২৯শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কমিউনিটি

‘মক্কা থেকে মারাকেশ’ – মানুষের পথে, ইতিহাসের ভিতর দিয়ে এক অন্তর্জাগতিক ভ্রমণ

‘মক্কা থেকে মারাকেশ’ – মানুষের পথে, ইতিহাসের ভিতর দিয়ে এক অন্তর্জাগতিক ভ্রমণ

মিহিরকান্তি চৌধুরী : ভ্রমণসাহিত্য কখনো কেবল পথের বর্ণনা নয়—এটি মানুষের, সময়ের, স্মৃতির এবং অভিজ্ঞতার বহুমাত্রিক পাঠ। একটি সত্যিকারের ভ্রমণকাহিনী মানে মানচিত্রে বিন্দু চিহ্নিত করা নয়, বরং সেই বিন্দুগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা জীবন, ইতিহাস, সম্পর্ক ও অনুভবকে আবিষ্কার করা। সেই অর্থে ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের ‘মক্কা থেকে মারাকেশ’ নিছক কোনো পর্যটকের ডায়েরি নয়; এটি এক গভীর মানব-অন্বেষণের দলিল, যেখানে ভৌগোলিক সীমারেখা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে এবং মানুষই হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় সত্তা।

এই গ্রন্থে মক্কার পবিত্রতা যেমন আছে, তেমনি আছে দুবাইয়ের চোখধাঁধানো আধুনিকতার বিপরীতে প্রবাসী শ্রমজীবনের নীরব বাস্তবতা; আছে মারাকেশের রঙিন, রহস্যময় ও কিংবদন্তিময় রাত, আবার আছে বসনিয়ার ইতিহাসবিদ্ধ স্মৃতি, যা বিশ্বযুদ্ধের সূচনার মতো বৃহৎ ঘটনাকেও স্পর্শ করে। ফলে বইটি একক কোনো অভিজ্ঞতার নয়—বরং নানা ভূখণ্ড, সংস্কৃতি, ধর্ম, অর্থনীতি ও ইতিহাসের সুরে গাঁথা এক বহুস্বরিক বয়ান। এখানে পথ কেবল বাহন, আসল বিষয় পথের ভেতর দিয়ে মানুষকে আবিষ্কার করা।

লেখক নিজেই স্বীকার করেছেন, এই যাত্রায় তাঁর মূল প্রয়াস ছিল বিচিত্র ভূখণ্ডকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলা—মানুষের অভিন্ন মানবিকতার সূত্রে। এই উচ্চারণ কেবল একটি বক্তব্য নয়; এটি পুরো গ্রন্থের দার্শনিক ভিত্তি। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ—তাদের বাহ্যিক পার্থক্য সত্ত্বেও কোথায় যেন তারা এক অভিন্ন অনুভূতির জায়গায় এসে মিলিত হয়—এই অনুসন্ধানই বইটিকে গভীরতা দিয়েছে। ফলে ‘মক্কা থেকে মারাকেশ’ কেবল এক ভ্রমণের বিবরণ হয়ে থাকে না; এটি হয়ে ওঠে সময়, মানুষ ও মানবতার অন্তঃসলিলা স্রোতকে স্পর্শ করার এক নান্দনিক ও বৌদ্ধিক যাত্রা।

মানুষই প্রধান, পথ তার অজুহাত : এই ভ্রমণকাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি—মানুষ। এখানে শহর আছে, মসজিদ আছে, গলি আছে, ইতিহাস আছে; কিন্তু এসবই যেন প্রেক্ষাপট, মঞ্চসজ্জা মাত্র। আসল নাটকটি ঘটে মানুষের ভেতরে, মানুষের জীবনে, মানুষের অভিজ্ঞতায়। পথ যেন কেবল একটি অজুহাত—মানুষের কাছে পৌঁছানোর, মানুষের গল্প শোনার।

সৌদি আরবে নিগৃহীত বাংলাদেশি শ্রমিক তানিয়া, তায়েফের রেস্তোরাঁ-মালিক ‘ফিশারম্যান’ সায়াআদ মোহাম্মদ, অচেনা বেদুইন, কিংবা মারাকেশের অ্যাম্বার, লায়লা, আদিলা, আহমেদ—এরা প্রত্যেকেই যেন একেকটি খোলা জানালা। তাদের ভেতর দিয়ে পাঠক প্রবেশ করে ভিন্ন ভিন্ন জীবনবাস্তবতায়, ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতির ভূগোলে।

