মার্কিন তুলা ব্যবহার করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা (রেসিপ্রোকাল) শুল্কহার বিদ্যমান ২০ শতাংশ থেকে কমানোর সিদ্ধান্তও আসছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এসব সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করে আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হবে বলে টিবিএসকে নিশ্চিত করেছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। তবে এসব ছাড় পেতে বাংলাদেশকে একাধিক শর্ত পূরণ করতে হবে বলেও জানান তিনি।
বাণিজ্য সচিব বলেন, “বাংলাদেশের রেসিপ্রোকাল শুল্কহার বিদ্যমান ২০ শতাংশ থেকে কমবে, তবে কমে কতো হবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। চুক্তি স্বাক্ষরের পর দুইপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে রেট ঘোষণা করবে।”
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন শুল্কহার প্রায় ১৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
শুল্কহারে ছাড় পেতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়াতে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে ই-কমার্সে শুল্ক আরোপ না করা, মৎস্যপণ্য রপ্তানিতে ভর্তুকি প্রত্যাহার, যুক্তরাষ্ট্রের মেধাস্বত্ব (আইপি) সংক্রান্ত শর্ত মানা এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) সংস্কারে ওয়াশিংটনের প্রস্তাবকে সমর্থন দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ—বলেন বাণিজ্য সচিব।
তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে বাংলাদেশ আগামী ৬ জুন টোকিওতে জাপানের সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষর করবে।
ই-কমার্সে শুল্ক : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ডব্লিউটিও’র বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী ই-কমার্সের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা আমদানি বর্তমানে শুল্কমুক্ত রয়েছে, যার মেয়াদ আগামী মার্চে অনুষ্ঠেয় ডব্লিউটিও’র ১৪তম মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলন সমাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হবে। আগামী ২৬-২৯ মার্চ ক্যামেরুনের রাজধানী ইয়াউন্ডেতে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, ই-কমার্সের ওপর যাতে কখনও শুল্ক আরোপিত না হয়, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র ডাব্লিউটিওতে প্রস্তাব জমা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব অনুযায়ী, অনলাইনে কোন সেবা কিনে তা ডাউনলোড করলেও তার ওপর কোনো ধরনের শুল্ক আরোপ করা যাবে না। মার্চে অনুষ্ঠেয় মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভোটে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান টিবিএসকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ই-কমার্স শুল্কের ওপর স্থায়ী স্থগিতাদেশ (মোরাটোরিয়াম) চায়। ডব্লিউটিওতে প্রায় একই ধরনের প্রস্তাব করেছে আফ্রিকা, ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৭৯টি দেশ নিয়ে গঠিত ওএসিপিএস গ্রুপ।
বর্তমানে বাংলাদেশ ডাব্লিউটিও’র বিধান অনুযায়ী, কিছু ই-কমার্স পণ্য ও সেবা আমদানি শুল্কমুক্ত রেখেছে, আবার কিছু পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শর্তানুযায়ী ই-কমার্স ট্যারিফ ফ্রি করা হলে তাতে এখাত থেকে বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ কমে যাবে। “তবে ই-কমার্স থেকে পণ্য ও সেবা ক্রয়ে বছরে একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কত ডলার ব্যয় করতে পারবে, এসব ব্যাপারে বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে,” বলেও জানান তিনি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ই-কমার্স সংক্রান্ত অন্য সব আইন ও বিধানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এই শর্তের কোনো প্রভাব থাকবে না। “শুধু ই-কমার্সের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা আমদানিতে ট্যারিফ আরোপ করা যাবে না। এতে রাজস্ব আহরণ কমে যাওয়া ছাড়া আর কোন কনসার্ন (উদ্বেগ) নেই।”
মেধাস্বত্ব অধিকার : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, মার্কিন তুলা দিয়ে তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে হলে মেধাস্বত্ব অধিকার (আইপিআর) বিষয়ে বাংলাদেশকে বড় ধরনের ছাড় দিতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে টিবিএসকে বলেন, “বাংলাদেশ যে প্যাটেন্ট আইন করেছে, সেখানে বেশকিছু বিষয়ে ফ্লেক্সিবিলিটি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই শর্তের কারণে এটি সংশোধন করে আরও কঠোর করতে হবে।”
যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি : ডব্লিউটিও’র বিধান অনুযায়ী, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার অধিকারী। তবে যুক্তরাষ্ট্র তৈরি পোশাক বাদে অপ্রচলিত কিছু পণ্যে জিএসপি সুবিধা দিলেও— ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর তা স্থগিত করে। তারপর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নের শর্তে জিএসপি সুবিধা পুনর্বহালের কথা থাকলেও—বাংলাদেশ সে শর্তগুলো পূরণ করতে পারেনি।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) মোহাম্মদ হাতেম টিবিএসকে বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলায় তৈরি আরএমজিকে (তৈরি পোশাক) দেশটি শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এটি হলে তা উভয়পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের তুলা আমদানি বাড়ার পাশাপাশি দেশটিতে বাংলাদেশের আরএমজি পণ্যের রপ্তানিও বাড়বে।”
পাল্টা শুল্ক : গত বছরের জুলাইয়ে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশসহ প্রায় ৯০টি দেশের ওপর অতিরিক্ত ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেয়।
এরপর ১০০টি মার্কিন পণ্যকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ানোসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একাধিক দফা আলোচনার পর ওয়াশিংটন বাংলাদেশের ওপর পাল্টা শুল্কহার কমিয়ে ২০ শতাংশ নির্ধারণ করে, যা ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়।
ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন, ভুট্টা, তুলাসহ বিভিন্ন কৃষি পণ্য, বোয়িং কোম্পানির ২৫টি উড়োজাহাজ, এলএনজিসহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবা আমদানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তা কার্যকর শুরু করে বাংলাদেশ।
পরবর্তীতে এই শুল্কহার আরও কমানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলায় উৎপাদিত পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায়ে আলোচনা অব্যাহত রাখে ঢাকা, যা চূড়ান্ত হয়ে ৯ ফেব্রুয়ারি চুক্তিতে পরিণত হবে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার এখনো যুক্তরাষ্ট্রই। গত অর্থবছর বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিটিতে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮.৬৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ওভেন পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৪.৯৫ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট ওভেন রপ্তানির ২৭ দশমিক ২১ শতাংশ এবং নিটওয়্যার রপ্তানির পরিমাণ ২.৬০ বিলিয়ন ডলার, যা মোট নিটওয়্যার রপ্তানির ১২.২৭ শতাংশ। এ ছাড়া, হোম টেক্সটাইল রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৫০ মিলিয়ন ডলার ও ক্যাপ রপ্তানি হয়েছে ২৫৯ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলারের তুলা আমদানি করেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৭৮ মিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট তুলা আমদানির প্রায় ১০ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।