১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আর্ন্তজাতিক

হুথি হামলায় ক্ষতবিক্ষত সৌদিকে ফেলে পালিয়েছে ‘বন্ধু’ পাকিস্তান, আরবদের বাঁচাতে আসরে ‘শত্রু’ রাষ্ট্র ইজ়রায়েল!

হুথি হামলায় ক্ষতবিক্ষত সৌদিকে ফেলে পালিয়েছে ‘বন্ধু’ পাকিস্তান, আরবদের বাঁচাতে আসরে ‘শত্রু’ রাষ্ট্র ইজ়রায়েল!

ইরান মদতপুষ্ট হুথিদের আক্রমণ ঠেকাতে এ বার সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করতে পারে ‘শত্রু’ দেশ। যদিও সামরিক চুক্তি থাকা সত্ত্বেও রিয়াধের পাশে নেই পাকিস্তান ও তুরস্ক।রীতিমতো ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে ‘সই’ পাতিয়েছে সৌদি আরব! কিন্তু, এক মাস যেত না যেতেই উলট-পুরাণ। ‘বন্ধুত্বের’ শর্ত মেনে সাহায্য তো দূর অস্ত, চরম বিপদগ্রস্ত রিয়াধের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না ইসলামাবাদ ও আঙ্কারা। বরং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ইহুদিদের দেশ ইজ়রায়েল, যাঁদের ‘শত্রু’ হিসাবে চিহ্নিত করে এখনও স্বীকৃতিই দেয়নি খনিজ তেল সমৃদ্ধি ওই উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী ইয়েমেনের মোকা বন্দর কব্জা করে ‘আনসার আল্লাহ’ নামের সেখানকার একটি শিয়া বিদ্রোহী গোষ্ঠী। ইরান মদতপুষ্ঠ সশস্ত্র সংগঠনটি অবশ্য হুথি হিসাবে বেশি পরিচিত। এই সাফল্যে আত্মবিশ্বাস কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে তাদের। ফলে লাগাতার সৌদির জ্বালানি পরিকাঠামোকে নিশানা করছে তারা। বন্ধ রেখেছে সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা বাব এল-মান্দেবও।

রিয়াধের আশঙ্কা, ইসলামের পবিত্র শহর মক্কায় এ বার ক্ষেপণাস্ত্র ও ‘ফিদায়েঁ’ ড্রোনে হামলা চালাবে হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এর জেরে চরম সতর্কতা জারি করেছে সৌদি সরকার। শুধু তা-ই নয়, সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতিতে পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক সাহায্য পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল ওই উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র। কিন্তু, ইসলামাবাদ কার্যত তা অস্বীকার করায় ‘শত্রু’ ইজ়রায়েলের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছে তারা।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর এই ইস্যুতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে পশ্চিম এশিয়ার ইহুদি রাষ্ট্রটির জনপ্রিয় গণমাধ্যম ‘দ্য জ়েরুজ়ালেম পোস্ট’। সেখানে বলা হয়েছে, মার্কিন ফৌজের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম-এর মধ্যস্থতায় সম্ভাব্য হুথি হামলা ঠেকানোর ব্যাপারে সৌদি প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা সেরেছে ইজ়রায়েল। পাশাপাশি, রিয়াধের আত্মরক্ষার্থে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ নিয়ে দু’তরফে ‘ইতিবাচক’ কথা হয়েছে বলেও জানা গিয়েছে।

দ্য জ়েরুজ়ালেম পোস্ট’ জানিয়েছে, প্রথমে সেন্টকমের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে বৈঠক করেন সৌদির যুবরাজ তথা প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ বিন সলমন (এমবিএস)। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ওই সামরিক শীর্ষকর্তার মধ্যস্থতায় ইজ়রায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ হয় তাঁর। ইহুদিদের বাদ দিলে আমেরিকা, ব্রিটেন এবং মিশরের কাছেও সামরিক সাহায্য চেয়েছেন তিনি। গত কয়েক দশকের নিরিখে এই পদক্ষেপকে নজিরবিহীন বলা যেতে পারে।

সৌদি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হল খনিজ তেল। মূলত দু’টি সামুদ্রিক রাস্তায় তরল সোনা সারা বিশ্বে সরবরাহ করে রিয়াধ। সেগুলি হল, হরমুজ় এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালী। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হওয়া ইস্তক প্রথমটি অবরুদ্ধ রেখেছে ইরান। অন্য দিকে, বর্তমানে দ্বিতীয়টির নিয়ন্ত্রণ একরকম চলে গিয়েছে তেহরান মদতপুষ্ট হুথিদের হাতে।

