১লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মাদুরোর বিদায়: মার্কিন ‘বিজয়’ কি আসলে চীনের জন্য শাপে বর

২০২৬ সালের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ভেনিজুয়েলার দীর্ঘদিনের শাসক নিকোলাস মাদুরোর পতন বিশ্ব রাজনীতিতে বড় এক ধাক্কা। আপাতদৃষ্টিতে একে যুক্তরাষ্ট্রের বড় জয় এবং চীনের পরাজয় মনে হলেও, গভীর বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, মাদুরোকে হটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আসলে চীনের দীর্ঘদিনের এক ‘গলার কাঁটা’ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

চীন দীর্ঘদিন ধরে মাদুরো ও তার পূর্বসূরি হুগো শাভেজকে সমর্থন দিয়ে ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা গড়ে তুলেছিল। কিন্তু সেই সম্পর্ক প্রত্যাশামতো ফল দেয়নি। দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক ধসের কারণে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ক্রমাগত কমেছে। বিপুল মজুদের দেশ হয়েও ২০২৫ সালের শেষে উৎপাদন নেমে আসে দিনে মাত্র ৯ লাখ ব্যারেলে—যা চীনের মোট চাহিদার তুলনায় নগণ্য।

চীন ভেনিজুয়েলায় প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করলেও এর বড় অংশ এরইমধ্যে সস্তা তেলের মাধ্যমে পরিশোধ হয়ে গেছে। বর্তমানে বকেয়া রয়েছে মাত্র ১০–১৫ বিলিয়ন ডলারের তেল। ফলে মাদুরো সরকার পতনের পর চীন কার্যত একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও সুনাম ক্ষয়কারী বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছে।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক দায়। বিতর্কিত নির্বাচনের পর মাদুরোকে সমর্থন করায় লাতিন আমেরিকায় চীনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। এখন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ভেনিজুয়েলার দায়িত্ব নেয়ায়, ভবিষ্যতে কিছু ভুল হলে তার দায় ওয়াশিংটনের ওপরই পড়বে আর চীন খুব সহজেই যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করতে পারবে। এরইমধ্যে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনকারী’ এবং ‘বুলিং’ বা খবরদারি করার দায়ে অভিযুক্ত করে নিজেদের ক্লিন ইমেজ তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে।

মজার বিষয় হলো, ট্রাম্প প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ভেনিজুয়েলার তেল সরবরাহ সচল রাখা হবে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে ভেনিজুয়েলার তেল ক্ষেত্রগুলো সংস্কার করবে, আর চীন কোনো ঝুঁকি ছাড়াই সেই তেল পাওয়ার সুযোগ পাবে। চীনের অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ভেনেজুয়েলা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দ্বিতীয় ‘আফগানিস্তান’ হতে চলেছে, যা ওয়াশিংটনকে দীর্ঘকাল ব্যস্ত ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত রাখবে।

বিনিয়োগের টাকা প্রায় পুরোটাই তেলের মাধ্যমে উসুল করে নেয়া চীন এখন অনেকটা ‘সেফ জোন’-এ আছে। ভেনিজুয়েলার পতনোন্মুখ অর্থনীতি সামলানোর যে বিশাল বোঝা চীন এতদিন বইছিল, তা এখন হোয়াইট হাউসের কাঁধে। ওয়াশিংটন যখন একটি ধ্বংসপ্রায় রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনের জটিলতায় হিমশিম খাবে, বেইজিং তখন দূর থেকে বসে তার ভূ-রাজনৈতিক ফায়দা লুটবে—এমনটিই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।