১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ধর্মভিত্তিক দলও কেন মৌলিক অধিকারের কথা বলছে

ঘটনা বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলনের ফসল হলেও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে এক দল জপা শুরু করল– নতুন কিছুই ঘটেনি; ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র। যার অর্থ দাঁড়ায়, আগে যেখানে একটি পাকিস্তান ছিল, এখন দুই ভিন্ন নামে সেখানে আমরা পেয়ে গেলাম দুটি পাকিস্তান– একটি পশ্চিমে অপরটি পূর্বে। আরও পরে এলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, যেটি ওই লাহোর প্রস্তাবিদের বক্তব্যেরই নতুন প্রকাশ বৈ নয়; পোশাকে নতুন, শরীরে অভিন্ন। রণকৌশল বদলাল, কিন্তু যুদ্ধটা রইলই। এরা এখনও আছেন, এবং জনসাধারণের হতাশা ও বিদেশি মুরুব্বিদের অনুগ্রহকে পুঁজি করে বাংলাদেশে তথাকথিত ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার খোয়াব দেখছেন।

পাকিস্তানিরা নিজেরা বুর্জোয়া হয়েছে কিন্তু জনগণকে পশ্চাৎপদ রাখতে চেয়েছে, সেই এককালের ইংরেজদের মতোই। জনগণকে পশ্চাৎপদ রাখলে শোষণের ভারি সুবিধা। সংস্কৃতির গুরুত্ব নেতিবাচক দিক থেকে হলেও বুর্জোয়ারা ঠিকই বুঝেছেন, বামপন্থিরা ততটা বোঝেননি, যে জন্য জনগণের সাংস্কৃতিক মানকে উন্নত করবার জন্য তারা ব্যাপক প্রচেষ্টা নেননি; অথচ অত্যন্ত নির্মম সত্য এই যে, সাংস্কৃতিকভাবে পশ্চাৎপদ রেখে জনগণকে বিপ্লবী করা অসম্ভব। শুধু স্লোগান দিলে বা লোক খুন করলেই বিপ্লবী হওয়া যায় না। বিপ্লবী হতে হলে সত্যিকার বিপ্লবী চেতনা চাই। ধর্ম ব্যবসায়ীরা আজও যে ধর্মের নামে উন্মাদনা সৃষ্টি করবে বলে আশা রাখে এবং ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেয়, তার বড় কারণ সাংস্কৃতিক সামন্তবাদের বিদ্যমানতা।

একাত্তরের পরেও বাংলাদেশে কয়েকটি মুসলিম লীগ জীবন ও মৃত্যুর বিভিন্ন স্তরে অবস্থান করছে। তার চেয়েও বড় কথা, মুসলিম লীগপন্থিরা আছেন, তারা রাজনীতির এ-দলে আছেন, ও-দলে আছেন; আগের মতোই তারা ধর্মীয় জাতীয়তায় বিশ্বাসী, তেমনি আমলাতান্ত্রিক, তেমনি সামন্ত সংস্কৃতির প্রতি দুর্বল। খন্দকার মোশতাক, মিজানুর রহমান চৌধুরী ও শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনরা মুসলিম লীগারদের চেয়ে কম লীগার ছিলেন না, যদিও তারা সবাই জীবনের দীর্ঘ সময় ছিলেন আওয়ামী লীগে।

একাত্তরের পর বাংলাদেশের পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষ হবার কথা ছিল। হয়নি। হয়নি কেন? প্রধান দায়িত্ব নেতৃত্বের। আওয়ামী লীগই নেতৃত্বে ছিল, যুদ্ধের সময়ে ছিল, যুদ্ধের পরে আরও বেশি করে ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগও তো মুসলিম লীগেরই উত্তরসূরি; বিদ্রোহী হওয়া সত্ত্বেও। পাকিস্তানই ভেঙে যাওয়ায় জাতিগত প্রশ্নের এক ধরনের মীমাংসা হয়ে গেছে মনে করা হলো, কিন্তু শ্রেণিগত সমস্যা তো রইল। রইল না কেবল, সেই সমস্যাই প্রধান হয়ে দাঁড়াল। এই পরিস্থিতিতে জনসাধারণকে অবদমিত রাখার জন্য অস্ত্র হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করা যেত। কিন্তু হাজার হোক অস্ত্রটি নতুন ও অনিশ্চিত। তাই সেই যে পুরাতন অস্ত্র, ধর্মের অস্ত্রের প্রতি একটি গোপন ভালোবাসা না থাকার কথা নয়। স্মরণ করা দরকার, ধর্মনিরপেক্ষতা কোনো নেতিবাচক মতবাদ নয়। যাকে ধর্মনিরপেক্ষতা বলা হয় আসলে তা ইতিবাচক ইহজাগতিকতা। দার্শনিক এবং আরও নির্দিষ্ট অর্থে বস্তুবাদিতা। সেই বস্তুবাদিতা আওয়ামী লীগের পক্ষে লালন করা কঠিন ছিল। কেননা, আওয়ামী লীগ পেটি বুর্জোয়াদের প্রতিষ্ঠান; সাংস্কৃতিক সামন্তবাদ সেখানে অবাঞ্ছিত নয়। ধর্মীয় পিছুটান সম্পূর্ণ বাস্তবিক; আর ছিল পুরাতন অস্ত্রের প্রতি গোপন মমত্ব। শেখ মুজিব তাই ধর্মনিরপেক্ষ রইলেন ঠিকই, কিন্তু ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গেলেন সমান উৎসাহে; রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করাকেও অসংগত মনে করা হলো না। এবং আওয়াজ তোলা হলো– ধর্মনিরপেক্ষতা অর্থ ধর্মহীনতা নয়। অর্থাৎ কিনা ধর্মনিরপেক্ষতার জন্যই আরও বেশি ধর্মচর্চা আবশ্যক, মুসলমান আরও বেশি মুসলমান হবে, হিন্দু আরও বেশি হিন্দু এবং সবাই মিলে আমরা ধর্মনিরপেক্ষ হবো।

শেখ মুজিবের পরের সরকারগুলোর প্রতিটি, পরেরটি আগেরটির চেয়ে বেশি করে ধর্মের কথা বলেছে। এদের নেতারা নিজেরা তেমন একটা ধার্মিক ছিলেন না, কিন্তু ধর্মকে ঠিকই ব্যবহার করেছেন রাজনৈতিক প্রয়োজনে। তাঁর নেতা শেখ মুজিবের হত্যার পর ক্ষমতা দখল করে মন্ত্রিসভার প্রথম সভাতেই খন্দকার মোশতাক নিজের মাথার টুপি দেখিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, এটিই হবে জাতীয় টুপি। অমন নাটকীয়ভাবে না করলেও অন্যদের কাজ এই একই রীতির। এখন বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী পর্যন্ত নিজেকে জনপ্রিয় করে তুলছে। জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেও পাকিস্তানে রাজনীতি করেছিল; এবারও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়ভাবে বিরোধিতা করার পরও ওই একই কায়দায় ধর্মকে পুঁজি করে নেমেছে রাজনীতিতে। কিন্তু একটু তফাত আছে। জামায়াতে ইসলামী এখন গণতন্ত্রের কথা বলছে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জনমনে যে বিরূপতা ক্রমবর্ধমান, জামায়াতে ইসলামী ভাবছে তার সুযোগ নেবে। ভাত-কাপড়ের কথাও বলছে, প্রয়োজন দেখে।

তবে এমনকি জামায়াতে ইসলামীও যে বলছে এখন গণতন্ত্রের ও মৌলিক অধিকারের কথা, তাতে বোঝা যায় আসলে কারণ নেই হতাশ হবার। অতীতেও ধর্মের নামে জনগণকে বিভ্রান্ত করবার চেষ্টা পূর্ণোদ্যমে হয়েছে; কিন্তু চেষ্টা সফল হয়নি। হলে ১৯৫৪-এর নির্বাচনে মুসলিম লীগ অমন ডোবা ডুবত না। একই ঘটনা ঘটল ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে। ধর্মওয়ালারা দেখল মানুষ তাদের পক্ষে নেই; মানুষ ছুটেছে গণতন্ত্রের পক্ষে, যে জন্য জামায়াতে ইসলামী এখন গণতন্ত্রের কথা বলে। বিশ্বাস করে বলে নয়; না বললে কেউ তাদের কথা নেবে না তাই বলে। হ্যাঁ, ১৯৪৬-এর নির্বাচনে পাকিস্তানের পক্ষেই ভোট দিয়েছিল মানুষ। কিন্তু সেই পাকিস্তানে হুর-পরী-সুশোভিত অলীক ইসলামী রাষ্ট্র গড়ে উঠবে বলে মৌতাতি ধারণা থেকে নয়, সেখানে ভাত-কাপড় পাবার আশা ছিল বলেই। আমরা জানি যে, সেদিনকার নির্বাচনী প্রচারের সামনে আকরম খান-নাজিমুদ্দিনরা ছিলেন না। ছিলেন সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিমরা। জনগণ রাজনীতিতে ধর্ম আনতে চায় না। মোল্লাতন্ত্র ও রাষ্ট্রযন্ত্র যে এক নয়– এ তারা জানে ঠিকই, এমনকি একাত্তরেও জামায়াতে ইসলামী শক্তিশালী হয়েছে জনসমর্থনে নয়, পাকিস্তানি দুর্বৃত্তদের ছত্রছায়ায়।

কিন্তু জনগণের দুর্ভাগ্য এই যে, তারা খোঁজে, কিন্তু নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন খুঁজে পায় না। সংগঠন আছে বুর্জোয়াদের। নিজেদের স্বার্থে তারা ধর্মসহ নানা অস্ত্র ব্যবহার করে। জনগণের জন্য অভাব যা, তা হলো বিকল্প রাজনীতির। বাম রাজনীতির ধারা প্রবল হতে পারেনি, এবং পারে না বলেই বুর্জোয়া রাজনীতির দুষ্ট প্রভাব থেকে মুক্তি পাইনি আমরা আজও। গণতান্ত্রিক আন্দোলনই হচ্ছে যথার্থ ধর্মনিরপেক্ষতার আন্দোলন, এবং যথার্থ গণতান্ত্রিক আন্দোলন করতে পারেন কেবল সমাজতন্ত্রীরাই। কেননা, যে-সমাজে ধনবৈষম্য আছে সেখানে মানুষের ভোট থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্র থাকে না। গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনকে যে জন্য হতে হয় সমাজবিপ্লবী আন্দোলন। গণতন্ত্র ভোটে নেই, আছে মৌলিক অধিকারে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দৈনিক সমকাল এর সৌজন্যে