মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশের ডলারের বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। গত তিনদিনে (১-৪ মার্চ) আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ২০-৩০ পয়সা পর্যন্ত বেড়েছে।
আর কার্ব মার্কেটে (খুচরা বাজার) দর বেড়েছে অন্তত ২ টাকা। রিজার্ভের শক্তিশালী অবস্থান ও রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধির মধ্যেও ডলারের দরবৃদ্ধির ঘটনায় বাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় দেড় বছর পর দেশে ডলারের দর উসকে ওঠাকে সংশ্লিষ্টরা বিপদের সংকেত হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, গত ৪ঠা মার্চ দিনের শুরুতে আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৪০ পয়সা। কিন্তু দিনের শেষের দিকে তা ১০-২০ পয়সা পর্যন্ত বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে প্রতি ডলারের বিনিময় হার দাঁড়ায় ১২২ টাকা ৫৫ পয়সায়। আর রেমিট্যান্স কেনার ক্ষেত্রে ডলারের দর বেড়ে ১২২ টাকা ৬০ পয়সায় ঠেকে।
অন্যদিকে রাজধানীসহ সারা দেশের এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোয় (কার্ব মার্কেট) প্রতি ডলারের দর ২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। খুচরা বাজারে গত ৪ঠা মার্চ ডলারের দর ১২৬ টাকা ৭৫ পয়সা পর্যন্ত গিয়ে ওঠে। রাজধানীর মতিঝিল ও কারওয়ান বাজার এবং চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় খবর নিয়ে এ তথ্য জানা গেছে। যদিও ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের সর্বোচ্চ বিনিময় মূল্য ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। আর কার্ব মার্কেটে সর্বোচ্চ ১২৪ টাকায় সীমাবদ্ধ ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও ব্যাংক নির্বাহীরা বলছেন, এ মুহূর্তে দেশে ডলারের দরবৃদ্ধির কোনো কারণই থাকার কথা নয়। কারণ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীরা নিজেদের সঞ্চয়ও দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তবে কেউ কেউ যুদ্ধাতঙ্কের সুযোগ নিতে পারেন। এক্ষেত্রে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় ত্বরিত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
বিরাজমান পরিস্থিতি তীক্ষ্ণ নজরদারির মধ্যে রয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশে ডলারের পর্যাপ্ত মজুদ ও সরবরাহ রয়েছে। প্রবাসীরা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও এখন শক্তিশালী অবস্থানে। তবে কেউ কেউ যুদ্ধাবস্থাকে ক্যাপিটালাইজের চেষ্টা করছেন। এ কারণে বৃহস্পতিবার ডলারের দাম বেড়ে গেছে।’
বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর হাতে চাহিদার চেয়েও বেশি ডলার রয়েছে উল্লেখ করে আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বৃহস্পতিবারও আমরা বাজার থেকে ডলার কিনে নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু ব্যাংকগুলো বেশি দর চাওয়ায় শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে এসেছি। কেননা বাড়তি দরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনলে বাজার আরো বেশি উসকে ওঠার সুযোগ পেত। কিন্তু আমরা সে সুযোগ দিতে রাজি নই।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এ মুখপাত্র আরো বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীদের অনেকে তাদের সঞ্চয়ও দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন বলে আমরা জেনেছি। সাময়িক সময়ের জন্য এটি ভালো সংবাদ মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর ফল সুখকর নাও হতে পারে।’
ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে যৌথ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী। এ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির বহু উচ্চপদস্থ মন্ত্রী ও সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোয় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। এ হামলার ব্যাপ্তি সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ছাড়িয়ে তুরস্ক ও সাইপ্রাস পর্যন্ত ছড়িয়েছে। ইরানি মিসাইল ও ড্রোনের আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরব। মধ্যপ্রাচ্যের এ চার দেশ বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স আহরণের বৃহত্তম উৎস হিসেবে পরিচিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ইরানের অব্যাহত হামলার কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের অনেক এক্সচেঞ্জ হাউজ বন্ধ রয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশীরাও দেশে টাকা পাঠানোর জন্য এক্সচেঞ্জ হাউজে যেতে ভয় পাচ্ছেন। সৌদি আরব, কুয়েত