্যাশা আমাদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে কাজ করে বরাবরই।’’
প্রশাসন যা বলছে
দেশে চলমান সহিংসতার ঘটনার সবগুলোকে নির্বাচনকেন্দ্রিক বা সংখালঘু-নির্যাতন হিসেবে আখ্যায়িত করতে নারাজ প্রশাসন৷ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়টিতে যথেষ্ট নজরদারি রয়েছে বলে দাবি তাদের। এছাড়া ভোটের মাঠ সব প্রার্থীর জন্য সমান রয়েছে বলে মনে করে নির্বাচন কমিশন৷
নির্বাচনে সংখ্যালঘু প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে বলে পুলিশের দাবি। বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (অপরাধ ও অপারেশন) খন্দকার রফিুকল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘যদি ভোটের ক্ষেত্রে কোথাও নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয়, সেক্ষত্রে পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্র্রেট নিয়োজিত রয়েছে। যে জায়গাগুলোতে হিন্দু বা অন্য জনগোষ্ঠী রয়েছে, ঝুঁকি আছে – সেসব এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছি। ভোটারদের আস্বস্ত করা যে, এই ভীতিকর পরিবেশ থাকবে না, শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে পারবে।’’
নরসিংদী ও ভালুকায় সংখ্যালঘু তরুণকে পুড়িয়ে মারা কিংবা রাউজানে সংখ্যালঘুদের বাড়িতে আগুন দেওয়ার সাম্প্রতিক এবং বহুল আলোচিত ঘটনা প্রসঙ্গে খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘এগুলো কিন্তু নির্বাচনকেন্দ্রিক ঘটনা নয়। নির্বাচনের সঙ্গে সংশিষ্ট নয়। এগুলোর জন্য মামলা হয়, আসামি ধরা পড়ে। তবে এ সময় এই ধরনের ঘটনা ঘটলে স্পর্শকাতরতা বাড়ে – আমরাও বুঝি। এ জন্য পুলিশকে বলেছি তৎপর থাকতে। তাদের একটু আস্বস্ত করা, এরকম কিছু ঘটতে পারে – এ বিষয়ে সজাগ থাকতে। এ ক্ষেত্রে জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য পুলিশকে বলা হয়েছে। যারা ঝামেলা করতে চায়, তাদের একটু অস্বস্তিতে রাখতে হবে।’’ তিনি আরো বলেন,‘‘প্রতিটি এলাকার এসপিকে নির্বাচনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বা কেন্দ্র নির্ধারণ করতে বলেছি। কোন এলাকায় কী ধরনের ঝুঁকি, তা নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী তারা টহলের ব্যবস্থা করবে।’’