বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় (WHO) দায়িত্ব পালনকালে নিজের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা এবং প্রতিশোধমূলক আচরণের অভিযোগ তুলেছেন সাইমা ওয়াজেদ। দীর্ঘ সময় বেতনহীন থাকার পর শেষ পর্যন্ত কেন তাকে WHO ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতো বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বভাবতই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারী প্রত্যেক জ্যেষ্ঠ নেতা এমন রাজনৈতিক স্রোতের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন, যা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য WHO-এর আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় সাইমা ওয়াজেদ বিষয়টি বুঝেছিলেন। কিন্তু তিনি আশা করেননি যে, যে প্রতিষ্ঠানের জন্য তিনি তার পেশাজীবনের বড় একটি সময় ব্যয় করেছেন, সেই প্রতিষ্ঠানেই রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে যথাযথ প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শুরুতেই সাইমা ওয়াজেদ স্পষ্ট করেছেন যে, WHO-এর প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। কোনো পদে দায়িত্ব নেওয়ার বহু আগে থেকেই তিনি একজন বহিরাগত বিশেষজ্ঞ হিসেবে WHO-এর সঙ্গে কাজ করেছেন। তিনি অটিজম ও নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার নিয়ে কাজ করেছেন, WHO-এর মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ পরামর্শক প্যানেলে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সংস্থাটি বর্তমানে যে নীতিগুলো অনুসরণ করছে, সেগুলো তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছেন।
সাইমা ওয়াজেদের বক্তব্য অনুযায়ী, তার অভিযোগ WHO নামের প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নয়। বরং তার অভিযোগ বর্তমান WHO মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস কীভাবে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা মোকাবিলা করেছেন, তা নিয়ে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে সাইমা ওয়াজেদ ছুটিতে যেতে সম্মত হন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে প্রক্রিয়াটি ন্যায়সংগত হবে এবং নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে। কিন্তু তার মতে, এরপর যা ঘটেছে তা ছিল এক ধরনের পরিকল্পিত হয়রানি।
অভিযোগগুলোর সূত্র ছিল বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২১ সালে, WHO-তে যোগ দেওয়ার কয়েক বছর আগে, তিনি যে জমি কিনেছিলেন, সেটিকে কেন্দ্র করে দুদক একটি মামলা করে।
সাইমা ওয়াজেদের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি সম্পূর্ণ আইনসম্মতভাবে জমিটি কিনেছিলেন এবং ২০০৯ সালের ‘জাতির পিতার পরিবার-সদস্যদের নিরাপত্তা আইন’-এর অধীনে ওই জমির জন্য তিনি অধিকারীও ছিলেন।
তা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে বিচার করা হয়। অভিযোগ করা হয় যে তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন। সাইমা ওয়াজেদের বক্তব্য হলো, কর্তৃপক্ষ জানত যে এই দাবি সত্য নয়, কারণ সেই সময় তিনি প্রকাশ্যেই দিল্লিতে WHO-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।তিনি আরও বলেন, তার বিরুদ্ধে পরিচালিত বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয়ে তাকে আইনগতভাবে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি।
পরবর্তীতে একজন স্বাধীন আইনজীবী মামলাটি বিস্তারিত পর্যালোচনা করে, সাইমা ওয়াজেদের বক্তব্য অনুযায়ী, মত দেন যে বিচারটি প্রক্রিয়াগত ও আইনগতভাবে বেআইনি ছিল। তার বক্তব্য হলো, পুরো মামলাটির মূলেই ছিল তার মা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং তার প্রভাব তার ওপরও পড়েছে।
