১২ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বাংলাদেশ

দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’ স্লোগানে ১ ডিসেম্বর শুরু হচ্ছে বছরব্যাপী পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি

দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’ স্লোগানে ১ ডিসেম্বর শুরু হচ্ছে বছরব্যাপী পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি

একসময় বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন কমে আসা মোট প্রজনন হার আবার বাড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে কমেছে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার।

এ পরিস্থিতিতে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে নতুন করে গতি আনতে দেশব্যাপী বছরব্যাপী জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী ১ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির ব্যাপক প্রসারের ফলে একজন নারীর জীবদ্দশায় সন্তান জন্মদানের গড় সংখ্যা ১৯৭৫ সালের ৬ দশমিক ৩ থেকে কমে ২০১২ সালে ২ দশমিক ৩-এ নেমে আসে।

তবে এক দশকের বেশি সময় মোট প্রজনন হার ২ দশমিক ৩-এ স্থির থাকার পর তা বেড়ে ২ দশমিক ৪-এ দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে পরিবার পরিকল্পনার এই সূচকগুলোর অবনতি হয়েছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে বছরব্যাপী বড় ধরনের জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন শুরু করতে যাচ্ছি।’ ২০২৭ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলবে বলে জানান তিনি।

কর্মসূচির স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে—’দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়।’ স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা প্রাইমারি লেভেল থেকেই কার্যক্রম শুরু করব। জারি গান, সারি গান, বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলাসহ নানা মাধ্যমে স্লোগান প্রচার করা হবে।” তিনি জানান, কর্মসূচি শুধু প্রচার-প্রচারণায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবার পরিকল্পনা সেবার প্রয়োজনীয় উপকরণও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি ভালো উদ্যোগ। তবে দীর্ঘদিন পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে ধীরগতির প্রভাব ইতোমধ্যে মোট প্রজনন হার বৃদ্ধি, গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার কমে যাওয়া এবং অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, “শুধু প্রচার-প্রচারণা চালালে হবে না। একই সঙ্গে গর্ভনিরোধক সামগ্রীর পর্যাপ্ত সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে হবে।”

অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধের প্রভাব পড়েছে কর্মসূচিতে

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে পঞ্চম স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) অনুমোদন না পাওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেক্টর কর্মসূচি থেকে সরে আসার কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কেনার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এতে সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠকর্মীরা কনডম, খাবার বড়ি, আইইউডি, ইনজেকশন ও ইমপ্ল্যান্টসহ প্রায় ২৮ ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে সরবরাহ করেন। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় ধরে এসব সামগ্রী কেনা বন্ধ থাকায় অনেক উপজেলা ও মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত নেই।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পোর্টালের (এসসিএমপি) মনিটরিং ড্যাশবোর্ড অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের ১৯৮টি উপজেলায় কনডমের মজুত পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। এ ছাড়া ৩৫৪টি উপজেলায় জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি এবং ৪২৮টি উপজেলায় আইইউডির মজুত নেই।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. জিনাত রেহানা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গত দুই বছর ধরে মাঠপর্যায়ে গর্ভনিরোধক সামগ্রী সরবরাহ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ফলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেওয়ার কার্যক্রমও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

তিনি জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের অপারেশনাল প্ল্যানের অসমাপ্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিতে নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় গর্ভনিরোধক সামগ্রী কেনার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ডিসেম্বর নাগাদ এসব সামগ্রী সংগ্রহ করে মাঠপর্যায়ে বিতরণ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জিনাত রেহানা বলেন, “আমাদের জিনিসপত্র হাতে আসছে। এখন জনগণকে জানাতে হবে যে গর্ভনিরোধক সামগ্রী আবার পাওয়া যাচ্ছে—কোথায় পাওয়া যাবে এবং কীভাবে পাওয়া যাবে। এ জন্যই জাতীয়ভাবে একটি ক্যাম্পেইন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

করোনাকালে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া এবং বাল্যবিবাহ বেড়ে যাওয়াকেও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তিনি। জিনাত রেহানা বলেন, “বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে হবে। একই সঙ্গে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ কমাতে হবে এবং একটি সন্তানের পর পরবর্তী সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ বিরতি সম্পর্কে পরিবারগুলোকে সচেতন করতে হবে।”

জনবল সংকট বড় চ্যালেঞ্জ

পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ জনবল সংকট বলে জানান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দেওয়া পরিবার কল্যাণ সহকারীদের (এফডব্লিউএ) বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

“আমাদের প্রায় ৩৭ শতাংশ জনবল ঘাটতি রয়েছে। প্রায় ১৯-২০ হাজার কর্মী এখনো নেই, যা থাকার কথা ছিল। একজন কর্মীকে যদি অতিরিক্ত সংখ্যক বাড়ি কাভার করতে হয়, তাহলে দুই মাসে একটি বাড়িতে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে,” বলেন জিনাত রেহানা।

তবে জনবল সংকটের মধ্যেও বিদ্যমান কর্মীদের দিয়ে সেবা কার্যক্রম চালু রাখার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি। নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে প্রচার ও সেবা নিশ্চিতের তাগিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম বলেন, সাধারণ জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করে তাদের জন্য আলাদা কার্যক্রম নেওয়া জরুরি।

বিশেষ করে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন নারী, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারছেন না এমন ব্যক্তি এবং যেসব এলাকায় সেবাদাতা ও জনবলের ঘাটতি রয়েছে, সেসব জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সচেতনতামূলক কর্মসূচি ভালো উদ্যোগ হলেও প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া না গেলে এর সুফল পাওয়া কঠিন। মাইনুল ইসলাম আরও বলেন, শহরাঞ্চলে, বিশেষ করে দ্রুত বাড়তে থাকা অভিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিবার পরিকল্পনা সেবার চাহিদা দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত। এসব এলাকায় পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি জানান, দেশে পরিবার পরিকল্পনা সেবার অপূর্ণ চাহিদা বা ‘আনমেট নিড’ ইতোমধ্যে বেড়েছে। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে এটি শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল। এ পরিস্থিতিতে জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশলের আলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।