তানিয়ার গল্পে ধরা পড়ে প্রবাসী জীবনের অনিশ্চয়তা, বঞ্চনা ও নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ ছায়া; তার জীবন যেন এক অদৃশ্য সংগ্রামের প্রতীক। অন্যদিকে আহমেদ—চালক ও গাইড হয়েও—জীবনকে দেখেন গভীর চিন্তার চোখে। তাঁর কথায়, আচরণে, পথচলায় এক ধরনের সহজ দার্শনিকতা লুকিয়ে থাকে, যা ভ্রমণকে কেবল স্থানান্তর নয়, ভাবনারও যাত্রায় রূপ দেয়।

আর আদিলা—এই চরিত্রটি যেন পুরো বইয়ের এক নান্দনিক প্রতীক। তার মধ্যে আছে স্মৃতির কোমলতা, সৌন্দর্যের মায়া, এবং সময়কে ধরে রাখার এক অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা। তার দেওয়া একটি ফুল, তার বলা একটি বাক্য—এসব ক্ষুদ্র মুহূর্তই হয়ে ওঠে বৃহৎ অনুভবের বাহক। ফলে চরিত্রগুলো কেবল তথ্যবহুল নয়; তারা আবেগময়, জীবন্ত, এবং দীর্ঘস্থায়ী।

এইসব মানুষের সঙ্গে লেখকের সম্পর্কও লক্ষণীয়। তিনি তাদের পর্যবেক্ষণ করেন না দূর থেকে; তিনি তাদের কাছে যান, তাদের শোনেন, তাদের সঙ্গে সময় কাটান। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তাই পর্যটকের নয়—একজন মনোযোগী শ্রোতার। মানুষকে বোঝার আগ্রহ তাঁর মধ্যে পুণ্য অর্জনের আকাঙ্ক্ষার চেয়েও প্রবল।

এই মানবিক অবস্থানই বইটিকে আলাদা মাত্রা দেয়। কারণ এখানে মানুষ কোনো উপাদান নয়—মানুষই কেন্দ্র। পথ, স্থান, ইতিহাস—সবকিছু ঘুরে ফিরে সেই মানুষকেই আলোকিত করে। আর পাঠকও সেই আলোয় নিজেকে আবিষ্কার করতে শুরু করে।

জেমা এল-ফনা: এক জাদুর বাস্তবতা- মারাকেশের জেমা এল-ফনা চত্বর এই ভ্রমণকাহিনীর এক অনন্য নান্দনিক কেন্দ্র—একটি জীবন্ত, শ্বাসপ্রশ্বাসময় চরিত্র, যা দিন ও রাতের ভিন্নতায় নিজের রূপ পাল্টায়। দিনের আলোয় এটি হয়তো একটি সাধারণ জনচত্বর, কিন্তু রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে তা যেন রূপ নেয় এক জাদুর রাজ্যে। সারি সারি লণ্ঠনের আলো, ভুনা মাংসের ধোঁয়ায় ভরা বাতাস, গল্পকারদের গোল হয়ে বসা আসর, আর মানুষের অবিরাম কোলাহল—সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে এক স্বপ্নময়, প্রায় অবাস্তব বাস্তবতা।

এই চত্বরের বর্ণনায় লেখকের ভাষা বিশেষভাবে কাব্যিক হয়ে ওঠে। আদিলার হাতে তাজা ডুমুর—তার আঙুলের স্পর্শে ফলের “লজ্জায় লাল হয়ে ওঠা”—এই চিত্রকল্প শুধু একটি দৃশ্য নয়, এটি এক অনুভূতির রূপায়ণ। এখানে বস্তু যেন প্রাণ পায়, স্পর্শ যেন ভাষায় রূপ নেয়। একইভাবে, আদিলার নানির দেওয়া তেলের কৌটো—“সময়ের দাগ মুছে দেয়”—এটি নিছক একটি বস্তু নয়; এটি স্মৃতি, উত্তরাধিকার এবং সময়ের বিরুদ্ধে মানুষের নীরব প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।

জেমা এল-ফনা চত্বর তাই কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়—এটি এক বহমান সংস্কৃতি, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে গল্প জন্ম নেয়, প্রতিটি মুখে লুকিয়ে থাকে একটি ইতিহাস। এখানে লোকজ ঐতিহ্য, বাণিজ্য, বিনোদন এবং দৈনন্দিন জীবন একসঙ্গে মিশে যায়। গভীর রাতে গল্পকাররা যখন বার্বার উপজাতির প্রাচীন কিংবদন্তি শোনায়, তখন বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা মুছে যেতে থাকে।

লেখকের কৃতিত্ব এখানেই—তিনি এই চত্বরকে শুধু চোখে দেখেন না, তিনি তা অনুভব করেন এবং সেই অনুভূতিকে পাঠকের মধ্যে সঞ্চারিত করতে সক্ষম হন। ফলে পাঠক কেবল একটি জায়গার বর্ণনা পড়ে না; সে যেন নিজেই সেই চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকে—লণ্ঠনের আলোয়, গন্ধে, শব্দে, গল্পে ঘেরা এক জাদুময় অভিজ্ঞতার ভেতরে।

ধর্ম, ইতিহাস ও মানবতার সমান্তরাল পথ : গ্রন্থটির একটি গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—ধর্ম ও ইতিহাসকে পাশাপাশি রেখে দেখার সক্ষমতা। এই বইয়ে স্থানগুলো কেবল ভৌগোলিক বিন্দু নয়; তারা সময়ের স্তরে জমাট বাঁধা অর্থবহ প্রতীক। মক্কার আরাফাত ময়দান, যেখানে লাখো মানুষের সমবেত প্রার্থনা মানবতার এক ঐক্যবদ্ধ মুহূর্ত তৈরি করে; বসনিয়ার দরবেশদের আস্তানা, যেখানে নদীর ধারে জিকিরে মগ্ন মানুষ সময়কে অতিক্রম করার চেষ্টা করে; কিংবা সারায়েভোর সেই রাস্তা, যেখানে ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা—এসবই ইতিহাসের জীবন্ত স্মারক হয়ে ওঠে।

সুফি সাধকদের মাজার, তাদের ঘিরে থাকা কিংবদন্তি, দরবেশদের জিকির—এসব বর্ণনায় লেখক ধর্মকে কেবল আচার বা আনুষ্ঠানিকতার ভেতর সীমাবদ্ধ রাখেন না। বরং তিনি ধর্মের অন্তর্লীন আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানকে স্পর্শ করতে চান। এই অনুসন্ধান ব্যক্তিগত, নীরব এবং গভীর—যেখানে মানুষ নিজের সত্তার মুখোমুখি দাঁড়ায়। ফলে ধর্ম এখানে বিভাজনের নয়, বরং এক ধরনের অন্তর্মুখী যাত্রার প্রতীক হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে বসনিয়ার ইতিহাস—বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনালগ্ন—মানবসভ্যতার নির্মম বাস্তবতাকে সামনে আনে। একটি গুলির শব্দ কীভাবে বিশ্বব্যাপী ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা করতে পারে, কীভাবে রাজনৈতিক সংঘাত মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেয়—এই উপলব্ধি পাঠককে নাড়া দেয়। এখানে ইতিহাস কোনো দূরবর্তী অতীত নয়; এটি বর্তমানের ভেতরও প্রতিধ্বনিত হয়। এই দুই ভিন্ন মেরু—আধ্যাত্মিকতা ও সহিংস ইতিহাস—এর মধ্যে দাঁড়িয়ে লেখক যেন একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেন : মানুষের পথ কোথায়? মানুষ কি ধ্বংসের দিকে এগোবে, নাকি আত্মঅন্বেষণের দিকে? এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর তিনি দেন না, কিন্তু তাঁর বর্ণনা, তাঁর অভিজ্ঞতা, তাঁর দেখা মানুষগুলো—সব মিলিয়ে পাঠককে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

ফলে ‘মক্কা থেকে মারাকেশ’ কেবল ভ্রমণের নয়, এটি এক গভীর বৌদ্ধিক ও নৈতিক অনুসন্ধানের গ্রন্থ—যেখানে ধর্ম, ইতিহাস ও মানবতা একইসঙ্গে পথ চলতে থাকে, কখনো সমান্তরালভাবে, কখনো একে অপরকে ছেদ করে।

প্রবাস, অর্থনীতি ও বাস্তবতার কঠিন মুখ : এই গ্রন্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি নিহিত আছে লেখকের নির্মোহ দৃষ্টিতে—বিশেষত প্রবাসজীবন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ক্ষেত্রে। দুবাইয়ের ঝলমলে অট্টালিকা, কাঁচের দেয়ালে প্রতিফলিত আধুনিকতার দম্ভ, আর তার নিচে শ্রমে-ঘামে গড়ে ওঠা এক বিশাল অদৃশ্য মানবসমাজ—এই দ্বৈততাকে লেখক অত্যন্ত সংযত অথচ তীক্ষ্ণভাবে ধরেছেন। পেট্রলনির্ভর অর্থনীতির চমকপ্রদ উন্নয়ন একদিকে যেমন বিশ্বকে বিস্মিত করে, অন্যদিকে সেই উন্নয়নের ভিত যে প্রবাসী শ্রমিকদের কাঁধে দাঁড়িয়ে—এই সত্যটি লেখক এড়িয়ে যান না।

মোতাহারের মতো চরিত্ররা এই বাস্তবতার প্রতীক। তাদের জীবন কোনো নাটকীয় ট্র্যাজেডি নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী, নিঃশব্দ এক সংগ্রাম। লেখক এখানে আবেগের অতিরঞ্জন করেন না; বরং তাঁর সংযমই পাঠকের মনে গভীর বেদনার জন্ম দেয়। এই বেদনা উচ্চকণ্ঠ নয়—এটি মৃদু, কিন্তু স্থায়ী। পাঠক অনুভব করতে থাকে, উন্নয়নের আলো যত উজ্জ্বল, তার ছায়াও তত গভীর।

খলিল জিবরানের কবিতার উদ্ধৃতি এই অংশে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রা যোগ করে। “Your joy is your sorrow unmasked”—এই উপলব্ধি যেন পুরো প্রবাসজীবনেরই প্রতীক হয়ে ওঠে। আনন্দ ও দুঃখ এখানে পরস্পরের বিপরীত নয়, বরং একই অভিজ্ঞতার দুই মুখ। এই দ্বৈততাই বইটির অন্তর্নিহিত সুরগুলোর একটি।

খাদ্য, গন্ধ, স্বাদ: ইন্দ্রিয়ের ভ্রমণ- ভ্রমণ মানে শুধু চোখে দেখা নয়—এটি ইন্দ্রিয়ের এক সামগ্রিক অভিজ্ঞতা। ‘মক্কা থেকে মারাকেশ’-এ এই ইন্দ্রিয়গত ভ্রমণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মারাকেশের চত্বরে টং দোকানের ছাগলের মাথা রান্না, ধোঁয়া ওঠা উনুন, অলিভের টক-মিষ্টি স্বাদ, রুটির সরলতা—এসব বর্ণনায় পাঠক যেন নিজেই বসে পড়ে সেই খাবারের সামনে।

খাবারের মধ্য দিয়ে লেখক কেবল স্বাদ নয়, সংস্কৃতির ভেতর প্রবেশ করেন। একটি জাতির খাদ্যাভ্যাস তার ইতিহাস, অর্থনীতি, জলবায়ু ও জীবনযাত্রার প্রতিফলন—এই গভীর উপলব্ধি তাঁর লেখায় বারবার ফিরে আসে। ফলে খাবার এখানে কেবল উপকরণ নয়, একটি সাংস্কৃতিক পাঠের মাধ্যম।

এই অংশগুলোতে গন্ধের বর্ণনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—ভুনা মাংসের ঘ্রাণ, অলিভ অয়েলের সুবাস, কিংবা বাজারের মশলার মিশ্র গন্ধ—সব মিলিয়ে পাঠক যেন শব্দের ভেতর দিয়ে গন্ধ অনুভব করতে পারে। এ এক বিরল ক্ষমতা।

ভাষা ও বর্ণনার নন্দনশৈলী : ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের ভাষা সরল, অথচ গভীর। তিনি জটিল বাক্যগঠনের আশ্রয় নেন না, কিন্তু তাঁর বর্ণনায় একটি স্বতঃস্ফূর্ত কাব্যিকতা প্রবাহিত হয়। এই কাব্যিকতা কখনো আরোপিত নয়; বরং অভিজ্ঞতার ভেতর থেকেই উঠে আসে।

“ফুলের মধ্যে সূর্যাস্ত আটকে থাকা”—এমন চিত্রকল্প শুধু একটি দৃশ্য বর্ণনা করে না, এটি সময়, স্মৃতি ও ক্ষণস্থায়ীতার অনুভূতিকে একসঙ্গে ধারণ করে। তাঁর লেখায় দৃশ্য, অনুভূতি ও চিন্তা—এই তিনটি স্তর একসঙ্গে কাজ করে। ফলে পাঠক কেবল পড়েন না, দেখেন, অনুভব করেন এবং ভাবেন।

তাঁর সাংবাদিকসুলভ নির্ভুলতা এখানে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে, যার ওপর দাঁড়িয়ে সাহিত্যিক সংবেদনশীলতা প্রস্ফুটিত হয়। তথ্য ও অনুভূতির এই ভারসাম্যই তাঁর ভাষাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

