১২ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বাংলাদেশি বাবার পরিচয় খুঁজে বেড়াচ্ছেন কানাডার মার্টিন জোন্স

নজরুল মিন্টো: কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় বসবাসকারী মার্টিন জোন্সের বয়স এখন ৭১ বছর। জীবনের এতগুলো বছর পেরিয়ে এসেও তিনি জানেন না তাঁর বাবা কে ছিলেন। জানেন না বাবার নাম, চেহারা কিংবা কোথায় ছিল তাঁর বাড়ি। অথচ সেই অচেনা মানুষটির রক্ত তাঁর শরীরে বইছে। জন্মের পর থেকে যে প্রশ্নটি তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, আজও তার উত্তর খুঁজে চলেছেন তিনি। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর একটি বিষয় সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন। তাঁর বাবা ছিলেন বাংলাদেশের সিলেটের মানুষ। সম্ভবত বিয়ানীবাজারের মাথিউরা ইউনিয়নের কোনো এক গ্রামের সন্তান। এখন সেই গ্রামের মানুষের কাছেই হয়তো লুকিয়ে আছে তাঁর জন্মপরিচয়ের বহুদিনের অজানা রহস্য।

১৯৫৫ সালের ৩১ জানুয়ারি। লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ হাসপাতালে জন্ম হয় মার্টিন জোন্সের। তাঁর মা ছিলেন একজন ইংরেজ নারী। জন্ম ১৯১২ সালে। মার্টিনের জন্মের সময় মায়ের বয়স ছিল প্রায় ৪৩ বছর। কিন্তু জন্মসনদের যে ঘরে বাবার নাম লেখা থাকার কথা, সেখানে কোনো নাম ছিল না। একটি শিশুর জীবনের প্রথম সরকারি পরিচয়পত্রেই রয়ে গেল এমন এক শূন্যতা, যা পরবর্তী সাত দশকেও পূরণ হয়নি।

মার্টিন বড় হয়েছেন, যৌবন পেরিয়েছেন, জীবনের নানা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। একসময় ইংল্যান্ড ছেড়ে কানাডায় বসতি গড়েছেন। কিন্তু নিজের জন্মপরিচয়ের একটি অংশ তাঁর কাছে বরাবরই অজানা থেকে গেছে। বাবার নাম না জানার অর্থ যে কত বড় এক অপূর্ণতা, তা হয়তো কেবল সেই মানুষটিই বুঝতে পারেন, যিনি নিজের শেকড়ের সন্ধান করতে গিয়ে বারবার একটি বন্ধ দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন।

মার্টিন তাঁর মায়ের কাছ থেকেও বাবার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি। ফলে বাবাকে খুঁজে বের করার কাজটি শুরু করতে হয়েছে প্রায় সম্পূর্ণ অন্ধকার থেকে। সময় যত এগিয়েছে, সেই অনুসন্ধান তত কঠিন হয়েছে। ১৯৫৫ সালের লন্ডন আর আজকের লন্ডন এক নয়। সেই সময়ের পরিচিত মানুষদের অনেকেই হয়তো আর বেঁচে নেই। যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের স্মৃতিতেও সাত দশক আগের ঘটনা কতটুকু অক্ষত রয়েছে, তা বলা কঠিন। তবু মার্টিন হাল ছাড়েননি।

২০২০ সালে তিনি যোগ দেন বংশপরিচয় অনুসন্ধানের আন্তর্জাতিক দুটি প্রতিষ্ঠান Ancestry এবং 23andMe-তে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মানুষের জিনগত আত্মীয়তার সম্পর্ক শনাক্ত করার সুযোগ রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানে। মার্টিনের জীবনে এই প্রযুক্তি নতুন এক দরজা খুলে দেয়। এতদিন যে পরিচয়টি ছিল অনুমান আর অজানা প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ, এবার তার কিছু সূত্র পাওয়া যেতে থাকে।

ডিএনএ পরীক্ষায় পাওয়া সম্ভাব্য আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন তিনি। কেউ উত্তর দিয়েছেন, কেউ জানিয়েছেন পারিবারিক ইতিহাস। কেউ বলেছেন পূর্বপুরুষের গ্রামের নাম, কেউ দিয়েছেন পুরোনো বসতির ঠিকানা। এভাবে একটি একটি করে তথ্য মিলিয়ে মার্টিনের সামনে উঠে আসতে থাকে বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের নাম।

সবচেয়ে বেশি যে জায়গাটির সঙ্গে তাঁর ডিএনএ-আত্মীয়দের সম্পর্ক পাওয়া যায়, সেটি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার মাথিউরা ইউনিয়ন। কয়েকজনের পূর্বপুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে আশপাশের জলঢুপ, বালিঙ্গা ও ভাদেশ্বর এলাকার। মাথিউরার দুধবকশী, মোল্লাগ্রাম, পশ্চিমপাড়, পূর্বপাড়, আওরঙ্গাবাদ ও দুয়াখা গ্রামের নামও উঠে এসেছে তাঁর অনুসন্ধানে।

কানাডার ভিক্টোরিয়ায় বসে মার্টিন এখন বাংলাদেশের এই গ্রামগুলোর দিকে তাকিয়ে আছেন। যে গ্রামগুলো তিনি হয়তো কখনও দেখেননি, সেখানেই থাকতে পারে তাঁর পিতৃপরিচয়ের সূত্র।

অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেট এর ওয়ারেন শহরে বসবাসকারী একটি পরিবারের সঙ্গে ডিএনএ-সম্পর্ক শনাক্ত হওয়ার পর। মার্টিনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ডিএনএ-আত্মীয়দের মধ্যে রয়েছেন জাহানারা আলি (Jahanara Aly) এবং তাঁর ছেলে মোহাম্মদ রাজন (Mohammed Razon)। জাহানারার জন্ম ১৯৭৩ সালে এবং মোহাম্মদের জন্ম ১৯৯৪ সালে। তাঁরা ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। জাহানারার পারিবারিক শেকড় মোল্লাগ্রামে এবং মোহাম্মদের বাবার বাড়ি দুধবকশীতে।

মার্টিনের ধারণা, জাহানারা প্রায় নিশ্চিতভাবেই তাঁর বৈমাত্রেয় ভাগনি। তিনি মনে করছেন, জাহানারার মায়ের বাবা এবং তাঁর নিজের বাবা একই ব্যক্তি। অর্থাৎ, জাহানারার মা সম্ভবত মার্টিনের বৈমাত্রেয় বোন। তাঁর এই ধারণা সঠিক হলে জাহানারার মাতামহের পরিচয় থেকেই পাওয়া যেতে পারে মার্টিনের বাবার নাম।

ইংল্যান্ডেও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ডিএনএ-আত্মীয়ের সন্ধান পেয়েছেন মার্টিন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে কাছের সম্পর্ক পাওয়া গেছে রমফোর্ডের তানিয়া মুহিতের (Tania Muhith) সঙ্গে। এরপর রয়েছেন লন্ডনের ফাতিমা ফেরদৌস (Fatima Fardus)। দুই নারীরই জন্ম ১৯৯১ সালে, লন্ডনে। মার্টিনের অনুমান, তাঁরা সম্ভবত তাঁর দ্বিতীয় কাজিন, তবে প্রজন্মের হিসাবে এক প্রজন্মের ব্যবধান রয়েছে।

তাঁদের পারিবারিক ইতিহাসের সূত্র ধরেও উঠে এসেছে সিলেটের একই অঞ্চলের নাম। বিশেষ করে ফাতিমা ফেরদৌসের পারিবারিক শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দুধবকশী। মোহাম্মদ রাজন ও ফাতিমা ফেরদৌসসহ মার্টিনের তিনজন ডিএনএ-আত্মীয়ের পূর্বপুরুষের বাড়ি ছিল এই গ্রামে। সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো লন্ডনের ফোর্ডহ্যাম স্ট্রিটের একটি পুরোনো সূত্র।

মার্টিনের সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, দুধবকশীর সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকজন ব্যক্তি ১৯৫৫ সালের কাছাকাছি সময়ে লন্ডনের ফোর্ডহ্যাম স্ট্রিটে বসবাস করতেন। মোহাম্মদ রাজন তাঁকে জানিয়েছেন, মার্টিনের জন্মের সময় দুধবকশী থেকে কয়েকজনের একটি ছোট দল ইংল্যান্ডে এসেছিল।

তথ্যটি মার্টিনের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁর জন্মও ১৯৫৫ সালে, লন্ডনে। তাহলে কি তাঁর বাবা ছিলেন সেই ছোট দলের একজন? তিনি কি ফোর্ডহ্যাম স্ট্রিটে বসবাস করতেন? নাকি তাঁদের পরিচিত অন্য কোনো সিলেটি ছিলেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই মার্টিন এখন পুরোনো পারিবারিক সূত্রগুলো মিলিয়ে দেখছেন।

মার্টিন তাঁর অনুসন্ধানে আরেকটি বিষয় লক্ষ করেছেন। ডিএনএ-আত্মীয়দের নাম ও পারিবারিক পরিচয়ের মধ্যে উদ্দিন, আলী, আহমেদ ও রহমানের মতো প্রচলিত পদবি রয়েছে। চৌধুরী, খান ও বেগম পদবিধারী অনেকের সন্ধানও পেয়েছেন তিনি। এ ছাড়া মুহিত, ফেরদৌস, লোদী, তালুকদার ও কাইয়ুম পদবিধারী পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের সূত্র পাওয়া গেছে।

তাঁর ধারণা, এসব পরিবারের কোনো কোনোটি মাথিউরা অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জমিদার বা মিরাশদার শ্রেণির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। সিলেটের গ্রামীণ সমাজে একসময় জমির মালিকানা, পারিবারিক মর্যাদা এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রভাবশালী পরিবারের সামাজিক অবস্থান গড়ে উঠেছিল। নিজেদের পরিচিত পারিবারিক পরিমণ্ডলের মধ্যে বিয়ের প্রচলনও ছিল। ফলে কয়েকটি পরিবারের মধ্যে বহু প্রজন্ম ধরে আত্মীয়তার সম্পর্ক বিস্তৃত থাকতে পারে। মার্টিন মনে করছেন, এমন কোনো পরিবারের সদস্য হয়ে থাকতে পারেন তাঁর বাবা।

বাবার বয়স সম্পর্কেও একটি ধারণা করেছেন তিনি। জাহানারা আলির জন্ম ১৯৭৩ সালে। এই তথ্য এবং সম্ভাব্য আত্মীয়তার প্রজন্মগত হিসাব মিলিয়ে মার্টিন মনে করছেন, তাঁর বাবার জন্ম সম্ভবত ১৯১০ সালের কাছাকাছি। সে হিসাবে ১৯৫৫ সালে তাঁর বয়স হতে পারে প্রায় ৪৫ বছর। অর্থাৎ, মার্টিনের জন্মের সময় তিনি সম্ভবত একজন মধ্যবয়সী মানুষ ছিলেন।

এখানে ব্রিটেনে সিলেটিদের অভিবাসনের ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই সিলেটের কিছু মানুষ ব্রিটেনে বসবাস করতেন। তাঁদের মধ্যে জাহাজের নাবিক ও কর্মীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল। পরবর্তী সময়ে কাজের সন্ধানে আরও মানুষ সেখানে যান। পঞ্চাশের দশকে এই অভিবাসনের ধারা নতুন গতি পায়। তখনকার সিলেটি অভিবাসীরা অনেক ক্ষেত্রেই একই গ্রাম ও আত্মীয়তার সূত্র ধরে ব্রিটেনে বসতি গড়ে তুলতেন। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের প্রকাশিত ঐতিহাসিক বিবরণেও এই অভিবাসনের ধারার কথা উঠে এসেছে।

সিলেটিদের ব্রিটেন অভিবাসন নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে, ১৯৫০-এর দশকের গোড়ায় লন্ডনে প্রায় ৩০০ জন সিলেটি বসবাস করতেন, যাঁদের প্রায় সবাই ছিলেন পুরুষ।

মার্টিনের অনুসন্ধানে সংখ্যাটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এত ছোট একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে মধ্যবয়সী একজন সিলেটি পুরুষ, বিশেষ করে তিনি যদি প্রতিষ্ঠিত বা সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য হয়ে থাকেন, তাহলে সমসাময়িক সিলেটিদের কাছে তাঁর পরিচিত থাকার সম্ভাবনা যথেষ্ট। তাঁর বিশ্বাস, সেই সময়ের সিলেটি পরিবারগুলোর উত্তরসূরিদের কাছে এখনও এমন তথ্য থাকতে পারে, যা তাঁর দীর্ঘ অনুসন্ধানের অবসান ঘটাবে।

মার্টিনের এই দীর্ঘ অনুসন্ধানের কথা আমার কাছে পৌঁছেছে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী লেখক ফারুক আহমেদের মাধ্যমে। মার্টিন তাঁর পারিবারিক ইতিহাস ও ডিএনএ অনুসন্ধানের বিস্তারিত বিবরণ ফারুককে পাঠিয়েছিলেন। ফারুক সেই চিঠিটি আমার কাছে পাঠান।

চিঠির শেষ দিকে মার্টিন নিজের একটি সাম্প্রতিক ছবির কথা লিখেছেন। ছবিটি এ বছরের মে মাসে তোলা। এখন তাঁর মাথায় খুব সামান্য চুল। কিন্তু তরুণ বয়সে ছিল ঘন, গাঢ় বাদামি চুল। তিনি আরও একটি পুরোনো ছবি পাঠানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

মার্টিন জোন্স কারও কাছে সম্পদ কিংবা উত্তরাধিকার দাবি করছেন না। তাঁর চিঠিতে এমন কোনো চাওয়ার কথা নেই। তিনি খুঁজছেন নিজের পরিচয়ের একটি হারিয়ে যাওয়া অংশ। জানতে চান, কে ছিলেন তাঁর বাবা, সিলেটের কোন বাড়িতে তাঁর পূর্বপুরুষদের বসবাস ছিল, আর বাংলাদেশের কোন পরিবারটির সঙ্গে তাঁর রক্তের সম্পর্ক।

মানুষের জীবনে অনেক অপূর্ণতা থাকে। সময়ের সঙ্গে কিছু অপূর্ণতা মেনে নিতে হয়। কিন্তু নিজের জন্মপরিচয়ের প্রশ্নটি এমন, যার উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধানের ইচ্ছা সহজে ফুরায় না। – নজরুল মিন্টো টরন্টো থেকে প্রকাশিত দেশেবিদেশে পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক।