


মার্কিন উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি পোশাক শুল্কমুক্ত সুবিধায় যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করতে পারবে বাংলাদেশ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক উৎপাদনকারী দেশের জন্য এটি একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে প্রতিবেশী ভারতের প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত বছরের এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ হারে ‘পারস্পরিক শুল্ক’ আরোপ করেন। পরে আগস্টে তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়।
সোমবার রাতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে সব রপ্তানির ওপর ১৯ শতাংশ শুল্ক এবং কিছু পোশাকের জন্য শূন্য শুল্ক হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম সুতা ব্যবহার করে বাংলাদেশে তৈরি নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র ও পোশাক পণ্যের ওপর শূন্য শুল্ক হার প্রযোজ্য হবে। অধ্যাপক ইউনূস বলেছেন, এই চুক্তি মার্কিন নীতির সঙ্গে বাংলাদেশকে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশের রপ্তানি করা পোশাকের বড় অংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান জেসিপেনি, টার্গেট ও ওয়ালমার্টে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চীনের পর তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ।
এপ্রিল মাস থেকেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে আসছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি তুলা কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ঢাকার উদ্বেগ ছিল, ট্রাম্পের শুল্ক দেশটির অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত এই শিল্পের জন্য হুমকি হতে পারে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় চার-পঞ্চমাংশ আসে এই খাত থেকে।
বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান উর্মি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী আসিফ আশরাফ বলেন, ‘মার্কিন তুলা দিয়ে তৈরি পণ্যের ওপর শূন্য শুল্ক সুবিধা অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের রপ্তানি বাড়াবে।’ বিশেষ করে নিট পোশাকের ক্ষেত্রে এটি বেশি কার্যকর হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই শুল্কমুক্ত সুবিধা বাংলাদেশকে ভারতের তুলনায় এগিয়ে রাখবে। ভারতের বস্ত্র ও পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারও যুক্তরাষ্ট্র। গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘোষিত অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ভারত শ্রমঘন পণ্যের বিক্রি বাড়ানোর আশা করছে।
ঢাকার এক উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, ‘এই চুক্তির ফলে আমাদের পোশাক শিল্পের সক্ষমতা ভারতের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে।’ তিনি ধারণা করছেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানি আরও ১০০ কোটি ডলার বাড়াতে পারবে—যা বর্তমানে প্রায় ২০০ কোটি ডলার। গত বছর ভারতের ওপর আরোপিত শুল্ক ৫০ শতাংশ থাকলেও ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় আমদানির ওপর শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ নির্ধারণ করেছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ট্রাম্পের আলাপের পর এই সিদ্ধান্ত আসে। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, তারা নয়াদিল্লির কাছ থেকে রুশ তেল কেনা বন্ধের প্রতিশ্রুতি আদায় করেছে। তাদের মতে, রুশ তেল ভ্লাদিমির পুতিনকে ইউক্রেন যুদ্ধে রসদ জোগাতে সহায়তা করছে। দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণায় ভারতের মার্কিন তুলা আমদানির কোনো উল্লেখ ছিল না।
কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশি কিছু বস্ত্র ও পোশাক পণ্যের ওপর শূন্য মার্কিন শুল্ক হারের বিষয়ে স্পষ্টতার অপেক্ষায় আছে। তাদের মতে, এটি ভারতের বস্ত্র ও পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে, কারণ তাদের একক বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্র। নয়াদিল্লির এক বিশ্লেষক বলেছেন, মার্কিন উপকরণ দিয়ে তৈরি বাংলাদেশি বস্ত্র ও পোশাক রপ্তানির ওপর শূন্য শতাংশ শুল্কের এই সুযোগ ভারতকে বেশ অসুবিধায় ফেলবে।
ভারতীয় বাণিজ্য অর্থনীতিবিদ বিশ্বজিৎ ধর বলেন, ‘আমাদের কর্মকর্তারা বলছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে শ্রমঘন খাত, বিশেষ করে পোশাকে আমরা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকব, কারণ শুল্কের পার্থক্য ছিল। সেই সুবিধা এখন আর রইল না।’