ও বাহরাইনে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হলেও সেখানে আতঙ্কজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে যেসব প্রবাসীর ব্যাংক হিসাবে সঞ্চয়কৃত অর্থ রয়েছে, সেগুলো তারা দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এ কারণে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি মার্চের প্রথম তিনদিনে প্রবাসীরা ৫৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। অথচ গত বছরের মার্চের প্রথম তিনদিনে রেমিট্যান্স এসেছিল মাত্র ২৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার। সে হিসাবে এ তিনদিনে রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০১ শতাংশেরও বেশি। গত বছরের মার্চের শুরুতে রমজান মাস শুরু হয়েছিল।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকে ৩ মার্চ পর্যন্ত (জুলাই-৩ মার্চ) প্রবাসীরা ২ হাজার ৩০৩ কোটি বা ২৩ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যেখানে এসেছিল ১৮ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের এখন পর্যন্ত রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও রেমিট্যান্সে প্রায় ২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।
যুদ্ধপরিস্থিতির সুযোগ নিতে অনেকে ডলার ধরে রাখছে বলে মনে করেন শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশ এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর মাধ্যমে আসে। এক্ষেত্রে এগ্রিগেটর কোম্পানিগুলোর ভূমিকাও অনেক বড়। যুদ্ধের কারণে অনেক এক্সচেঞ্জ হাউজ ও এগ্রিগেটর ডলার ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তারা মনে করছে, বাংলাদেশে ডলারের দাম বাড়বে। এতে বাড়তি মুনাফা করা যাবে। বৃহস্পতিবার দিনের শেষের দিকে আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলার পাওয়া যাচ্ছিল না। রেমিট্যান্সের ডলারের দরও অনেক বেড়ে গিয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতি অনুরোধ করব, আপনারা দরবৃদ্ধির কোনো সুযোগ দেবেন না। তাহলে ডলার কিনে ধরে রাখা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা দ্রুত বাজারে ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।’
বাংলাদেশে ডলারের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয় ২০২২ সালের শুরুর দিকে। ওই বছরের জানুয়ারিতে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৫ টাকা। এর পর থেকেই অস্থিরতা চরমে ওঠে। মাত্র এক বছর পর ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১০৩ টাকায় ঠেকে। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি ডলারের দর ১১০ টাকায় উঠে যায়। ওই বছরের জুনে এসে বিনিময় হার নির্ধারণে ক্রলিং পেগ নীতি গ্রহণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন এক ধাক্কায় প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১১৮ টাকায় গিয়ে ঠেকে। গত বছরের ১ জানুয়ারি বিনিময় হার আরো বেড়ে ১২০ টাকায় স্থির হয়। আর বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার দিন তথা গত বছরের ১৪ মে ব্যাংক খাতে প্রতি ডলারের দর ছিল ১২২ টাকা। এর পর থেকে দর স্থিতিশীলই ছিল।
বাজার স্থিতিশীল রাখার কথা বলে ২০২২ সালে বাজারে ডলার বিক্রি শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২১-২২ অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে বিক্রি করা হয় ৭৬২ কোটি বা ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ বিক্রি আরো বাড়িয়ে ১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে বিক্রি করা হয় আরো ১২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার। টানা তিন অর্থবছর ধরে ডলার বিক্রির কারণে রিজার্ভে বড় ধরনের পতন হয়। ২০২১ সালের আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার। তা কমে ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে গেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) রিজার্ভ নেমে যায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের ঘরে।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় উল্লম্ফনের পাশাপাশি রিজার্ভও বাড়তে থাকে। উদ্বৃত্ত থাকায় চলতি অর্থবছরে বাজার থেকে ডলার কেনা শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন পর্যন্ত বাজার থেকে ৫ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার কেনা হয়েছে। এতে ৫ মার্চ পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভ বেড়ে ৩৫ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। আর বিপিএম৬ অনুযায়ী, দেশের রিজার্ভ এখন ৩০ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার।