লেখকের জীবনদৃষ্টি ও অভিজ্ঞতার প্রভাব : এই বইয়ের গভীরতা অনেকটাই নির্ভর করে লেখকের জীবন-অভিজ্ঞতার ওপর। দীর্ঘ সাংবাদিকতা, প্রবাসজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা—এসব তাঁর দৃষ্টিকে প্রশস্ত করেছে। ফলে তিনি কেবল ভ্রমণকারী নন; তিনি একজন পর্যবেক্ষক, একজন বিশ্লেষক, এবং একই সঙ্গে একজন সংবেদনশীল মানব-অন্বেষক।

তিনি ঘটনাকে দেখেন, কিন্তু তার ভেতরের অর্থও খোঁজেন। তিনি মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, কিন্তু সেই কথার অন্তর্লীন নীরবতাকেও ধরতে পারেন। এই ক্ষমতাই তাঁর লেখাকে গভীর করে তোলে।

সবচেয়ে বড় কথা—তিনি পাঠককে সামনে রেখে হাঁটেন না, পাশে নিয়ে হাঁটেন। ফলে পাঠক কখনো দূরবর্তী দর্শক হয়ে থাকে না; বরং এই যাত্রার এক সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হয়ে ওঠে। এই সহযাত্রী হওয়ার অভিজ্ঞতাই বইটির অন্যতম বড় সাফল্য।

উপসংহার: পথ নয়, পথচলার বই : ‘মক্কা থেকে মারাকেশ’ শেষ পর্যন্ত কোনো পথের সরল বিবরণ নয়; এটি পথচলার গভীর, বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার গল্প। এখানে মানচিত্রের রেখা নয়, মানুষের মুখই প্রধান হয়ে ওঠে; স্থান নয়, সেই স্থানে বসবাস করা জীবনের স্পন্দনই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। লেখক আমাদের দেখান—ভ্রমণ মানে গন্তব্যে পৌঁছানো নয়, বরং সেই পথে নিজেকে, অন্যকে এবং পৃথিবীকে নতুন করে আবিষ্কার করা।

এই গ্রন্থে ধর্ম উপস্থিত, কিন্তু তা বিভাজনের নয়—মানবতার আলোয় উদ্ভাসিত এক অন্তর্মুখী অন্বেষণ। ইতিহাস এখানে কেবল অতীতের ঘটনার তালিকা নয়; বরং বর্তমানের অভিজ্ঞতার ভেতর পুনর্জীবিত এক চলমান সময়। অর্থনীতি সংখ্যার হিসাব হয়ে থাকে না; তা ধরা পড়ে মানুষের ক্লান্ত চোখে, শ্রমে-জর্জরিত হাতে, কিংবা নীরব সহিষ্ণুতায় ভরা মুখাবয়বে।

বইটি পাঠ করতে করতে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়—এই ভ্রমণ বাইরের জগতের যতটা, তার চেয়েও বেশি ভেতরের। লেখক পাঠককে দূর থেকে দৃশ্য দেখান না; বরং তাকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যান, যেখানে পাঠক নিজেই প্রশ্ন করতে শুরু করে—মানুষ কে, তার সংগ্রাম কী, তার আনন্দ কোথায়, আর তার ভবিষ্যৎ কোন পথে?

সবশেষে বলা যায়, এই বই পাঠককে কেবল এক দেশ থেকে আরেক দেশে নিয়ে যায় না; বরং তাকে নিজের ভেতরের এক অজানা ভূগোলে প্রবেশ করায়। মানুষকে নতুন করে দেখার, পৃথিবীকে নতুনভাবে ভাবার এবং নিজের অবস্থানকে পুনর্বিবেচনা করার এক বিরল সুযোগ তৈরি করে। এই কারণেই ‘মক্কা থেকে মারাকেশ’ কেবল পড়ার বই নয়—এটি অনুভবের, অনুধাবনের এবং ধীরে ধীরে নিজের ভেতরে প্রতিধ্বনিত হওয়ার এক দীর্ঘ যাত্রা। আমি গ্রন্থটির পাঠকপ্রিয়তা কামনা করি।

গ্রন্থ-পরিচিতি : ‘মক্কা থেকে মারাকেশ’ — ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের ভ্রমণকাহিনি। প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৬; প্রকাশক : বাতিঘর, বাংলাদেশ; প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা; মুদ্রণ: এসআরএল প্রিন্টিং প্রেস, নীলক্ষেত, ঢাকা। পাঁচটি অধ্যায়ে ১২৮ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থের মূল্য ৩৫০ টাকা (১৮ মার্কিন ডলার)। উৎসর্গ : লেখকের গল্পকথক পিতৃব্য আব্দুর রহমান চৌধুরীকে। – মিহিরকান্তি চৌধুরী, লেখক, অনুবাদক ও নির্বাহী প্রধান, টেগোর সেন্টার, সিলেট।