২৪শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

চীন কেন বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর তালিকায় নাম লেখাতে চায় না

বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী চীন এখন উচ্চ-আয়ের দেশ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু বেইজিং নিজেকে বিশ্বের ধনী দেশগুলোর কাতারে শামিল করতে ইচ্ছুক নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যখন বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে লিপ্ত, তখন বেইজিং নিজেকে লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার “গ্লোবাল সাউথ” বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে।

তাছাড়া, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে এখনও “উন্নয়নশীল” দেশের মর্যাদা পাওয়ার কারণে চীন কিছু সুবিধা পেয়ে থাকে যার মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা মোকাবেলায় গঠিত বিভিন্ন বিশ্ব তহবিলে বাধ্যবাধকতামূলক আর্থিক অবদান না রাখার সুযোগ।

২০২৪ সালে জাতিসংঘের একটি অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তায় বেইজিংয়ের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী চীনের শীর্ষ নেতা শি জিনপিং বলেন, ‘চীন সবসময়ই গ্লোবাল সাউথ এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের অংশ হয়ে থাকবে।’ তা সত্ত্বেও, আগামী জুলাইয়ে বিশ্বব্যাংক যখন তাদের নতুন হিসাব প্রকাশ করবে, তখন ২০২৬ সালের জন্য চীনের উচ্চ-আয়ের দেশের শ্রেণিতে পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংক মূলত মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়—অর্থাৎ কোনো দেশের নাগরিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে ও বিদেশে মোট যত আয় করে তা দিয়ে এই শ্রেণি বিভাগ নির্ধারণ করে। মুদ্রা বিনিময়ের হারের অস্থিরতা এড়াতে একটি বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করে স্থানীয় মুদ্রাকে ডলারে রূপান্তর করা হয়।

২০২৫ সালের হিসাবে বিশ্বব্যাংক চীনের মাথাপিছু জাতীয় আয় নির্ধারণ করেছিল ১৪ হাজার ২৩০ ডলার, যা উচ্চ-আয়ের দেশের নিম্নসীমা ১৪ হাজার ৩৭৫ ডলারের ঠিক সামান্য নিচে ছিল।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফিলিপ শেলেকেন্সের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জন্য উচ্চ-আয়ের দেশের এই নিম্নসীমা বাড়িয়ে ১৪ হাজার ৫৫৪ ডলার করা হতে পারে। তার মানে চীনকে এই সীমা অতিক্রম করতে হলে মাথাপিছু জাতীয় আয় অন্তত ২.৩ শতাংশ বৃদ্ধি করতে হবে, যা তাদের ঐতিহাসিক প্রবৃদ্ধির হারের তুলনায় অনেকটাই কম।

তবে বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞায় “উচ্চ-আয়” বলতে কিন্তু মার্কিনিদের ধারণার মতো ধনকূপ হওয়া বোঝায় না। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় ছিল ৮৮ হাজার ৮১০ ডলার।

বিশ্বের দেশগুলোকে শ্রেণিবদ্ধ করার জন্য প্রতিটি আন্তর্জাতিক সংস্থার নিজস্ব ব্যবস্থা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চীনকে একটি ‘উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতি’ হিসেবে বিবেচনা করে এবং জাতিসংঘও একে ‘উন্নয়নশীল’ বলে গণ্য করে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) দেশগুলোকে নিজস্ব শ্রেণি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয়, আর চীন সেখানে নিজেকে ‘উন্নয়নশীল’ দেশের বিভাগেই রেখেছে।

ফরাসি ব্যাংক ‘ন্যাটিক্সিস’-এর এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে নিজেকে যেন ‘উন্নত অর্থনীতি’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা না হয়, তার জন্য চীন তার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে।’

বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যার ভিত্তিতে চীন ২০১০ সালে ‘উচ্চ-মধ্যম আয়ের’ দেশে পরিণত হয়েছিল। একই বছর চীন মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) দিক থেকে জাপানকে পেছনে ফেলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে ওঠে। জাতিসংঘের অর্থনীতিবিদ শেলেকেন্স বলেন, ‘চীন এত দ্রুত আয়ের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেছে যে তা আসলেই সত্যি আশ্চর্যজনক।’

বার্ষিক ১ ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারেরও বেশি বাণিজ্য উদ্বৃত্ত নিয়ে চীন যে বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ—এই বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিয়ে বেইজিং গত বছর জানিয়েছিল, তারা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় বিশেষ সুবিধা পাওয়ার জন্য নিজেদের ‘উন্নয়নশীল’ মর্যাদা ব্যবহারের চেষ্টা করবে না যেমন—চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অতিরিক্ত সময় দাবি না করা। বিশ্বব্যাংক, যারা ‘উন্নত’ বা ‘উন্নয়নশীল’ দেশের তকমা ব্যবহার করে না, তারা জানিয়েছে ২০৩১ সালের মধ্যে তারা চীনকে দেওয়া ঋণের সুবিধাসমূহ পর্যায়ক্রমে তুলে নেবে।

বিশ্বব্যাংক থেকে চীনের বার্ষিক ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ২০১৭ সালের ২.৪ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০২৫ সালে ৭৫০ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। চীন জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য হলো ২০৩৫ সালের মধ্যে একটি “মাঝারি স্তরের উন্নত দেশের” সমান মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) অর্জন করা, যা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বর্ণনা অনুযায়ী ২০ হাজার ডলারেরও বেশি। চীন নিজেকে অ-পশ্চিমা অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেছে এবং অর্থায়ন ও সাহায্যের ক্ষেত্রে পশ্চিমা চালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প তৈরি করেছে।

জাতিসংঘের অর্থনীতিবিদ শেলেকেন্স মনে করেন, ঢালাও তকমা বা ক্যাটাগরিগুলো ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। চীনের উপকূলীয় শহর যেমন—সাংহাই ও শেনঝেন বেশিরভাগ মাপকাঠিতেই বছরের পর বছর ধরে ধনী শহর হিসেবে বিবেচিত, যা এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের সমৃদ্ধ রাজধানীর মতোই।

অন্যদিকে, গত বছর চীনের সবচেয়ে দরিদ্র এক-পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) মানুষের মাসিক আয় ছিল গড়ে প্রায় ১২০ ডলারের কম।
শেলেকেন্স বলেন, ‘সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তবতার বিচারে বলা যায়, দেশটিতে এখনও ব্যাপক বৈষম্য রয়ে গেছে।’ – সংবাদ সুত্র দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল