ডা: বি এম আতিকুজ্জামান : যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যখাত দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসক সংকটের মুখোমুখি—বিশেষ করে গ্রামীণ ও সেবাবঞ্চিত এলাকাগুলোতে। এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক এক নীতিগত পরিবর্তন নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৩৯টি দেশের নাগরিকদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইমিগ্রেশন সুবিধা—বিশেষত কাজের অনুমোদন (work authorization) নবায়নের প্রক্রিয়া—অস্থায়ীভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার অভিবাসী চিকিৎসক সরাসরি কর্মহীন হয়ে পড়ছেন বা কাজ চালিয়ে যেতে পারছেন না।
অভিবাসী চিকিৎসকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা : যুক্তরাষ্ট্রের মোট চিকিৎসকদের প্রায় এক-চতুর্থাংশই অভিবাসী। এদের একটি বড় অংশ কাজ করেন সেইসব অঞ্চলে, যেখানে স্থানীয় চিকিৎসকের অভাব প্রকট। ফলে এই নীতির প্রভাব শুধু চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরাসরি রোগীসেবার ওপর প্রভাব ফেলছে।
কী ঘটছে বাস্তবে?
সাধারণত H-1B ভিসাধারীরা কাজের অনুমোদন নবায়নের জন্য আবেদন করলে ২৪০ দিন পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু বর্তমান স্থগিতাদেশের কারণে সেই প্রক্রিয়াই থমকে গেছে। ফলে অনেক চিকিৎসক বাধ্য হচ্ছেন— • চাকরি থেকে বিরতি নিতে। • বেতন ছাড়া ছুটিতে যেতে। • অথবা যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে অন্য দেশে চলে যেতে।
যদিও অনেকেই আইনি দৃষ্টিতে দেশে থাকতে পারছেন, কিন্তু কাজ করার অনুমতি না থাকায় তারা কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে যাচ্ছেন।
রোগীসেবায় প্রতিকূল প্রভাব : এই পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যেই রোগীদের ওপর পড়তে শুরু করেছে। • অনেক রোগীর অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল বা পিছিয়ে যাচ্ছে। • নতুন অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে কয়েক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। • অন্যান্য চিকিৎসকদের ওপর কাজের চাপ বেড়ে যাচ্ছে। • কিছু ক্ষেত্রে শত শত রোগী পর্যাপ্ত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
একজন চিকিৎসকের মতে, “আমাদের মধ্যেই যখন তীব্র সংকট রয়েছে, তখন একজন চিকিৎসক কমে যাওয়াও সমাজে বড় প্রভাব ফেলবে।”
মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তা : শুধু কর্মহীন চিকিৎসকরাই নন, যাদের কাজের অনুমোদন এখনো আছে, তারাও ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। অনেকে ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপ এবং কাজের প্রতি মনোযোগে ঘাটতির কথা জানিয়েছেন। এই পরিস্থিতি চিকিৎসার মানের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারের অবস্থান : হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানিয়েছে, এই স্থগিতাদেশের পেছনে কারণ হলো পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময় কিছু আবেদন যথাযথভাবে যাচাই না হওয়ার আশঙ্কা। তবে এই নীতি কতদিন চলবে বা চিকিৎসকদের জন্য কোনো বিশেষ ছাড় (exemption) দেওয়া হবে কিনা—এ বিষয়ে এখনো পরিষ্কার কোনো দিকনির্দেশনা নেই।
বাড়তি চ্যালেঞ্জ : এর পাশাপাশি নতুন কিছু নীতিগত বাধাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে, যেমন— • H-1B ভিসার জন্য উচ্চ ফি (প্রায় $100,000 পর্যন্ত)। • আইনি লড়াইয়ের ব্যয়। • হাসপাতালগুলোর জন্য বিদেশি চিকিৎসক স্পনসর করা কঠিন হয়ে পড়া।
ইতোমধ্যে এই নীতির বিরুদ্ধে ২০টিরও বেশি মামলা দায়ের হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা : এই সুযোগে কানাডাসহ অন্যান্য দেশ দ্রুতগতিতে অভিবাসী চিকিৎসকদের আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। তারা সহজে স্থায়ী বসবাসের সুযোগসহ বিভিন্ন প্রণোদনা দিচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দক্ষ চিকিৎসক হারানোর ঝুঁকিও বাড়ছে।
এই নীতিটি কেবল একটি ইমিগ্রেশন ইস্যু নয়—এটি ক্রমশ একটি জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হচ্ছে। অভিবাসী চিকিৎসকদের কর্মহীনতা রোগীসেবা ব্যাহত করছে, চিকিৎসা ব্যবস্থায় চাপ বাড়াচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যখাতের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
এখন সময় এসেছে বিষয়টিকে নতুন করে মূল্যায়ন করার—কারণ চিকিৎসকদের সংকট মানেই শেষ পর্যন্ত রোগীদের সংকট।














