


পুরো পৃথিবীর মানুষ, যারা অভিবাসী হয় তাদের শতকরা হিসাব কিন্তু বেশি নয়। ৪ শতাংশের নিচে। সারা পৃথিবীতে এই ৪ শতাংশের অর্ধেকের বেশি আবার শ্রমিকশ্রেণির। এখন যে সমস্যাটা দাঁড়িয়েছে তা হলো, এর ধরনটা পরিবর্তন হয়েছে। আগে বড় আকারে যে মাইগ্রেশন হয়েছে সেটা ইউরোপ থেকে উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এমনকি অস্ট্রেলিয়ায় হয়েছে। এই মাইগ্রেশনটা মূলত সাদাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তারাও মূলত কাজের খোঁজেই গেছে। উন্নত জীবনের খোঁজেই গেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এখনো মানুষ কাজের জন্যই যায়। কিন্তু এর রংটা বদলেছে। এখন কালো ও বাদামিদের সংখ্যাটা বেড়েছে।
বর্তমানে এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে কালো ও বাদামি বর্ণের মানুষ অধিকহারে অভিবাসীর তালিকায় উঠে আসছে। তারাও মূলত ওই কাজের সন্ধানেই ভিনদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। এখন যে সমস্যাটা প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাহলো কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য দেশগুলোতে এক ধরনের রেসিজম তৈরি হয়েছে। অভিবাসীদের বিভিন্ন ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এই অভিবাসীরা যাতে স্থায়ীভাবে সেখানে থেকে যেতে না পারে সে ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যে শ্রমিকরা যায় তারা বেশির ভাগই তাদের পরিবারের সদস্যদের নিতে পারে না। ওখানে এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা আছে। ধারণাটা হলো- কাজ শেষ করে সে নিজ দেশে ফিরে যাবে।
উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর সুবিধাটা হলো এগুলো মূলত বহুজাতিক দেশ। সব সময়ই তাদের অভিবাসী শ্রমিক প্রয়োজন হয়। অভিবাসী ছাড়া বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডার মতো দেশগুলোর তাদের লিভিং স্ট্যান্ডার্ড রক্ষা করা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এসব দেশেও এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। যারা অদক্ষ শ্রমিক অর্থাৎ যাদের অপেক্ষাকৃত নিচু পেশার কাজ দরকার, যেমন- গ্রোসারি, পেট্রোল পাম্প, বিল্ডিং বা ব্রিজ নির্মাণ ইত্যাদি, সেখানেও একটা বৈষম্য তৈরি হয়েছে। যদিও উন্নত দেশগুলো দেখাতে চেষ্টা করে যে, তাদের পলিসির একটা মানবিক দিক আছে। হিউম্যান রাইটস এসব অনেক কিছু বলতে চেষ্টা করে। অনেক দেশে হয়তো কিছুটা আছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান পার্টি অর্থাৎ ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর সেখানেও রীতিমতো একটা পরিবর্তন আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাদের ইনকামিং মাইগ্রেন্সের যে পলিসিগুলো ছিল সেগুলো তারা পরিবর্তন করেছে। তারা আফ্রিকা ও ভারত-বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। আগে যেরকম খুব সহজে উত্তর আমেরিকায় যেতে পারত, সেই জিনিসটা এখন কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি না। কারণ সেখানেও অর্থনীতির একটা মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। অর্থনীতির মন্দা যখন শুরু হয় তখন স্বাভাবিকভাবে অভিবাসীদের ওপর এর একটা বিরূপ প্রভাব পড়ে।
অন্যদিকে এর উল্টো চিত্রও আমরা দেখতে পাচ্ছি; বিশেষ করে যেসব উন্নত দেশে জনসংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে কিংবা বয়স্ক নাগরিকের হার বেড়ে যাচ্ছে সেসব দেশ দক্ষ অভিবাসী দ্বারা তাদের জনসংখ্যার ঘাটতি পূরণ করছে। এ তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও জাপানের মতো দেশ। ইতোমধ্যে আমেরিকা একটা কঠিন পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছে। অবশ্য বিশ্বব্যাপী এর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ইউরোপেও আমরা তাই দেখলাম। এমনকি ব্রিটেনও নতুন পলিসি তৈরি করছে। আগের মতো যে কেউ সহজে যেতে পারছে না। এমনকি ছাত্র যাওয়ার ব্যাপারেও তারা বিভিন্ন ধরনের নিয়মকানুন করেছে। কারণ সবাই চাচ্ছে দক্ষ শ্রমিক। কেউ অদক্ষ শ্রমিক চাচ্ছে না। এখন সব দক্ষ শ্রমিক যদি চলে যায় তাহলে বাংলাদেশের কী হবে। মাঝে মাঝে বিভিন্ন অস্থিতিশীলতা দেখা দেয় এবং উন্নত দেশগুলোর এ অস্থিতিশীলতার পেছনে একটা হাত থাকে। কারণ তারা যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা চায় সেটা অনেক সময় সম্ভব হয় না। তারা তখন উৎসাহী হয়ে একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে। যখনই কোনো দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয় তখনই যাদের ক্ষমতা বা সক্ষমতা থাকে, তারা উন্নত দেশে চলে যায়। তখনই উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়নের কাঠামো নির্মাণ বা ধারাবাহিকতায় ভাটা পড়ে।
ইদানীং শোনা যাচ্ছে যে, আমেরিকা দ্বৈতনাগরিকত্ব তুলে নেবে। ডাবল পাসপোর্ট রাখার যে বিধান ছিল তারা যেহেতু ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বলতে যাচ্ছে ‘ইউ আর ইদার আমেরিকান অর নট আমেরিকান’- সেই জায়গায় যদি পরিবর্তন হয় তাহলে ওটার একটা প্রভাব পড়বে। আমাদের দেশেও অনেকেই দ্বৈতনাগরিকত্ব নিয়ে আছে। যেটা আমি সবসময় মনে করি যে, আমাদের জন্য খুব ক্ষতিকর। উন্নত দেশগুলো হয়তো চেষ্টা করতে পারে, কারণ সেখানে যদি কোনো ঝামেলা হয় সে তো আর দৌড় দিয়ে বাংলাদেশে আসবে না। কিন্তু বাংলাদেশে যদি ঝামেলা হয় তখন দ্বৈতনাগরিকত্বে তার আনুগত্য কিন্তু আমেরিকায় থাকবে বা কানাডায় থাকবে। সে দৌড় দিয়ে চলে যাবে। সেটা আমার মনে হয় আমাদেরও এই যে পরিবর্তন যেটা হচ্ছে উন্নত দেশ তার ক্রাইসিসের কারণে যেভাবে বাধা দেওয়া শুরু করেছে সেটা হয়তো আমাদের জন্য একটা সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং আমাদের জন্য একটা ভালো রেজাল্টও হতে পারে। যেখানে যারা খুব সহজে যাওয়ার চিন্তা করত তারা হয়তো চিন্তা করবে যে, যেহেতু অত সহজেই যেতে পারছে না তাহলে বাংলাদেশে বসে কী করা যায় বা যে উন্নত দেশ আছে সে সেখানে কীভাবে পরিবর্তন আনতে পারে। সেখানে একটা ইতিবাচক ফল হতে পারে। দুটো পা যদি বাংলাদেশে না থাকে তাহলে তো সে বাংলাদেশের উন্নয়নের সঙ্গে বা জনগণের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক রাখবে না। আমাদের দেশ এটা পাকিস্তান থেকে এসেছে। পাকিস্তানেও দুটো পাসপোর্টের অনুমোদন আছে। সে হিসেবে আমাদের দেশেও সেটা আছে কিন্তু সেটা আমি মনে করি যে, আমাদের যথেষ্ট ক্ষতি করছে। অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত সেটা অনুমোদন করে না। চীন সেটা অনুমোদন করে না। এমনকি সিঙ্গাপুরও সেটা অনুমোদন করে না। এ দেশগুলো কোনোটাই কিন্তু এই দ্বৈতনাগরিকত্ব অনুমোদন করে না। তাহলে আমরা কেন অনুমোদন করছি? সেখানে আমার মনে হয় আজকে যেহেতু এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, এটা নিয়ে হয়তো লেখালেখি হবে। এর মধ্যে একটা গুরুত্ব দেওয়া দরকার যে, কেউ যদি অন্য দেশের নাগরিকত্ব নেয় তাহলে সে যদি নিজের দেশের পাসপোর্ট রেখে দেয় তাতে বাংলাদেশেই ক্ষতি হয়।
যে ব্যক্তি উন্নত দেশের পাসপোর্ট পায় সে সেদিকেই ঝুঁকে থাকে। কারণ সেটা উন্নত দেশ। সে তো আর অনুন্নত কোনো দেশে থাকতে চাইবে না। এটা নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা করা দরকার। কারণ এর সঙ্গে মানি লন্ডারিং একটা বিশাল সম্পর্ক থাকে এবং যেটা সবচেয়ে ক্ষতিকর সেটা হলো, একটা সময় যখন বয়স হয়ে যায় তখন তারা তাদের যে আসবাবপত্র আছে বা যে ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা যে ধরনের বাড়িঘর আছে এগুলো সব বিক্রি করে চলে যায়। না হলে তাদের ছেলেমেয়েরা যারা ইতোমধ্যে বিদেশে আছে তারা এসে ওগুলোকে বিক্রি করে টাকাটা নিয়ে চলে যায়। এটা একটা বিরাট ক্ষতি। এ ক্ষতিটাকে আমরা যতদিন রাখব ততদিন আমি যতই উন্নয়ন করতে চাই না কেন দেখা যাবে নিজে থেকে সব আস্তে আস্তে অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। আমি আশা করব যে, এ অভিবাসন দিবসে এটার ওপর গুরুত্ব দেবে এবং গুরুত্ব দিয়ে নীতি নির্ধারক যারা আছেন, তারা সিদ্ধান্ত নেবেন। ড. ইমতিয়াজ আহমেদ অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক













