২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কমিউনিটি

নিউ ইয়র্কের কুইন্স সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে জন্মদিনে কাজী জহিরুল ইসলামের একক কবিতা পাঠ

নিউ ইয়র্কের কুইন্স সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে জন্মদিনে কাজী জহিরুল ইসলামের একক কবিতা পাঠ

গত ১৪ ফেব্রুয়ারী শনিবার কুইন্স সেন্ট্রাল পাবলিক লাইব্রেরির মেইন অডিটোরিয়ামে ছিল কবি কাজী জহিরুল ইসলামের একক কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান “মহাকালের ঘড়ি”। শুরুতে কবির জীবনী পাঠ করে শোনান স্বনামধন্য উপস্থাপিকা শামীমা শাম্মী। এরপর কবি টানা এক ঘন্টা নিজের লেখা বিভিন্ন আঙ্গিকের কবিতা পড়ে শোনান। উপস্থিত দর্শক শ্রোতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো বুঁদ হয়ে শোনেন কবিতার অমিয় উচ্চারণ। কবিকন্ঠে কবিতা পাঠ শোনার এই বিরল সুযোগ পেয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করেন নিউইয়র্কে বসবাসরত বোদ্ধামহল। প্রকৌশলী সৈয়দ ফজলুর রহমান একটি কবিতার কথা উল্লেখ করে এর জন্মবৃত্তান্ত জানতে চান। তিনি বলেন, এই কবিতায় যে গভীর আধ্যাত্মিক বোধ প্রোথিত আছে তা চেষ্টা করে কারো পক্ষে লেখা সম্ভব বলে আমি মনে করি না। কবি স্মিত হেসে বলেন, আমি তো অনেক আগেই জানিয়েছে, “কবিতাই আমাকে লিখে রাখে কালের খাতায়”। আমি তো কবিতা লিখি না। রোদের দুপুর গ্রন্থের “এক মহাশব্দতরঙ্গ” কবিতাটি সম্পর্কে কবি বলেন, একদিন মাঝরাতে কোনো এক অপার্থিব শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়, তখন রাত তিনটা বাজে। জেগে অনেকক্ষণ ধরে শব্দটির উৎস খুঁজি। শেষমেশ মনে হলো, বাইরে থেকে নয়, এই ঘর থেকেও নয়, এই শব্দনিনাদ বেজে উঠছে আমারই ভেতরে কোথাও, শব্দটি ওখান থেকেই আসছে। এই বোধ থেকেই লিখি “এক মহাশব্দতরঙ্গ”।

” বৃষ্টি আমার বোন”, “পুরুষের ঘর”, “ঢাকার কলঙ্ক”, “বৃহৎ শূন্য”, ” বাঘ”, “মহাকালের ঘড়ি” প্রভৃতি কবিতা নিয়েও দর্শকরা উচ্ছাস প্রকাশ করেন। ছন্দ ও প্রকরণ শুদ্ধতার কারণে কাজী জহিরুল ইসলামের কবিতা যে কোনো উচ্চতাকে স্পর্শ করে অনায়াসেই। উপস্থিত দর্শদের মধ্য থেকে বাচিক শিল্পী এম এ সাদিক কবিকে জানান “বাঘ” এবং “পুরুষের ঘর” কবিতা দুটি তিনি ভালো করে আয়ত্তে এনে উপস্থাপন করবেন। বাচিক শিল্পী মোহাম্মদ শানুকবির সদ্য রচিত “কষ্টটা ড্রয়ারেই আছে” কবিতাটি তৈরি করে আবৃত্তি করার আগ্রহের কথা কবিকে জানান।

দেশ ও পৃথিবী নিয়ে কবি তার নিজস্ব দর্শন ও চিন্তার কথাও জানান। তিনি সবাইকে বলেন, মানুষের কাছে পৌঁছাবার পরিসর আপনার যত ছোটোই হোক সেটাকে অবহেলা করবেন না, নিজের কথাটা অকপটে, নির্ভয়ে বলবেন। সত্যের উচ্চারণ যত অপ্রিয়ই হোক আমাদের সেটা বলতে হবে।


সমকালীন বাংলা সাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি, কথাশিল্পী এবং পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল কাজী জহিরুল ইসলাম। তিনি ৯৯টি গ্রন্থের প্রণেতা এবং বাংলা সাহিত্যে ক্রিয়াপদহীন কবিতার প্রবর্তক।

কবিতায় বিশ্বশান্তি ও আধ্যাত্মিক জাগরণের জন্য ২০২৩ সালে তিনি শ্রী চিন্ময় সেন্টার, নিউইয়র্ক কর্তৃক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি “পিস রান টর্চ বিয়ারার অ্যাওয়ার্ড” লাভ করেন। এ-ছাড়া বাংলাদেশ থেকে কবি জসীম উদদীন পুরস্কার, নিউইয়র্ক থেকে ড্রিম ফাউন্ডেশন সম্মাননা, গ্রেস ফাউন্ডেশন পুরস্কার, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন সম্মাননা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই সম্মাননা, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে জেসমিন খান এওয়ার্ড, ভারত থেকে রসমতি সম্মাননা, ডালাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারসহ দেশে বিদেশে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

কবি আল মাহমুদ তার কবিতার বিষয়ে তিনটি প্রবন্ধ লিখেছেন, তাকে উদ্দেশ্য করে কবি আল মাহমুদ লেখেন, ‘বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি-প্রতিভাকে আমি প্রবাসে দেখতে পাচ্ছি’। তিনি কাজী জহিরুল ইসলামের চিত্রকল্প নির্মাণ ও ছন্দ-শৈলির প্রশংসা করেন। কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ লেখেন, ‘জিজীবিষা এবং ইতিবাচকতা, শেষ পর্যন্ত কাজী জহিরুল ইসলাম সপ্রেম দৃষ্টিতেই তাকিয়েছেন জীবন ও পৃথিবীর দিকে”। ৫০ তম জন্মদিনে আয়োজিত “সুবর্ণ অভিবাদন” অনুষ্ঠানে কাজী জহিরুল ইসলামের জীবন ও কর্মের ওপর চার শতাধিক পৃষ্ঠার এক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। “অর্ধশতকের উপাখ্যান” শিরোনামের ওই গ্রন্থটি সম্পাদনা করেন কবি ও সাংবাদিক ড. মাহবুব হাসান। কাজী জহিরুল ইসলামের কবিতা নিয়ে বহু তরুণ, প্রবীন গবেষণা করছেন, সোহেল মাহমুদ রচিত “কাজী জহিরুল ইসলামের নির্বাচিত ৩০ কবিতা ও বিশ্লেষণ” এবং আবু তাহের সরফরাজ রচিত “কাজী জহিরুল ইসলামের কবিতা – শৈল্পিক সৌন্দর্য ও কৃৎকৌশল” এই গত অক্টোবরেই বাজারে এসেছে।

তার কবিতা উড়িয়া, সার্বিয়ান, আলবেনিয়ান, রুশ, চায়নিজ, ইংরেজিসহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। অর্ধশতাধিক দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তার ঝুলিতে। পেশাগতভাবে তিনি জাতিসংঘ সদর দফতরের একজন আন্তর্জাতিক কর্মকর্তা।
“শুদ্ধ শিল্পের নিবিড় চর্চা” এই স্লোগানকে সামনে রেখে এক যুগ আগে তিনি গড়ে তোলেন শিল্প-সাহিত্যের সংগঠন ঊনবাঙাল, যে সংগঠনটি আজ নিউইয়র্কের একটি অন্যতম সাংস্কৃতিক প্লাটফর্ম।

এবারের অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ উপলক্ষে কাজী জহিরুল ইসলামের শততম গ্রন্থ “রোদেলা দুপুর” বের হচ্ছে। এই গ্রন্থে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত ১০০টি কবিতা স্থান পেয়েছে। এ-ছাড়া গ্রন্থের শুরুতে তিনি একটি দীর্ঘ ভূমিকা-প্রবন্ধ লিখেছেন। সেখানে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে কবিতা রচনার আদ্যোপান্ত কৌশল বর্ণনা করেছেন।

তিনি জালালুদ্দিন রুমির দুটি কবিতার বই বাংলায় অনুবাদ করেছেন, এ ছাড়া মার্কিন কবি এজরা পাউন্ড এবং সমকালীন পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত আমেরিকান কবি রে আর্মান্ট্রাউটের কবিতা অনুবাদ করে দুটি প্রন্থ প্রকাশ করেছেন।
তার রচিত ক্রিয়াপদহীন কবিতার বই “ক্রিয়াপদহীন ক্রিয়াকলাপ” উড়িয়া ভাষায় অনূদিত হয়ে উড়িষ্যার ভুবনেশ্বর থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইটি অনুবাদ করেছেন উড়িষ্যার কবি অজিত পাত্র।

সাহিত্যের মধ্য দিয়ে মানবজাতির কল্যাণ ও উৎকর্ষ সাধন কাজী জহিরুল ইসলামের মূল ব্রত। তিনি বলেন, আমাদের সামাজিক কাঠামোটা ভুলভাবে সাজানো হয়েছে, এর ফলে সকলেই সততার বদলে বিত্তের মালিক হতে চায়। আমরা যদি বিত্তবানকে নয়, সৎ মানুষকে সম্মান করি, বিত্তবানের ওপরে তাকে স্থান দিই, তাহলে মানুষ বিত্তের পেছনে না ছুটে নৈতিকতার পেছনে ছুটবে। সমাজের কাঠামোটা রিসেট করতে হবে।

সেক্যুলারিজম নিয়েও তার নিজস্ব চিন্তা সমাজকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। তিনি বলেন, ধর্মকে প্রত্যাখ্যান করে নয় বরং সর্ব ধর্মকে আলিঙ্গনের মধ্য দিয়েই সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটিই সেক্যুলারিজমের নতুন সংজ্ঞা।
৫৯ তম জন্মদিন উপলক্ষে তিনি একটি নতুন পৃথিবী বিনির্মাণের আহ্বান জানিয়েছেন, যে পৃথিবীর মানুষ বিত্তবানের চেয়ে নৈতিক মানুষকে বেশি মূল্য দেবে, অধিক সম্মানের চোখে দেখবে। তিনি মনে করেন পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার এটিই প্রধানতম উপায়।

একই দিন সন্ধ্যায় কবির বন্ধু, শুভানুধ্যায়ীরা একটি স্থানীয় রেস্টুরেন্টে কবির জন্মদিনের আয়োজন করেন। সেখানে উপস্থিত কবির পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি কবির সঙ্গে তাদের স্মৃতিচারণ করেন এবং কবিকে নিবেদিত কবিতা পাঠ ও গান পরিবেশন করেন। বিশিষ্ট শিল্পী মরিয়ম মারিয়া, বুলা আফরোজ, মোহাম্মদ শানু গান গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেন। শিল্পী মিতা হোসেন, কবি সুমন শামসুদ্দিন, আবৃত্তি শিল্পী আহসান হাবিব, কবি রেণু রোজা, মুন্না চৌধুরী, শেলী জামান খান, সৈয়দ ফজলুর রহমান, কানাডা থেকে আগত তামান্না নেসা, মোফাসসেল টোকন, আফরা ইবনাত এবং আইদা ইবনাত তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন। মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, রফিকুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, চমক ইসলাম, শামীমা শাম্মী কবিকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন।

কবি তার বক্তব্যে সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং বলেন, আজ ভালোবাসা দিবস, এই দিনে সকলের জন্য এই শুভকামনা করি যেন আমরা সবাই জীবনকে আনন্দময় করে তুলতে পারি, সেই আনন্দটা হবে এমন, অন্যের আনন্দ দেখে যেন আমাদের মনে একটা আনন্দের ঢেউ বা শিহরণ তৈরি হয়। তিনি আরও বলেন, আসুন আমরা স্পট লাইটের নিচে দাঁড়ানোর প্রতিযোগিতা না করে নিজেকে এমনভাবে তৈরি করি যাতে আমরা যেখানে দাঁড়াই সেখানেই স্পটলাইট জ্বলে ওঠে। প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুসারে