২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আর্ন্তজাতিক
দেব প্রসাদ দেবু

অন্তবর্তী সরকারের বাণিজ্য চুক্তি: অর্থনীতি থেকে ভূরাজনীতির ছায়া

অন্তবর্তী সরকারের বাণিজ্য চুক্তি: অর্থনীতি থেকে ভূরাজনীতির ছায়া

সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বিস্তৃত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে (এফটিএ) স্বাক্ষর করেছে। তবে এ ধরনের চুক্তি কার্যকর হতে সাধারণত অনুসমর্থন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া প্রয়োজন, সেই প্রশ্নও এখন প্রাসঙ্গিক। এটিকে কেবল শুল্ক কমানো বা রপ্তানি বাড়ানোর খাতায় ফেলা যাবে না। এটি আসলে রাষ্ট্রের কৌশলগত অভিমুখ নির্ধারণের প্রশ্ন। কারণ আধুনিক এফটিএ আর শুধু পণ্যের বাণিজ্য নিয়ে থাকে না, এতে ঢুকে পড়ে ডিজিটাল প্রবাহ, ডেটা নিয়ন্ত্রণ, মেধাস্বত্ব, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আচরণ, এমনকি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ও।

বাংলাদেশ এতদিন বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে এগিয়েছে। অবকাঠামো, জ্বালানি ও প্রযুক্তিতে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক; রপ্তানি বাজার, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা– এই দ্বিমুখী বাস্তবতার মধ্যেই আমাদের কূটনীতি গড়ে উঠেছে। কিন্তু যখন একটি চুক্তি ভবিষ্যৎ বাণিজ্য-সম্পর্ক, প্রযুক্তির উৎস বা তৃতীয় দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতাকে শর্তসাপেক্ষ করে তোলে, তখন তা স্বাভাবিকভাবেই ভূরাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) চীন-কেন্দ্রিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করেছে, যেখানে বাংলাদেশ এখনও সদস্য নয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন উচ্চ মানদণ্ডের চুক্তিগুলো প্রযুক্তি ও মানদণ্ডের রাজনীতিকে সামনে এনেছে। বাংলাদেশ যদি একদিকে দৃঢ়ভাবে ঝুঁকে পড়ে, অন্যদিকের সঙ্গে আস্থার সমীকরণে টানাপোড়েন তৈরি হওয়া অবধারিত।

এই টানাপোড়েন কেবল প্রতীকী নয়, এটি বাস্তব অর্থনৈতিক প্রকল্পেও প্রভাব ফেলতে পারে। জ্বালানি অবকাঠামো, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, ৫জি বা ক্লাউড অবকাঠামোর মতো খাতে প্রযুক্তির উৎস, সাইবার নিরাপত্তা মানদণ্ড ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিধি– এসব প্রশ্নে বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্পষ্ট। চুক্তির শর্ত যদি বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞা কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্য রাখতে বাধ্য করে, তবে চীন বা অন্য অংশীদারের সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি সহযোগিতা জটিল হতে পারে। অর্থনৈতিক চুক্তি তখন নিরাপত্তা রাজনীতির একটি উপাদানে পরিণত হয়।

ডিজিটাল অংশটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদি চুক্তিতে বলা হয় যে ডেটা অবাধে বিদেশে যাবে, দেশে ডেটা সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রাখা যাবে না বা বিদেশি ডিজিটাল কোম্পানির ওপর আলাদা কর বসানো যাবে না, তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের নীতি নিয়ন্ত্রণ সীমিত হতে পারে। বিশেষ করে যখন দেশের রাজস্ব আদায় এখনও সন্তোষজনক নয়, তখন দ্রুত বাড়তে থাকা ডিজিটাল খাত থেকে কর নেওয়ার সুযোগ নিজেই সীমিত করে দেওয়া কতটা বিচক্ষণ, সেটি ভাবার বিষয়। প্রশ্ন হলো, আমাদের সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা সুরক্ষা আইন ও তদারকি করার সক্ষমতা কি যথেষ্ট শক্ত? সিপিটিপিপির মতো চুক্তিতে ডেটা উন্মুক্ত রাখার নীতি আছে, তবে অনেক সদস্য দেশ নিজেদের ডেটা সুরক্ষা কাঠামো শক্ত করেছে। আমাদের ব্যাংকিং, স্বাস্থ্য বা নাগরিক তথ্য যদি বিদেশি সার্ভারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সংকটকালে দ্রুত আইনি বা প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হতে পারে। তখন ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব কেবল স্লোগান হয়ে থাকবে।

নাফটা বাণিজ্য বাড়ালেও মেক্সিকোর কৃষি খাতে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছিল; ভর্তুকিপ্রাপ্ত মার্কিন কৃষিপণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ক্ষুদ্র কৃষকেরা সংকটে পড়েন। এইউএসএফটিএর পর অস্ট্রেলিয়ায় ওষুধনীতি ও মেধাস্বত্ব নিয়ে বিতর্ক ওঠে। অর্থাৎ চুক্তি নিজে উন্নয়ন নিশ্চিত করে না। শর্তের ভারসাম্য, সুরক্ষা ব্যবস্থা ও স্থানীয় সক্ষমতাই ফল নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় শিল্পায়ন এখনও অসম্পূর্ণ, কৃষি বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা, আর ডিজিটাল অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে। এমন অবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ভর্তুকি, স্থানীয়করণ নীতি বা কৌশলগত খাতে সুরক্ষার সুযোগ কমে গেলে দীর্ঘ মেয়াদে নীতি স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তার সঙ্গে যদি যুক্ত হয় ভূরাজনৈতিক চাপ, তবে অর্থনৈতিক লাভের হিসাবও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।

অতএব, প্রশ্নটি কেবল ‘চুক্তি ভালো না খারাপ’ এত সরল নয়। প্রশ্ন হলো, একটি সীমিত ম্যান্ডেটের অন্তর্বর্তী সরকার কি এমন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অঙ্গীকারে দেশকে আবদ্ধ করতে পারে? জাতীয় ঐকমত্য, সংসদীয় পর্যালোচনা ও খাতভিত্তিক প্রভাব সমীক্ষা ছাড়া স্বাক্ষরিত এই চুক্তি ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের নীতিগত পরিসর সংকুচিত করতে পারে। এই বাস্তবতা জেনেও অন্তর্বর্তী সরকার এমন পদক্ষেপ নিল কেন, সেই প্রশ্ন উঠছেই।

শেষ পর্যন্ত মুক্ত বাণিজ্য হয়তো দরজা খুলে দেয়। কিন্তু কোন দরজা খুলছে, আর কোন জানালা বন্ধ হচ্ছে– সেই হিসাব না করলে লাভের আলোয় ক্ষতির ছায়া ঢাকা পড়তে বাধ্য। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য তাই প্রয়োজন হবে কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও পুনর্বিবেচনার সাহস। জাতীয় স্বার্থে চুক্তির শর্তগুলো খোলামেলা পর্যালোচনা করাই এখন সময়ের দাবি। দেব প্রসাদ দেবু: সাবেক ছাত্রনেতা। ঢাকার দৈনিক সমকাল এর সৌজন্যে