১লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কে হচ্ছেন নিউইয়র্কের নতুন মেয়র

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের চোখ এখন নিউইয়র্ক সিটির ওপর। বিশ্বের অন্যান্য দেশের অনেকের নজরও এখন আটকে আছে ওই নগরীতে। বিশ্বের অন্যতম এই গুরুত্বপূর্ণ নগরীর পরবর্তী মেয়র নির্বাচনের প্রাক্কালে এক উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াই দেখতে পাচ্ছে সবাই। এই প্রতিযোগিতা স্থানীয় নির্বাচনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন জয় করে ইতিহাস সৃষ্টি করা তরুণ জোহরান মামদানি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়তে নামা সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোর মধ্যে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন চূড়ান্ত পর্বে। একদিকে রয়েছে তরুণ, প্রগতিশীলতার প্রতীক এবং শহরের প্রথম মুসলিম মেয়র হওয়ার দৌড়ে থাকা জোহরান মামদানি, অন্যদিকে রয়েছে সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অ্যান্ড্রু কুওমো। এই প্রতিযোগিতা এখন আর সিটি নির্বাচনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই।

জোহরান মামদানি : পরিবর্তনের অঙ্গীকার
মাত্র ৩৩ বছর বয়সি জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটি নির্বাচনে এক নতুন তরঙ্গ সৃষ্টি করেছেন। উগান্ডায় জন্মগ্রহণকারী এই ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট নেতা বর্তমানে স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য। তিনি জুন মাসে দলের প্রাইমারি নির্বাচনে অভাবনীয় জয় পেয়েছিলেন, যা রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন ফেলেছিল। নজিরহীনভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে তীব্র ভাষায় মামদানির সমালোচনা ও বিরোধিতা করা সত্ত্বেও তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছেন। মামদানি নিজেকে এভাবে তুলে ধরেছেন যে, তিনি এমনই এক প্রার্থী যিনি প্রয়োজনে স্টেট ও ফেডারেল পাওয়ারের বিরুদ্ধে লড়তে প্রস্তুত এবং কখনও ভয়ে পিছিয়ে আসবেন না। আগামী ৪ নভেম্বর ভোটাভুটি হবে। তার আগে এখন চলছে আগাম পোস্টাল ভোট।মামদানির মূল বার্তা

সামাজিক ন্যায় ও সমতা। বিনামূল্যে সর্বজনীন শিশু প্রযত্ন বা চাইল্ড কেয়ার এবং বিনামূল্যে বাস পরিষেবার মতো সাহসী নীতির প্রস্তাব করে তিনি তরুণ ও উদার ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছেন।

বাড়ি ভাড়া স্থির রাখা : নিউইয়র্কে বাড়ি ভাড়া ভাড়াটেদের সাধ্যের মধ্যে স্থির রাখতে এবং ভবিষ্যতে খেয়ালখুশি মতো বাড়াতে না দিতে তিনি ‘রেন্ট ফ্রিজ’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। নগরীর প্রায় দশ লাখ অ্যাপার্টমেন্টের জন্য তার এ অঙ্গীকার আবাসন সমস্যায় জর্জরিত বহু পরিবারকে আকৃষ্ট করেছে।

প্রথম মুসলিম মেয়র : তার জয়ের সম্ভাবনা নিউইয়র্ক সিটির রাজনীতিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের উত্থানকে তুলে ধরছে। বিশেষ করে ৯/১১ পরবর্তী সময়ে নিউইয়র্কে মুসলমানদের এই গুরুত্ব অনেকেই অনুভব করছেন। নির্বাচনে জিতলে কেবল প্রথম মুসলিমই নয়, মামদানি হবেন নিউইয়র্ক সিটির প্রথম ইমিগ্র্যান্ট বা অভিবাসী মেয়র।

সোশ্যালিস্ট আদর্শ ও মধ্যপ্রাচ্য ইসরাইলের আগ্রাসী ভূমিকার বিরোধিতার কারণে মামদানির প্রতিপক্ষ তীব্র বিরূপ সমালোচনার তীরে তাকে বিদ্ধ করে চলেছে। তবুও সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে, আগের তুলনায় জনসমর্থন কিছুটা কমলেও মামদানি এখনও এগিয়ে রয়েছেন।

