২০১৮ সালের পর এটিই কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বেইজিং সফর। আগামী বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিন পিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
দীর্ঘ ছয় বছর পর প্রথম কোনও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চীন সফরে যাচ্ছেন কিয়ার স্টারমার। ২০১৮ সালের পর এটিই কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বেইজিং সফর। আগামী বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিন পিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের এই সফরে তাঁর সঙ্গে থাকছেন দেশটির ব্যবসা ও সাংস্কৃতিক খাতের অন্তত ৬০ জন শীর্ষ প্রতিনিধি। এই প্রতিনিধিদলে এইচএসবিসি ব্যাংক, ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জিএসকে, জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার এবং ন্যাশনাল থিয়েটারের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
চীনের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ঝিমিয়ে পড়া সম্পর্ককে নতুন করে চাঙা করাই কিয়ার স্টারমার সরকারের মূল লক্ষ্য। তবে এই সফর নিয়ে খোদ যুক্তরাজ্যেই সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সমালোচকদের মতে, চীনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা এবং তাদের ‘খুব একটা বিশ্বাস করা যায় না’। তাই চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে সরকারকে আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
প্রেসিডেন্ট সি জিন পিংয়ের য়েছে, ‘যেখানে স্বার্থ ও মূল্যবোধের পার্থক্য রয়েছে, সেখানে জটিল বিষয়গুলো নিয়ে অবশ্যই আলোচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী।’
চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলিম ও অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর দমন-পীড়ন এবং হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী সংবাদমাধ্যম ব্যক্তিত্ব জিমি লাইকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিশ্বজুড়ে কড়া সমালোচনা রয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৫ সতর্ক করেছে যে চীনে ব্রিটিশ বিরোধী গুপ্তচরবৃত্তি দিন দিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও চীনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা জরুরি বলে মনে করছে ব্রিটিশ সরকার। সফরের আগে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, ‘বিগত কয়েক বছর ধরে চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খুব একটা স্থিতিশীল ছিল না। কখনো সুসম্পর্ক, আবার কখনো তিক্ততা—এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমাদের যেতে হয়েছে। কিন্তু পছন্দ হোক বা না হোক, যুক্তরাজ্যের জন্য চীন অনেক গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের সঙ্গে একটি কৌশলগত ও ধারাবাহিক সম্পর্ক রাখা আমাদের জাতীয় স্বার্থেরই অংশ। এর মানে এই নয় যে আমরা সব চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে যাব। বরং যেখানে আমাদের দ্বিমত আছে, সেখানেও আমরা আলোচনার পথ খোলা রাখতে চাই।’
প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের এই গুরুত্বপূর্ণ সফরে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী পিটার কাইল এবং ট্রেজারি বিভাগের অর্থনৈতিক সচিব লুসি রিগবি। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরপরই বেইজিং সফর করেছিলেন পিটার কাইল। এ ছাড়া চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস এবং বর্তমান উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামিও গত বছর চীন সফর করেছেন।
স্টারমার মনে করছেন, গত কয়েক বছর চীনের ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ মনোভাব আদতে দেশটিকে দুর্বল করেছে। তাঁর মতে, আবারও সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগই যুক্তরাজ্যকে শক্তিশালী করবে।
ডাউনিং স্ট্রিটের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সম্প্রতি কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ চীন সফর করেছেন। এমনকি ফ্রান্স ও জার্মানির রাষ্ট্রপ্রধানরা গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকবার বেইজিং গেছেন। কিন্তু আট বছর আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র সফরের পর যুক্তরাজ্যের কোনো প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে যাননি। কিয়ার স্টারমার মনে করেন, এর ফলে সমমনা পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় যুক্তরাজ্য অনেকটাই ‘একঘরে’ হয়ে পড়েছিল।
এদিকে, আগামী এপ্রিলে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের কথা রয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অনেকেই চীনের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের এই ঘনিষ্ঠ হওয়াকে সন্দেহের চোখে দেখছেন।
সম্প্রতি লন্ডনে চীনের নতুন একটি দূতাবাস নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে স্টারমার সরকার। কাজ শেষ হলে এটিই হবে ইউরোপের সবচেয়ে বড় চীনা দূতাবাস। এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছেন কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল।
তিনি একে ‘নতিস্বীকার’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ‘আমাদের রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে একটি স্পাই-হাব বা গোয়েন্দা কার্যক্রমের কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনায় স্টারমার ইতিমধ্যেই চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। চীন আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি, অথচ স্টারমার বেইজিংকে তোষণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।’
চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিন পিংয়ের সঙ্গে স্টারমারের এটিই প্রথম দেখা নয়। এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে জি-২০ সম্মেলনে তাঁদের মধ্যে বৈঠক হয়েছিল।