শাসন ব্যবস্থায় সংস্কার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সাহসী ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ছাড়া—বাংলাদেশ নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সীমিত কর্মসংস্থানের এক দীর্ঘস্থায়ী ‘ফাঁদে’ আটকে পড়বে বলে সতর্ক করেছেন বাংলাদেশেরই বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। বৈশ্বিক আর্থিক সংস্থাগুলোর পরপর দেওয়া আঞ্চলিক পূর্বাভাসগুলোর হতাশাজনক ইঙ্গিত পর্যালোচনা করতে গিয়ে তারা এই মারাত্মক ঝুঁকির কথা বলেছেন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রকাশিত সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০৩১ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে মন্থরগতির অর্থনীতিতে পরিণত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আইএমএফ প্রাক্কলন করেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.২ শতাংশে নামবে, এবং আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তা তলানিতে নেমে ২.২ শতাংশ স্পর্শ করবে। পরবর্তীতে ২০৩০-৩১ অর্থবছর নাগাদ ধীর গতিতে পুনরুদ্ধার হয়ে প্রবৃদ্ধি কেবল ৩ শতাংশের আশপাশে পৌঁছাবে।
আইএমএফের এই দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাস এই সরকারের গত আগস্টে প্রকাশিত পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্কের সম্পূর্ণ বিপরীত—যেখানে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে প্রবৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশে উন্নীত করার এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
প্রবৃদ্ধির এই ঐতিহাসিক ধসের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চিত্র আরও উদ্বেগজনক। আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়াবে ১০.৯ শতাংশে—যা ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং ছয় মাস আগে তাদের প্রাক্কলিত ৬ শতাংশ পূর্বাভাসের প্রায় দ্বিগুণ। টানা চার বছর ধরে বাংলাদেশ ৮ শতাংশের ওপর মূল্যস্ফীতির বোঝা বইছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিঃশেষ করে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আইএমএফ মূলত একটি ‘বেজলাইন’ বা মৌলিক প্রক্ষেপণ তুলে ধরেছে—যার অর্থ হলো: ব্যাংকিং, জ্বালানি ও ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মতো তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে সরকার যদি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংস্কার করতে ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়, তবে এই করুণ পূর্বাভাসই বাস্তব রূপ নেবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-র সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, আইএমএফের এই অবনমিত পূর্বাভাস মূলত ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক মন্থরতা ও চড়া মূল্যস্ফীতিরই প্রতিফলন। তিনি বলেন, ৬-৯ শতাংশ সুদের হারের মতো ভুল নীতি প্রয়োগ এবং দীর্ঘদিনের সংস্কারহীনতার কারণে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে, তার ওপর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এই সংকটকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং নিম্ন কর্মসংস্থানের এক জটিল ফাঁদে আটকা পড়েছে। এর ফলে অতীতে দারিদ্র্য নিরসনে বাংলাদেশ যে ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছিল, সেখান থেকে এখন উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে।
নিরাশাজনক পূর্বাভাস
চলতি অর্থবছরের জন্য আইএমএফের এই মূল্যায়ন, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) দেওয়া পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি হতাশাজনক। মাত্র এক সপ্তাহ আগে বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছিল, অন্যদিকে সেপ্টেম্বরে এডিবি তা প্রাক্কলন করেছিল ৪ শতাংশ।
মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে শীর্ষ তিন বৈশ্বিক ঋণদাতা সংস্থার একের পর এক প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ছাঁটাইয়ের ঘটনা নির্দেশ করে যে—মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া তীব্র জ্বালানি সংকট—দেশের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আইএমএফের ২০৩০-৩১ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সরকারের নিজস্ব লক্ষ্যের চেয়ে ৫.৫ শতাংশ পয়েন্ট নিচে। আগস্টে প্রকাশিত সরকারি ফ্রেমওয়ার্কে চলতি অর্থবছর ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং প্রতি বছর তা অর্ধ শতাংশ পয়েন্ট করে বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
আইএমএফের সারণীতে দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি অর্থনীতির মধ্যে ২০২৬-২৭ এবং ২০৩০-৩১—উভয় মেয়াদেই তলানিতে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। যেখানে ভারত ২০২৭ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ৬.৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ২০৩০-৩১ অর্থবছর নাগাদ ভুটানের প্রবৃদ্ধি হবে ৫.৫২%, নেপালের ৫.০২%, পাকিস্তানের ৪.৫%, মালদ্বীপের ৪.০৩% এবং শ্রীলঙ্কার ৩.৫১%; অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা মাত্র ২.৯৭ শতাংশে নেমে আসবে বলে মনে করছে আইএমএফ।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতাগুলো আরও গভীর হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। আন্তর্জাতিক এই ঋণদাতা সংস্থার মতে, ভূ-রাজনৈতিক সংকটের প্রভাবে আর্থিক খাতের নানা সমস্যা, নিম্ন রাজস্ব আদায়, জ্বালানি খাতের তীব্র অদক্ষতা এবং প্রতিকূল বিনিয়োগ পরিবেশ আরও বেশি সংকটাক্রান্ত হয়ে পড়েছে—যা দেশের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করছে।
গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এ বলা হয়, “রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দৃঢ়ভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা করা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে তা এখনো দৃশ্যমান হয়নি।”