অ্যান্ড্রু কুওমো : অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাবর্তন
নিউইয়র্কের সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমো একসময় যৌন হয়রানির অভিযোগের মুখে পদত্যাগ করেছিলেন। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদের দৌড়ে ফিরে এসেছেন। অভিজ্ঞতার জোরে তিনি ভোটারদের আস্থা ফিরে পেতে সচেষ্ট। প্রচারণার অন্তিম ধাপে এসে তিনি ছুটে চলেছেন মামদানির পেছনে, তাকে অতিক্রম করার লক্ষ্য নিয়ে।

কুওমোর মূল শক্তি ও বার্তা : প্রশাসনিক দক্ষতা : তার সমর্থকরা মনে করেন, নিউইয়র্কের মতো জটিল একটি মহানগরের বিপুল অঙ্কের বাজেট ও নানামুখী সমস্যা সামলানোর জন্য তার মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিকের প্রয়োজন। তিনিই পারবেন তার অভিজ্ঞতার আলোকে দক্ষতা ও যোগ্যতার সঙ্গে নিউইয়র্ক পরিচালনা করতে।

নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা : কুওমো তার অভিজ্ঞতার ওপর জোর দিয়ে বলছেন, ‘আশা দিয়ে নয়, প্রমাণিত ট্র্যাক রেকর্ড দিয়েই কাজ হয়।’

অ্যাডামসের সমর্থন : বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামস, নির্বাচনী দৌড় থেকে সরে দাঁড়িয়ে কুওমোকে সমর্থন জানিয়েছেন। এই সমর্থন কুওমোর প্রচারে নতুন গতি এনেছে।

কুওমো, মামদানিকে ‘কল্পনাবিলাসী’ ও বিভেদ সৃষ্টিকারী হিসেবে অভিহিত করে তার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক প্রচার চালাচ্ছেন।

বর্তমান মেয়র এরিক এডামসের সরে যাওয়া : বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামস ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে মামদানির কাছে হেরে যাওয়ায় দলের মনোনয়ন পাননি। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার দৌড়ে নেমেছিলেন। তবে ফেডারেল দুর্নীতির অভিযোগ এবং তার প্রতি ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন আরও কমে যাওয়ায় শেষ মুহূর্তে তিনি নির্বাচনী প্রচার থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তবে তার নাম এখনও ব্যালটে থাকবে। এরিক অ্যাডামস সরাসরি অ্যান্ড্রু কুওমোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তার এই আকস্মিক সরে যাওয়া মামদানির জন্য সুযোগ তৈরির সম্ভাবনার কথা ভাবা হলেও দেখা যাচ্ছে, অ্যাডামসের সমর্থন মামদানির চাইতে কুওমোর পাল্লাই তুলনামূলকভাবে একটু বেশি ভারী করছে।

চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিশ্লেষণ: নির্বাচন এখন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট আদর্শের প্রতীক মামদানি এবং অভিজ্ঞ, মধ্যপন্থী স্বতন্ত্র প্রার্থী কুওমোর মধ্যে এক দ্বিমুখী লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

বামপন্থীদের ঐক্য : মামদানিকে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট অব আমেরিকা (DSA) এবং উদারপন্থী নেতারা, যেমন বার্নি স্যান্ডার্স, সমর্থন করছেন।

মধ্যপন্থীদের আশা : কুওমো আশা করছেন যে, রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়ার ভোটারদের একটি অংশ এবং নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রত্যাশী মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাটরা তার দিকে ঝুঁকবে।

রিপাবলিকান ফ্যাক্টর : রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়া নির্বাচনে থাকলেও, জনমত জরিপ অনুযায়ী তার অবস্থান তৃতীয় স্থানে। তিনি বেশি ভোট কাটলে তা কুওমোর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

নিউইয়র্কের এই নির্বাচন শুধু একজন মেয়রকে বেছে নেবে না, বরং তা বিশ্বের কাছে এই বার্তা দেবে যে নগরবাসী কি সাহসী সোশ্যালিস্ট পরিবর্তন নাকি প্রমাণিত অভিজ্ঞতার ওপর ভরসা রাখছেন। নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে এবং জনমত জরিপের ব্যবধান ক্রমশ কমতে থাকায়, শেষ মুহূর্তের প্রচারণা ও ভোটারদের উপস্থিতিই এই ঐতিহাসিক নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। – বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার তথ্য অবলম্বনে