১লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

জ্ঞানের জগতটা আসলে অনেক বড়

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষায় ফল বিপর্যয় দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো নাম্বার পাওয়ার পরেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় বারবার কেন ফল বিপর্যয় হচ্ছে? ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের জন্য এই পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। ভর্তি পরীক্ষায় পাশের হার শতকরা ৫ থেকে ৮ হয় কীভাবে? এত পড়াশোনা, কোচিং, পড়ার চাপ, অভিভাবকদের সতর্কতা, সন্তানের শিক্ষার পেছনে মোটা টাকা ব্যয় করার পরেও কেন এই দুর্দশা?

এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে হবে ইতিহাসের দিকে। ১৯৪৯ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হবার পর আমেরিকা ভ্রমণে যান ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান জানতে চান নতুন দেশের স্বপ্ন, সমস্যা, আশা ইত্যাদি সম্পর্কে। এরপর হ্যারি এস ট্রুম্যান নেহেরুর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘নতুন দেশে তোমরা আমাদের কাছে কী চাও?’

জবাবে নেহেরু বলেছিলেন, ‘আমরা চাই যে তোমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সহযোগিতা কর, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ কর।’ নেহেরু আরও বলেছিলেন, ‘তোমরা আমাদের জন্য এমআইটির (ম্যাসাচুসেস্টস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি) মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে দাও।’ এর ফলে দ্রুতই আমেরিকার সহযোগিতায় ভারতে গড়ে ওঠে বিশাল পরিসরের ভারতের আইআইটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো।

একইভাবে পাকিস্তানের নেতৃত্ব আমেরিকা সফরে গেলে পাকিস্তানিরা বলেছিল, ‘আমরা অস্ত্র ও সামরিক সাহায্য চাই। আমাদের এতগুলো যুদ্ধবিমান, এতগুলো ট্যাংক ও এতগুলো যুদ্ধজাহাজ দরকার। আমাদের আছে বিশাল সেনাবাহিনী, তারা তোমাদের হয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় কমিউনিজম ঠেকাবে, তাদের বেতনের টাকা নাই। তাদের জন্য টাকা দাও।’

আমেরিকা পাকিস্তানকেও তারা যা চেয়েছিল তাই দেয়। কোরিয়া যুদ্ধফেরত প্রচুর ব্যবহৃত যুদ্ধবিমান, ট্যাংক ও যুদ্ধ জাহাজ পাকিস্তান পায়। সাথে পায় সাড়ে পাঁচ ডিভিশন সৈন্যের বেতন ও খরচ। এসব দিয়েই পাকিস্তান চলেছে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত। (সূত্র: আমাদের উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যর্থতা: গবেষক সিরাজুল হোসেন)

পরবর্তীকালে আমরা দেখছি, বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানে সিইও, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভারতীয় স্টুডেন্ট, গবেষক, একাডেমিশিয়ানরা স্থান করে নিয়েছেন। তবে তারা যে সবাই মেধাবি, তা শতভাগ বলা যাবে না। তবে এটি প্রমাণ করে যে, ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মেধা তৈরি করেছে। শুধু রাজনীতির ফাঁদে আটকে রাখছে না।

আধুনিক বিশ্বে শক্তিতে সেরা হওয়া বড় কথা নয়, সেরা হতে হয় বুদ্ধিতে। শুধু ডিগ্রি দিয়েও মানুষ সমৃদ্ধশালী হয় না। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, অন্যভাবে বলা যায় পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই পরিণত হয়েছে ডিগ্রি তৈরির কারখানায়। একটা ডিগ্রি পেলেই আমরা খুশি।

আমাদের উচ্চশিক্ষিত সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, তাদের শিক্ষকগণ, একাডেমিকস, তথা ইন্টেলেকচুয়ালদের একটা বড় অংশ কখনও এই ডিগ্রি পাওয়ার পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ করেন নাই। তাই প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সবখানেই ফাঁক থেকে গেছে। শুধু পাশ-ফেল, প্রথম-দ্বিতীয়, স্টার বা জিপিএ পাওয়ার মধ্যেই রয়ে গেছে আমাদের অর্জন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে ও চাকরি ক্ষেত্রেও নেতিবাচক ফলাফল দেখতে পারছি।

এসএসসি ও এইচএসসিতে যাদের পাসের হার অসম্ভব ভালো ছিল, তাদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাস করতে পারছে না। দুটি ফলাফলের মধ্যে এতটা ফারাক কেন? এজন্য শুধু শিক্ষার্থীরা একা দায়ী নয়— দায়ী স্কুল-কলেজের শিক্ষাব্যবস্থা, ভর্তি পরীক্ষার সিস্টেম, প্রশ্নোত্তরের দুর্বলতা, ছাত্র-ছাত্রীদের বোঝার সক্ষমতার অভাব, নোট বই, কোচিং, পড়াশোনার পরিবেশ এবং অভিভাবকদের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত চাপ।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা শুরু থেকেই রাষ্ট্রের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রের মতো শিক্ষাখাতেও পাকিস্তানি আদর্শ বহন করছি। যে জন্য দেশের বাজেটে শিক্ষার জন্য বরাদ্দ খুব কম। বরাদ্দ কম বলে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা ও দক্ষতা কম, গবেষণা কম, মেধাবী কম, ভালো শিক্ষক কম এবং পরিশেষে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশ্ব র‌্যাংকিং এ আমাদের অবস্থান একেবারে নীচে।