একইসভাবে গত ২৩ সেপ্টেম্বর এডিবির পর্যালোচনায় সতর্ক করা হয়েছিল যে, ব্যাংকিং খাতের সংকট ও অন্যান্য কাঠামোগত বাধা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অব্যাহতভাবে বাধাগ্রস্ত করবে।
এডিবি তাদের প্রতিবেদনে জানায়, “উচ্চ মাত্রায় খেলাপি ঋণ, ব্যাংকগুলোর দুর্বল ব্যালেন্স শিট, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকিমুক্ত সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ বিনিয়োগের প্রবণতা এবং চড়া সুদহারের কারণে, বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় ব্যাংক ঋণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।” এ ছাড়া অনির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, লজিস্টিকস জটিলতা এবং দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রক বা প্রশাসনিক অনুমোদন প্রক্রিয়া নতুন বিনিয়োগ আটকে দিচ্ছে। এসব দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত বাধার কারণে সরকার মুদ্রানীতি সহজীকরণ কিংবা আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও—তা অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত সাড়া বা দ্রুত ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারছে না।
অর্থনীতিবিদরা কী বলছেন
স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের পূর্বাভাসের মধ্যে সামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। উভয় পক্ষই একই বিদ্যমান তথ্য ব্যবহার করছে বলে জানান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলোর কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সীমিত কর্মসংস্থানের এক জটিল ‘ফাঁদে’ আটকে পড়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অতীতে বাংলাদেশ দারিদ্র্য নিরসনে যে ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করেছিল, তা এখন উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে।
“রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে এই বিপজ্জনক ফাঁদ ভাঙা অসম্ভব,” বলে সতর্ক করেন হোসেন জিল্লুর। তিনি কিছু জরুরি করণীয় তুলে ধরে বলেন: সবার আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি করতে হবে, এরপর বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নিতে হবে, সরকারি সেবার মান বাড়াতে হবে, সমন্বিত নীতি প্রণয়ন করতে হবে এবং অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।
সিপিডি’র সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য-উপাত্ত ও প্রবণতা ওপর ভিত্তি করেই আইএমএফ তাদের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আগের চেয়ে আরও বেশি আশঙ্কাজনক করেছে।
আইএমএফ প্রতি কয়েক মাস পর পর তাদের পূর্বাভাস সংশোধন বা মূল্যায়ন করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পরবর্তী পূর্বাভাস হয়তো কিছুটা ভালো বা খারাপ হতে পারে, তবে তাদের সর্বশেষ প্রাক্কলন পরিষ্কার বার্তা দেয় যে আমাদের অর্থনীতি দিন দিন দুর্বল থেকে আরও বেশি দুর্বল এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।”
এই পরিস্থিতি তৈরির মূল কারণ হিসেবে তিনি ২০২২ সালের মধ্যভাগ থেকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শুরু হওয়া দীর্ঘস্থায়ী মন্থরতা, কম প্রবৃদ্ধি এবং অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতিকে চিহ্নিত করেন। তিনি আরও বলেন, সময়োপযোগী ও উপযুক্ত নীতির চরম অভাব এবং ৬-৯ শতাংশ সুদহারের মতো ভুল সিদ্ধান্ত প্রয়োগ ও সংস্কার বাস্তবায়নে দীর্ঘদিনের অনিচ্ছা পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করেছে। পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে।
ফাহমিদা খাতুন সরকারকে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় সংকোচনের পরামর্শ দিয়ে বলেন, “যেহেতু রাজস্ব আদায় বাড়ছে না এবং নতুন বিনিয়োগও সেভাবে নেই, তাই এই মুহূর্তে সরকারের উচিত প্রবৃদ্ধির পেছনে না ছুটে কেবল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দেওয়া। কারণ মূল্যস্ফীতির কারণে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রাণান্তকর অবস্থা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দিলে, তা দরিদ্রদের রক্ষা করবে এবং ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমাতেও সাহায্য করবে।”
অন্যদিকে দেশের সমস্ত অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে কেবল বৈশ্বিক বা বহিস্থ ধাক্কাকে দায়ী করার সরকারি প্রবণতা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ড. জাহিদ হোসেন। তিনি দেশের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ও সুশাসনের ব্যর্থতাকে এই সংকটের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
জ্যেষ্ঠ এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “বিশ্বব্যাংকের ছয়টি সুশাসনের সূচক দিয়ে যদি আপনি আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর সাথে বাংলাদেশের তুলনা করেন, তাহলে দেখবেন সবকটি সূচকেই আমাদের অবস্থান তলানির ২০ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে। একই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও—কেন অন্য দেশগুলোর তুলনায় আমাদের পারফরম্যান্স এত বেশি খারাপ—এই ডেটাই তার প্রমাণ দেয়। তাই সংকটকে শুধুই বৈশ্বিকঘটনার পরিণতি বলে চালিয়ে দেওয়া এক ধরণের ‘অর্ধ-সত্য’ ছাড়া কিছুই নয়।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, আইএমএফের পূর্বাভাস মূলত একটি ‘বেসলাইন সিনারিও’ বা ন্যূনতম চিত্র নির্দেশ করে। সরকার যদি ব্যাংকিং খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রক বা নীতিগত কাঠামোর ভেতর মৌলিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে বাংলাদেশ বাস্তবিকই এই চরম সংকটের পড়বে। – দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড



















