২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ট্রাক শুধু ট্রাক নয়- একটি জাতীয় লজ্জার নাম ট্রাক শুধু ট্রাক নয়- একটি জাতীয় লজ্জার নাম

হাবিব রহমানঃএকটা ট্রাক। শুধু বালু বোঝাই একটা ট্রাক। অথচ এই ট্রাকের চেয়ে বেশি সৎ আর কিছু নেই এই রাষ্ট্রে। কারণ এই ট্রাক অন্তত মিথ্যা বলে না—সরাসরি রাস্তা আটকে দিয়ে বলে দেয়, “আজ থেকে তোমার গণতান্ত্রিক অধিকার স্থগিত।”

মনে আছে সেই দিনগুলো? বেগম খালেদা জিয়ার বাড়ির গেটে বালুর ট্রাক দাঁড়িয়ে, আর ক্ষমতাসীনরা মুখ ফিরিয়ে বলত, “আমরা জানি না, কে এনেছে।” পুলিশ জানত না, প্রশাসন জানত না, শুধু বালুই জানত তার কাজ কী। সেই সময় যারা এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে গলা ফাটিয়েছিলেন, মিছিল করেছিলেন, বিবৃতি দিয়েছিলেন—আজ তাদেরই উত্তরসূরির শাসনামলে সেই একই ট্রাক আবার রাস্তায়। শুধু গন্তব্য বদলেছে—আজ সেটা দাঁড়িয়ে আছে এনসিপির গাড়িবহরের সামনে, মৌলভীবাজার থেকে হবিগঞ্জ যাওয়ার পথে।

এইটাই সবচেয়ে নির্মম রসিকতা। যে ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হয় প্রহসন হিসেবে, সে কথা মার্ক্স বলে গেছেন বহু আগে। কিন্তু বাংলাদেশে ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হয় হুবহু একই কায়দায়—একই বালু, একই ট্রাক, শুধু ক্ষমতার চেয়ারে বসা মুখটা বদলে যায়। নাহিদ ইসলাম বৃষ্টিতে ভিজে রাস্তায় বসে পড়েন, পুলিশি ব্যারিকেডের সামনে। আসিফ মাহমুদ ফেসবুকে লেখেন, “বালুর ট্রাক দিয়ে আমাদের আটকানো যাবে না।” আর যিনি এই ট্রাকের শিকার হয়ে একদিন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হিসেবে প্রবাসজীবন কাটিয়েছেন, তার সরকারের অধীনেই আজ এই একই কৌশল প্রয়োগ হচ্ছে অন্য এক তরুণ রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে।

প্রশ্ন হলো—ক্ষমতা কি মানুষকে বদলে দেয়, নাকি ক্ষমতা আসলে কাউকেই বদলায় না, শুধু তার আসল রূপ প্রকাশ করে দেয়? যে মানুষ একদিন নিপীড়নের শিকার হয়ে ন্যায়বিচার চেয়েছিল, ক্ষমতায় এসে সে যদি একই নিপীড়নের যন্ত্র ব্যবহার করে, তাহলে তার প্রতিবাদের সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। এটা আর নীতির লড়াই থাকে না, এটা হয়ে যায় শুধু চেয়ারের লড়াই—কে বসবে, কে বালু পাবে, কে রাস্তা আটকাবে।

এই বালুর ট্রাক আসলে একটা আয়না। এই আয়নায় বাংলাদেশের প্রতিটি ক্ষমতাসীন শক্তি নিজের আসল চেহারা দেখতে পায়—আর প্রতিবারই লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নেয়, অথবা আরও বেশি বালু আনার নির্দেশ দেয়। জাতির বিবেক যদি সত্যিই জাগ্রত হতো, তাহলে এই ট্রাক বহু আগেই জাদুঘরে চলে যেত, ইতিহাসের নিদর্শন হয়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই ট্রাক এখনো রাস্তায়, এখনো সচল, এখনো কাজ করে চলেছে—নিরবচ্ছিন্নভাবে, নির্লজ্জভাবে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।