হরমুজ় প্রণালীতে ইরানি অবরোধ ভাঙতে গত সাত মাস ধরে মার্কিন ফৌজকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে ‘ইজ়রায়েল ডিফেন্স ফোর্স’ বা আইডিএফ। বাব এল-মান্দেবের জন্যও সেই একই কাজ এ বার করতে দেখা যেতে পারে তাদের। তা ছাড়া, ইউরোপের বাজারে খনিজ তেলের সরবরাহ চালু রাখতে রিয়াধের পাশে দাঁড়ানোর প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে তেল আভিভের। যদিও কোনও কিছু নিয়েই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি।

গত ১১ সেপ্টেম্বর বাব এল-মান্দেব প্রণালীর ঠিক মাঝামাঝি অবস্থিত পেরিম দ্বীপ দখল করে হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এর পরই সৌদির বিরুদ্ধে বড় পদক্ষেপ করে তারা। ইরানি মদতপুষ্ঠ সংগঠনটি জানিয়েছে, এই সামুদ্রিক রাস্তায় চলাচল করবে না রিয়াধের কোনও পণ্যবাহী জাহাজ। তবে যুক্তরাষ্ট্র-সহ অন্যান্য দেশের জলযানের উপর জারি হয়নি কোনও নিষেধাজ্ঞা। এতে আরব রাষ্ট্রটির উপর যে চাপ বেড়েছে, তা বলাই বাহুল্য।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের জুলাই থেকেই বাব এল-মান্দেব দিয়ে খনিজ তেল সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে সৌদির। এই পরিস্থিতিতে ইজ়রায়েলি জ্বালানিমন্ত্রী রিয়াধকে ‘দুর্দান্ত প্রস্তাব’ দিয়েছেন বললে অত্যুক্তি হবে না। তেল আভিভ চাইছে লোহিত সাগর উপকূলবর্তী ইহুদি শহর আইলাত পর্যন্ত ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন বিস্তার করুক রিয়াধ। পরে সেখান থেকে ভূমধ্যসাগরের বন্দর আশকেলন হয়ে ইউরোপে পৌঁছোবে সেই তরল সোনা।

ইহুদিদের এ-হেন পদক্ষেপের নেপথ্যে একাধিক কারণ খুঁজে পেয়েছেন সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ। প্রথমত, বিপদের দিনে পাশে দাঁড়িয়ে রিয়াধকে দলে টানার মরিয়া চেষ্টা করছে তেল আভিভ। দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে সৌদির থেকে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি পেতে পারে ইজ়রায়েল। সে ক্ষেত্রে অনেকটাই একঘরে হয়ে পড়বে প্যালেস্টাইনপন্থী আরবরা। তখন পশ্চিম এশিয়ায় নিজেদের অবস্থান মজবুত করা অনেক সহজ হবে তাদের।

অতীতে বহু বার এই পদ্ধতিতে দুর্দান্ত সাফল্য পেয়েছে ইহুদি রাষ্ট্র। উদাহরণ হিসাবে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির কথা বলা যেতে পারে। ২০২০ সালে ইজ়রায়েলকে স্বীকৃতি দেয় আবু ধাবি। ইরান যুদ্ধে শুরু হতেই পাল্টা প্রত্যাঘাত শানাতে আরব দেশটির মার্কিন ঘাঁটি, জ্বালানি পরিকাঠামো-সহ কৌশলগত জায়গাগুলিকে নিশানা করে তেহরান। সঙ্গে সঙ্গে আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা পাঠিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ায় তেল আভিভ।

একই ভাবে জার্মানির সঙ্গে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি সেরেছে ইজ়রায়েল। গত বছরের (পড়ুন, ২০২৫ সাল) ডিসেম্বরে বার্লিনকে ‘অ্যারো-৩’ নামের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করে তেল আভিভ। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রকে মাঝ-আকাশে ধ্বংস করার ক্ষমতা রয়েছে এটির। মজার বিষয় হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) পর্বে ইহুদিদের গণহত্যার জন্য দায়ী ছিল একমাত্র ইউরোপের এই দেশ।

১৯৩৩ সালে জার্মানির কুর্সিতে বসেন নাৎজ়ি পার্টির নেতা তথা ফ্যুয়েরার আডল্‌ফ হিটলার। তাঁর নির্দেশে ৬০ লাখ ইহুদিকে হত্যা করেন ইউরোপীয় দেশটির তৎকালীন রাজনৈতিক এবং সামরিক নেতৃত্ব। ইতিহাসে তা হলোকাস্ট নামে পরিচিত। বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্বে বার্লিনের পতন ঘটলে বন্ধ হয় সেই গণহত্যা। তার পরেও অবশ্য দীর্ঘদিন ইজ়রায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের তেমন উন্নতি হয়নি।

বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দুই ভাগে বিভক্ত হয় জার্মানি। দেশটির পশ্চিম অংশ শাসন করত মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী বিশ্ব। অন্য দিকে, পূর্ব দিকের জমি ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণাধীন। কিন্তু, ১৯৯০ সালে দু’টি অংশ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্ক। ফলে পরবর্তী বছরগুলিতে অতীত ভুলে ইহুদিদের সঙ্গে নতুন আঙ্গিকে সুসম্পর্ক স্থাপনে হিটলারের উত্তরসূরিদের সমস্যা হয়নি।

তা ছাড়া, এ ব্যাপারে ভারত ও ইজ়রায়েলের ‘বন্ধুত্বের’ কথাও বলা যেতে পারে। ১৯৪৮ সালে পশ্চিম এশিয়ায় ইহুদি রাষ্ট্রটির জন্মের সময় রাষ্ট্রপুঞ্জে তাদের বিরুদ্ধে ভোট দেয় নয়াদিল্লি। যদিও তেল আভিভকে স্বীকৃতি দিতে বেশি দেরি করেননি (পড়ুন, ১৯৫০ সাল) দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। তবে ১৯৯২ সালের আগে দু’তরফে ছিল না কোনও কূটনৈতিক সম্পর্ক।

ভারতে দূতাবাস না থাকলেও বিপদে-আপদে বরাবর নয়াদিল্লির পাশেই থেকেছে ইজ়রায়েল। ১৯৬৫, ১৯৭১ এবং ১৯৯৯ সালের পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে বহু গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার এ দেশের সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিতে কার্পণ্য করেনি পশ্চিম এশিয়ার ওই ইহুদি রাষ্ট্র। সেগুলি রাতারাতি লড়াইয়ের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৃঢ় হয়েছে দু’তরফের ‘বন্ধুত্ব’।

সেই একই নীল নকশা এ বার সৌদির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে চাইছে ইজ়রায়েল। তাতে সাফল্যের সোনালি রেখা ফুটে উঠতে পারে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ। কারণ, সম্প্রতি স্কুলপাঠ্যে আমূল বদল ঘটিয়েছে রিয়াধ। সেখানে আরব দুনিয়ায় ইহুদি আগ্রাসনের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলিকে বাদ দিতে দেখা গিয়েছে তাদের।

গত বছরের (পড়ুন, ২০২৫ সাল) সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সঙ্গে ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সারে সৌদি আরব। সেখানে বলা হয়েছে, এই দুইয়ের মধ্যে কোনও একটি দেশ তৃতীয় কোনও শক্তি দ্বারা আক্রান্ত বা আগ্রাসনের শিকার হলে, তাকে উভয় দেশের উপর আঘাত বা যুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করা হবে। এই সমঝোতার উপর ভিত্তি করে এ বছরের অগস্টে সই হয় মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি।

গত বছরের (পড়ুন, ২০২৫ সাল) সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সঙ্গে ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সারে সৌদি আরব। সেখানে বলা হয়েছে, এই দুইয়ের মধ্যে কোনও একটি দেশ তৃতীয় কোনও শক্তি দ্বারা আক্রান্ত বা আগ্রাসনের শিকার হলে, তাকে উভয় দেশের উপর আঘাত বা যুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করা হবে। এই সমঝোতার উপর ভিত্তি করে এ বছরের অগস্টে সই হয় মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি।

গত বছরের (পড়ুন, ২০২৫ সাল) সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সঙ্গে ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সারে সৌদি আরব। সেখানে বলা হয়েছে, এই দুইয়ের মধ্যে কোনও একটি দেশ তৃতীয় কোনও শক্তি দ্বারা আক্রান্ত বা আগ্রাসনের শিকার হলে, তাকে উভয় দেশের উপর আঘাত বা যুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করা হবে। এই সমঝোতার উপর ভিত্তি করে এ বছরের অগস্টে সই হয় মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। – কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার থেকে