সাইমা ওয়াজেদ এসব বিষয়ে WHO-এর কাছে অভিযোগ জানান। একই সঙ্গে তিনি আরেকটি বিষয়ও উত্থাপন করেন। তার দাবি, তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং ড. টেড্রোসের মধ্যে এমন কিছু যোগাযোগের তথ্য পেয়েছিলেন, যেগুলো তার দৃষ্টিতে প্রচলিত কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে হয়নি।
এ ছাড়া মহাপরিচালকের দপ্তরের গোপনীয় নথি ফাঁস হওয়ার বিষয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উভয় বিষয়ে একটি স্বাধীন তদন্তের অনুরোধ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে সেই অনুরোধের কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি। পরে যখন উত্তর আসে, তখন তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়।
সাইমা ওয়াজেদের মতে, প্রশাসনিক প্রধানের বিরুদ্ধে তদন্তের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানোর মাত্র ১০ দিনের মধ্যে তার চলমান ছুটির ব্যবস্থা পরিবর্তন করাকে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ এবং তাকে আরও ভয় দেখানো ও হয়রানির চেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তার দৃষ্টিতে, সময়ের এই মিল, নতুন কোনো প্রমাণের অনুপস্থিতি এবং ছুটির ব্যবস্থা পরিবর্তনের পেছনে যথাযথ কারণ না থাকার বিষয়গুলো একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপের দিকে ইঙ্গিত করে।
তার মতে, এর উদ্দেশ্য ছিল তাকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপে রাখা, তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং তার বিরুদ্ধে ক্ষতিকর অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া, যখন তিনি প্রকাশ্যে নিজের পক্ষে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছিলেন না। এরপর যে তদন্তগুলো হয়েছে, তার প্রতিটি পর্যায়েই সাইমা ওয়াজেদ সহযোগিতা করেছেন বলে জানান। এর মধ্যে চীন সফরকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগের তদন্তও ছিল।
সাইমা ওয়াজেদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই চীন সফর কখনোই হয়নি। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ২০২৬ সালের আগস্টের শুরুতে WHO-এর অভ্যন্তরীণ তদারকি বিভাগ তাকে সরাসরি জানায় যে অভিযোগটি ভিত্তিহীন এবং মামলাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ততদিনে প্রায় এক বছর ধরে তিনি বেতনহীন ছিলেন এবং তার পেশাগত কাজেও কোনোভাবে যুক্ত হতে পারছিলেন না। সাইমা ওয়াজেদ তার নিজের আইনজীবীদের উত্থাপিত একটি তুলনাও সামনে আনেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ড. টেড্রোসের নিজের দায়িত্ব পালনের সময় ইথিওপিয়া সংক্রান্ত বিষয়ে তার বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু তাকে ছুটিতে পাঠানো হয়নি এবং তাকে কখনো বেতন ছাড়া ছুটিতেও পাঠানো হয়নি।
সাইমা ওয়াজেদ বলেন, তিনি এই তুলনা কাউকে সরাসরি দোষারোপ করার জন্য করছেন না। বরং তার বক্তব্য হলো, যথাযথ প্রক্রিয়ার কোনো অর্থ থাকতে হলে তা সবার জন্য একই হতে হবে। WHO-এর মহাপরিচালকের পদে কে আছেন বা কে নেই, তার ওপর নিয়মের প্রয়োগ নির্ভর করা উচিত নয়।
‘যোগসাজশ’ শব্দটি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সাইমা ওয়াজেদ সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।তিনি বলেন, তিনি শব্দটি হালকাভাবে ব্যবহার করেন না এবং তার বক্তব্যে এটি ব্যবহার করছেন না। তবে তার দাবি, তিনি এমন প্রমাণ দেখেছেন, যা থেকে বোঝা যায় ড. টেড্রোস বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এমন কিছু যোগাযোগ করেছেন, যা তার প্রত্যাশিত স্বাভাবিক চ্যানেলের বাইরে ছিল।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময় একই কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছিল। তিনি WHO-কে এসব যোগাযোগ পরীক্ষা করে দেখার অনুরোধ করেছেন। তার দাবি, আগের অনুরোধগুলোর মতো এই অনুরোধেরও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। সাইমা ওয়াজেদ তার পারিবারিক পরিচয় নিয়েও সরাসরি কথা বলেছেন। তিনি বলেন, তিনি শেখ হাসিনার মেয়ে এবং এই পরিচয় নিয়ে তিনি গর্বিত।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, WHO-এর নিজস্ব যাচাই ও মনোনয়ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তাকে আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জ্যেষ্ঠ পদে মনোনীত ব্যক্তিদের অনেকেরই রাজনৈতিক বা জনজীবনের সঙ্গে কোনো না কোনো সম্পর্ক থাকে।
