


যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কপালে ভাঁজ পড়েছে ভারতের পোশাক রপ্তানিকারকদের। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যের ওপর ১৯ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়।
ভারতের ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের যে অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তি হতে যাচ্ছে, তাতে তারা বাংলাদেশের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন সমঝোজায় ভারতের সেই আশায় ভাটা পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের এই চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু তৈরি পোশাক বিনা শুল্কে (জিরো ট্যারিফ) যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। তবে এর সঙ্গে একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
শর্তটি হলো, যুক্তরাষ্ট্র ঠিক যতটা তুলা বা বস্ত্র তৈরির কাঁচামাল বাংলাদেশে রপ্তানি করবে, তার ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশের পোশাকের শুল্কমুক্ত কোটা নির্ধারণ করা হবে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কাঁচামাল কিনলে তবেই ওই কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এই বিশেষ শুল্কছাড় পাবে বাংলাদেশ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে ১৪৭ কোটি ডলারের সুতি সুতা রপ্তানি করেছে। বাংলাদেশই এখন ভারতীয় সুতার সবচেয়ে বড় বাজার। এ ছাড়া গত বছর ১২ থেকে ১৪ লাখ বেল তুলাও রপ্তানি হয়েছে বাংলাদেশে। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে। অন্যদিকে ভারতের সুতি পোশাক রপ্তানির ২৬ শতাংশের গন্তব্য ওই একই দেশ।
কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রির মহাসচিব চন্দ্রিমা চ্যাটার্জি বলেন, ‘আমার আশঙ্কা, এই চুক্তির তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ভারতীয় সুতার ওপর। কারণ, শুল্কসুবিধা পেতে বাংলাদেশ এখন ভারত থেকে সুতা না কিনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করবে এবং নিজেদের কারখানায় সুতা তৈরি করবে।’
তিরুপুর এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কে এম সুব্রামানিয়ানের উদ্বেগ অবশ্য অন্য জায়গায়। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কোনো রপ্তানিকারক হয়তো মাত্র ১০ শতাংশ মার্কিন তুলা ব্যবহার করে দাবি করবেন যে তিনি ১০০ শতাংশই ব্যবহার করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এই কাঁচামালের সঠিক উৎস যাচাই করবে? পোশাক খাতে বাংলাদেশ এমনিতেই অনেক শক্তিশালী, ফলে প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়তে পারি।’
ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের টেক্সটাইল বিষয়ক জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান সঞ্জয় কে জেইন মনে করেন, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের নিট ও ওভেন—উভয় ধরনের পোশাক রপ্তানি বাড়বে। অন্যদিকে টি-শার্ট ও মেয়েদের টপসের মতো শতভাগ সুতি পণ্যের বাজারে ভারত তার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে।
তবে সব ভারতীয় ব্যবসায়ী যে খুব চিন্তিত, তা নয়। কোয়েম্বাটুরের একজন পোশাক রপ্তানিকারক জানান, বিদ্যুতের সংকটে বাংলাদেশের টেক্সটাইল মিলগুলো এমনিতেই ধুঁকছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা এনে সুতা তৈরি করে তারা কতটা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
কটন টেক্সটাইল এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক সিদ্ধার্থ রাজগোপাল বলেন, ‘বাংলাদেশে তুলা বা কৃত্রিম আঁশ (এমএমএফ) উৎপাদন হয় না। ১৯ শতাংশ শুল্কছাড় পেতে হলে তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকেই এসব কিনতে হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আনার সময়, পরিবহন ও মজুত করার খরচও বিবেচনায় নিতে হবে। তাছাড়া সব পণ্য মার্কিন তুলা দিয়ে বানানো সম্ভব নয়। ফলে বাংলাদেশে রাতারাতি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় কোনো পরিবর্তন হবে না। এসব বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ। বিষয়টি ২০০০ সালের আগের কোটা প্রথার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।’
এদিকে অ্যাপারেল এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের (এইপিসি) চেয়ারম্যান এ শক্তিভেল বলেন, ‘আমরা ভারত সরকারের কাছে আবেদন করব, যেন বাংলাদেশের মতো আমাদের পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্যও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একই ধরনের সুবিধা চাওয়া হয়।’













