ইতিহাস বলছে, সরকার টিকে থাকা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান আরও শক্ত হয়। এদিকে ইরানি নেতারা আছেন আরেক আশঙ্কায়। তাঁদের ধারণা, ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অটল সমর্থন দেশটিকে ইরানের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধে প্ররোচিত করছে। এই আশঙ্কা ইরানের ভেতরে সরকার ও সমাজের মধ্যে সংঘাতকে আরও তীব্র করেছে। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে যদি এই সংঘাত চলতে থাকে, তাহলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা সরকার পরিবর্তনের দিকেও যেতে পারে। এই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মাহজুব জুয়েইরি মধ্যপ্রাচ্য–বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
পরিচয় ডেস্ক: ১৯৭৩ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ও ভিয়েতনামের বিপ্লবী নেতা লে ডাক থোকে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হলে বিশ্বজুড়ে বিস্ময় ছড়িয়ে পড়ে। সমালোচনার মূল কারণ ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে কিসিঞ্জার ছিলেন বোমাবর্ষণের অন্যতম নকশাবিদ। চিলির সামরিক অভ্যুত্থানেও তিনি সমর্থন দেন। আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তার নীতির ফলে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। তবু তাকে পুরস্কৃত করা হয় ‘শান্তি আলোচনায় অবদান’ রাখার কারণ দেখিয়ে। সে সময় বহু গবেষক এ সিদ্ধান্তকে ব্যঙ্গ করে আখ্যা দেন ‘নোবেল ওয়ার প্রাইজ’। প্রতিবাদস্বরূপ নোবেল কমিটির দুই সদস্য পদত্যাগও করেন। নোবেল প্রত্যাখ্যান করেন ডাক থো। সমালোচকদের মতে, শীতল যুদ্ধকালীন নোবেল শান্তি পুরস্কারের সিদ্ধান্তগুলো অনেক ক্ষেত্রেই পশ্চিমা রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ ছিল। সম্প্রতি এ বিতর্ক আরো বেড়েছে।
সমালোচনা রয়েছে, এমন সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হয় যাদের অবস্থান ও কর্মকাণ্ড পশ্চিমা ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সুবিধাজনকভাবে মিলে যায়। অনেক সমালোচকের চোখে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার হয়ে উঠছে ‘সিলেক্টিভ মোরালিটি’র প্রতীক। চলতি বছর ভেনিজুয়েলার মারিয়া কোরিনা মাচাদো, ২০২১ সালে মারিয়া রেসা ও দিমিত্রি মুরাতভ, ২০২২ সালে আলেস বিয়ালিয়াতস্কি, মেমোরিয়াল ও সেন্টার ফর সিভিল লিবার্টিজ, ২০২৩ সালে নারগেস মোহাম্মাদি—তাদের প্রত্যেকের নোবেলপ্রাপ্তি ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, এ পুরস্কার মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের সংগ্রামের স্বীকৃতি হলেও একই সঙ্গে পশ্চিমা রাজনৈতিক কূটনৈতিক স্বার্থকে বৈধতা দেয় কিনা। স্বৈরতন্ত্র ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাহসী প্রতিরোধ নিয়ে সন্দেহের খুব বেশি অবকাশ নেই, কিন্তু পুরস্কৃত করার ক্ষেত্রে শুধু এমন লোকদেরই কেন বেছে নেয়া হয় যাদের অবস্থান পশ্চিমা ভূরাজনীতির জন্য সুবিধাজনক।
সমাজবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘ম্যাথিউ ইফেক্ট’। এ তত্ত্বের অর্থ হলো যাদের আগে থেকেই খ্যাতি ও প্রভাব আছে, স্বীকৃতি পেলে সেই ক্ষমতা আরো বহু গুণ বেড়ে যায়; আর তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান ব্যক্তিরা আরো পিছিয়ে পড়ে। নোবেল শান্তি পুরস্কারের ক্ষেত্রেও এ প্রভাব কাজ করে। কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন পুরস্কার পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু তাদের কাজই নয়, তাদের মতাদর্শ, রাজনৈতিক অবস্থান ও বয়ানও ‘সঠিক ও ন্যায়সংগত’ হিসেবে বেশি স্বীকৃতি পায়। ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে নির্দিষ্ট এক পক্ষের ন্যারেটিভ ও কৌশলগত এজেন্ডা আরো শক্তিশালী হয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুবিধা তৈরি হয়। অথচ এ তাত্ত্বিক বাস্তবতা নোবেল পুরস্কারের প্রাথমিক দর্শনের সঙ্গে পরিষ্কার বৈপরীত্য তৈরি করে। আলফ্রেড নোবেল এ পুরস্কার কল্পনা করেছিলেন প্রকৃত পুনর্মিলন, সশস্ত্র সংঘাত কমানো এবং যুদ্ধের ক্ষত নিরাময়ের স্বীকৃতি হিসেবে। তার অভিপ্রায় ছিল মানবিক ও নৈতিক, প্রদর্শনমূলক নয়।
ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে চলতি বছর শান্তিতে নোবেল দেয়ার সিদ্ধান্ত শুরু থেকে অনেকে রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখেছেন। নোবেল কমিটি তার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, রাজনৈতিক বন্দিদের পক্ষে অবস্থান ও শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনের ভূমিকা তুলে ধরলেও সমালোচকদের একাংশের অভিযোগ—মাচাদো আসলে ওয়াশিংটন ও পশ্চিমা মিত্রদের কাঙ্ক্ষিত শাসন পরিবর্তন ন্যারেটিভের মূল মুখপাত্র। তিনি নিজেও বহুবার বিদেশী নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক চাপের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রতে ভেনিজুয়েলায় অভিযান চালানোর কথাও বলেছেন, যা শাভেজ-মাদুরো শিবিরে তাকে ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ববিরোধী’ চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। তার নোবেলপ্রাপ্তি গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের পাশাপাশি পশ্চিমা ভূরাজনীতির বিতর্কও ঘনীভূত করেছে।
ইরানি মানবাধিকারকর্মী নারগেস মোহাম্মাদিকে ২০২৩ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কারাবন্দিদের অধিকার, নারী স্বাধীনতা ও বাধ্যতামূলক হিজাববিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ইরানের কঠোর নিরাপত্তা নীতির ভেতর থেকেও রাজপথ, আদালত ও কারাগার—সব জায়গায় তার প্রতিবাদ চলেছে। নোবেল কমিটির ভাষ্য, তার সংগ্রাম ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের স্বাক্ষর। সে কারণে পুরস্কারটি ছিল একটি নৈতিক অবস্থান। তবে ইরান সরকারের কাছাকাছি মহল ও রাষ্ট্রপন্থী বিশ্লেষকদের দাবি, এটি পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের ইরানবিরোধী কূটনৈতিক চাপের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। তাদের যুক্তি, মোহাম্মাদিকে নোবেল দেয়া মানে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে একপক্ষকে বৈশ্বিক নৈতিক বৈধতা দেয়া।
২০২২ সালে শান্তিতে নোবেল যৌথভাবে দেয়া হয় বেলারুশের মানবাধিকারকর্মী আলেস বিয়ালিয়াতস্কি, রাশিয়ার ঐতিহাসিক মানবাধিকার সংগঠন মেমোরিয়াল এবং ইউক্রেনের সেন্টার ফর সিভিল লিবার্টিজকে। নোবেল কমিটির ভাষ্যে, তাদের কাজ ছিল রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার রক্ষা, যুদ্ধাপরাধ ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের দলিল সংরক্ষণ এবং নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে নৈতিক প্রতিরোধের অংশ। সমালোচকরা যুক্তি দেন, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ স্বীকৃতি পশ্চিমা জোটের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে নৈতিক বৈধতা দিয়েছে। অনেকের অভিযোগ, এ পুরস্কার ছিল মূলত পশ্চিমা বিশ্বের রাশিয়াবিরোধী ন্যারেটিভকে শক্তিশালী করার প্রয়াস। তাদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে মেমোরিয়াল ও সিভিল লিবার্টিজের স্বীকৃতি আসলে যুদ্ধ রাজনীতির একপক্ষীয় ব্যাখ্যাকে বৈধতা দিয়েছে।
চীনা লেখক ও গণতন্ত্রপন্থী কর্মী লিউ শিয়াওবো ২০১০ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান, মূলত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সংস্কার ও মানবাধিকারের দাবিতে তার দীর্ঘ সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে। যদিও সমালোচকরা বলেন, পুরস্কারে চীনা শাসন ব্যবস্থা প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে অবস্থান তার প্রতিফলন থাকার কথা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। পুরস্কার ঘোষণার পরই চীন সরকার একে সরাসরি ‘পশ্চিমা হস্তক্ষেপ’ ও ‘রাষ্ট্রবিরোধী ন্যারেটিভকে বৈধতা দেয়ার প্রচেষ্টা’ হিসেবে নাকচ করে দেয়। বেইজিং এমনকি নোবেল অনুষ্ঠানও বর্জন করে।
২০০৯ সালে বারাক ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার মাত্র নয় মাসের মাথায় তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয়। অথচ তখনো আফগানিস্তান ও ইরাকে যুদ্ধ চলমান, গুয়ানতানামো বে কারাগার খোলা। শান্তি ফেরাবেন এমন দৃশ্যমান বাস্তব কোনো পরিস্থিতিও ছিল না। অনেক সমালোচকের মতে, এ পুরস্কার ছিল মূলত এক ধরনের কৌশলগত যোগাযোগের অস্ত্র। উদ্দেশ্য ছিল উদার আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের ভাবমূর্তি জোরদার করা এবং পশ্চিমা নৈতিক কর্তৃত্বকে নতুন করে গড়ে তোলা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া আরো বেশ কয়েকজন ব্যক্তি ও সংগঠনকে ঘিরেও বিতর্ক দেখা গেছে। নোবেল কমিটি তাদের পুরস্কৃত করার পেছনে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সংগ্রামের ভূমিকা উল্লেখ করলেও সমালোচকরা দাবি করছেন এ পুরস্কারগুলোর কিছু ক্ষেত্রে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে শান্তি নোবেলকে ঘিরে প্রশংসার পাশাপাশি প্রশ্ন ও বিতর্ক—দুটিই সমানভাবে বিদ্যমান।