তার মতে, কারও পারিবারিক বা রাজনৈতিক পরিচয়কে তার পেশাগত যোগ্যতার পরিবর্তে দায়িত্ব পালনের অযোগ্যতার কারণ হিসেবে দেখানো হলে সেটিকে জবাবদিহি বলা যায় না। তিনি এটিকে সতর্কতার ভাষায় প্রকাশ করা পক্ষপাতিত্ব হিসেবে বর্ণনা করেন।
প্রায় এক বছর কোনো আয় ছাড়া, নিজের পেশাগত জীবনের বহু বছরের কাজ থেকে দূরে থেকে এবং অন্য কোনো পদ গ্রহণের সুযোগ না পেয়ে সাইমা ওয়াজেদ শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে WHO-এর ভেতরে অপেক্ষা করে থাকার মতো আর কোনো অর্থবহ পথ তার সামনে নেই। তিনি পদত্যাগ করেন।
তার বক্তব্য হলো, তিনি পদত্যাগ করেছেন এই কারণে নয় যে তিনি কোনো ভুল করেছেন। কিংবা তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো তদন্তে টিকে গেছে বলেও নয়। বরং তার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি পদত্যাগ করেছেন কারণ তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল, মামলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং WHO-এর নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সেই মামলা বন্ধ হওয়া ছাড়া তাকে আর কিছু দেওয়া হয়নি।
তার প্রতি আচরণের বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, কোনো জবাবদিহি করা হয়নি এবং তিনি যে প্রতিশোধমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন বলে মনে করেন, সেটি কখনো তদন্ত করা হবে এমন কোনো ইঙ্গিতও দেওয়া হয়নি।সাইমা ওয়াজেদ এখনো বলেন যে তিনি WHO-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে বিশ্বাস করেন।
তিনি আরও মনে করেন, সংস্থাটির অধিকাংশ কর্মকর্তা ও কর্মী সততা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করেন। তবে তার বক্তব্য হলো, যে প্রতিষ্ঠান বিশ্বের কাছে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়ে তার সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখতে বলে, সেই প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম সমানভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হতে হবে।
গত দেড় বছরে তার অভিজ্ঞতা, তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে এই ধারণা দিয়েছে যে অন্তত এই মুহূর্তে WHO সেই মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। তিনি আশা করেন, সেখানে যারা এখনো সৎ উদ্দেশ্যে কাজ করছেন, তাদের স্বার্থে প্রতিষ্ঠানটি আবার সেই মানদণ্ডে ফিরে আসবে।
এই মুহূর্তে সাইমা ওয়াজেদের বক্তব্য অনুযায়ী তার প্রধান লক্ষ্য হলো, তার বিরুদ্ধে আরও ক্ষতিকর গুজব ছড়ানো বন্ধ করা এবং তার পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, যাতে তিনি আবার তার পছন্দের কাজে ফিরতে পারেন এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করে যেতে পারেন।
সাইমা ওয়াজেদ বাংলাদেশের সরকারের নিউরোডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি WHO-এর বিশেষজ্ঞ, উপদেষ্টা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
উপরের বক্তব্যে উত্থাপিত অভিযোগ ও মতামত সাইমা ওয়াজেদের বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হলো। সিএসপিসি এগুলো তার বর্ণনা ও অবস্থান হিসেবে তুলে ধরছে এবং এতে থাকা বিতর্কিত অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা নির্ধারণ করছে না। সংবাদ সুত্র সিএসবি নিউজ ।













