এক আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার আদেশ চলাকালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের কিছু মন্তব্যের জেরে এজলাস ছেড়ে যান প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও আপিল বিভাগের অপর চার বিচারক৷
ঢাকার দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের খবর অনুযায়ী, গত ৮ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ-সংক্রান্ত একাধিক রিটের আপিল শুনানির সময় এ ঘটনা ঘটে৷ তবে ঘটনার সময় সাংবাদিকেরা সেখানে ছিলেন না, কারণ, চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি থেকে বিচার চলাকালে আদালতকক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধ৷
জানা গেছে, শুনানির সময় ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতিকে বলেন, জুবায়ের রহমান চৌধুরী প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর থেকে আইনজীবীদের আয় কমে গেছে৷ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা হওয়া এক জুনিয়র আইনজীবীর প্রতি নমনীয়তা দেখানোর আর্জি জানানোর সময় তিনি এ মন্তব্য করেন৷
‘সম্মানের সঙ্গে বলেছিলাম…’
পরে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘‘আমি সম্মানের সঙ্গে বলেছিলাম, তিনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আগের মতো মামলাগুলোর শুনানি হচ্ছে না৷ এর ফলে আইনজীবীদের আয় কমে গেছে৷ একজন জুনিয়র আইনজীবীর ওপর পাঁচ লাখ টাকা খরচা আরোপ করাটা অনেক বেশি৷ আমি তাকে (আইনজীবীকে) ক্ষমা করে দেওয়ার আর্জি জানিয়েছিলাম৷”
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি বলেন, ‘‘এই মন্তব্যের পর প্রধান বিচারপতি জানতে চান যে তার নিয়োগের পর সত্যিই আইনজীবীদের আয় কমেছে কি না৷” ‘আগে ১১ জন বিচারপতির সমন্বয়ে তিনটি বেঞ্চ ছিল, এখন একক বেঞ্চ’
জবাবে মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রধান বিচারপতিকে বলেন, ‘‘আপিল বিভাগে আগে ১১ জন বিচারপতির সমন্বয়ে তিনটি বেঞ্চ ছিল, যেখানে আরো বেশি মামলার শুনানি সম্ভব হতো৷ এখন একক বেঞ্চ থাকায় মামলার শুনানির জন্য আইনজীবীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়৷”
তিনি আরো বলেন, ‘‘আপিল বিভাগে কোনো মামলা কেন ওপর থেকে নিচে নেমে গেল বা কেন এর শুনানি হচ্ছে না—তা উল্লেখ (মেনশন) করার কোনো সুযোগ নেই৷”
এই পরিস্থিতির কারণে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবী উভয়েই চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘মামলার শুনানি না হওয়ায় মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে৷ আইনজীবীরা যদি কম মামলা পান, তবে তারা আয় করবেন কীভাবে? তাদের আয় অনেক কমে গেছে৷”
মাহবুব উদ্দিন খোকন জানান, তার মন্তব্যের পর প্রধান বিচারপতি এত কড়া প্রতিক্রিয়া দেখাবেন এটা তিনি আশা করেননি৷ তিনি আরো বলেন, আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসেবে প্রধান বিচারপতির সামনে তাদের অবস্থা তুলে ধরা তার দায়িত্ব৷
যে কারণে জুনিয়র আইনজীবীর পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা
তথ্য গোপন এবং নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ নিয়ে একই বিষয়ে একাধিক রিট পিটিশন দায়েরের অভিযোগে আপিল বিভাগ রিট আবেদনকারী মো. নূর আলম এবং তার আইনজীবী সুফিয়া আহমেদকে ৫ লাখ করে মোট ১০ লাখ টাকা খরচা আরোপ (জরিমানা) করেন৷ আদালত আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই টাকা ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন৷ মূলত এই আদেশ চলাকালেই বিতর্কের সূত্রপাত৷
আদালতে নূর আলমের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন৷ অন্যদিকে, আরেক নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অনীক আর হক, মোহাম্মদ শিশির মনির এবং আইনজীবী অমিত দাস গুপ্ত৷
আপিল বিভাগে ঠিক কী ঘটেছিল এবং প্রধান বিচারপতি কেন এজলাস ত্যাগ করেছিলেন—এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন আপিল বিভাগে আসেন এবং বলেন আদালত এক আইনজীবীকে জরিমানা করেছেন৷ জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, দেখুন, আমরা সবকিছু বিবেচনা করেই আদেশ দিয়েছি৷ আমরা আমাদের আদেশ পরিবর্তন করব না৷”
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘‘ওই আইনজীবী আদালতের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন এবং এমনকি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি আগের আদেশও অমান্য করেছেন৷ এ পরিস্থিতিতে প্রধান বিচারপতি তাকে (খোকন) এ ধরনের কথা না বলতে বলেন৷”
কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘‘আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর থেকে আইনজীবীদের আয়-রোজগার কমে গেছে৷” অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্য, প্রধান বিচারপতি প্রথমে মন্তব্যটিকে হালকাভাবে নিলেও পরে জিজ্ঞাসা করেন, ‘‘আপনি কি সত্যিই এই কথা বোঝাচ্ছেন?”
কিন্তু বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একই ধরনের মন্তব্য করতে থাকেন বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল৷ তখন প্রধান বিচারপতি তাকে বলেন, ‘‘আপনি যা বলেছেন তা আদালত অবমাননার শামিল৷ যেহেতু আপনি এত গুরুতর একটি মন্তব্য করেছেন, তাই আমি আজকের বিচারিক কার্যক্রমে আর অংশ নেবো না৷” অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, এই কথা বলেই প্রধান বিচারপতি এজলাস কক্ষ ত্যাগ করেন৷