শিক্ষা এখন জিপিএ-নির্দেশক একটি সার্টিফিকেট। কাজেই জিপিএ নিশ্চিত করার জন্য অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা ছুটে বেড়াচ্ছে কোচিং সেন্টারের দ্বারে দ্বারে। এই কোচিং এর উদ্দেশ্য, যতটা না সাবজেক্ট বুঝতে পারা, তার চাইতেও বেশি পড়াকে ভাতের গোলা বানিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মুখে তুলে দেওয়া। এর ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে আমাদের সন্তানরা।

এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় আসন সংখ্যা কম, সেই আসন সংখ্যার বিপরীতে কৃতকার্য ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা আরো কম। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন সংখ্যা খালি থাকছে। এক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের খুঁজে দেখা উচিত ফাঁকটা কোথায়? কেন এত জিপিএ নম্বর পেয়েও শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা অবধি যেতে পারছে না। স্কুল-কলেজের পড়াশোনার মান কি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে?

ভর্তি পরীক্ষাসহ অন্যান্য পরীক্ষার ফল আরো খারাপ হতে পারে আগামী বছরগুলোতে। বিভিন্ন কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনে নামছে, সড়ক অবরোধ, রাত-বিরাতে মিটিং-মিছিল করেই দিন কাটছে। এতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হতে বাধ্য। পড়াশোনার পরিবেশ একবার বিঘ্নিত হওয়া মানে, বারবার নানাভাবে প্রকৃত শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আমার বাবা বলতেন, ‘টেক্সট বই পুরোটা পড়। ক্লাসের বইয়ের অধ্যায় বা টেক্সট সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকলে, যেখান থেকেই প্রশ্ন আসুক, তুমি কোথাও আটকাবে না। রেফারেন্স বই কিনে নিজেরা প্রশ্নের উত্তর তৈরি করো। পেপার পড়, বই পড়, রেজাল্ট ভালো হতে বাধ্য। নিজেকে পড়তে হবে, তোমাদের টিচার নোট তৈরি করে দিবে, আর তুমি তা গলাধঃকরণ করবে, তা হবে না।’

পাঠ্যবই ভালো ও গোছালোভাবে না পড়া এবং গভীরভাবে আত্মস্থ না করাই বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। গণমাধ্যমে তিনি বলেছেন, ‘শিক্ষার্থীদের গাইড নির্ভরতা কমাতে হবে। মুখস্থ না করে শুরু থেকে মূল বই ভালোভাবে আয়ত্ত করতে হবে। বুঝে পড়তে পারলে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় খুব বেশী জটিলতায় পড়তে হবে না।’

শিক্ষা বিষয়ক বিশেষজ্ঞরাও এখন একই কথা বলছেন। তারা মনে করেন, শিক্ষার্থীরা সাধারণত বোর্ড পরীক্ষার জন্য গাইড বই বা সাজেশনের ওপর নির্ভর করে পড়াশোনা করে; কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন হয় মূল পাঠ্যবইয়ের ভেতর থেকে। কাজেই টেক্সট বই পুরোটা পড়তে হবে।

বইয়ের যেকোনো অধ্যায় থেকে যেকোনো ধরনের প্রশ্ন হতে পারে, নোটবই থেকে নয়। নিজের মতো করে সেগুলোর উত্তর দিতে হবে। যে কারণে দেশের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যখন স্কলারশিপের জন্য আবেদন করা হয়, তখন সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখে আবেদনকারীদের মধ্যে কে কত ভালো লিখতে পারছে, কতটা শক্তভাবে ও যুক্তি দিয়ে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রতিটা বিষয়ে আলাদাভাবে পাস করতে হয়। কোনো শিক্ষার্থী মোট নম্বরে ভালো করলেও যদি একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে, যেমন ইংরেজি বা বাংলায় নূন্যতম নম্বর না পায়, তবে সে সামগ্রিকভাবে ফেল বলে গণ্য হয়। এছাড়া ভুল উত্তরের জন্য নেগেটিভ মার্কিং হয়। এমসিকিউ অংশে প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য ০.২৫ নম্বর কাটা যায়। এভাবে অনেকেই নম্বর হারায়।

ছাত্র-ছাত্রীর ওপর চাপ কমানোর জন্য যে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস করা হয়েছে, তাতে শিক্ষার্থীদের মূল ভিত্তি দুর্বল থেকে যাচ্ছে। যে ক্লাসে, একজন শিক্ষার্থীর যতটা জানা উচিৎ, তা জানছে না। এমসিকিউ-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করায় লিখিত পরীক্ষায় অদক্ষতা তৈরি হয়। এদিকে ভর্তি পরীক্ষায় শুধু এমসিকিউ নয়, লিখিত অংশেও ভালো নম্বর পেতে হয়। অনেক শিক্ষার্থী লিখিত উত্তর উপস্থাপনায় দুর্বল, পর্যাপ্ত নম্বর পায় না।

প্রশ্ন উঠছে জিপিএ ৫-যারা পাচ্ছে, তারা কি সবাই জিপিএ ৫ পাওয়ার মতো যোগ্য? জিপিএ ৫-এর মানের সাথে জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের মানের অসঙ্গতি চোখে পড়ছে উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে। আর তাই এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পাওয়ার হার বাড়লেও, উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতার ঘাটতি থাকায় ভর্তি পরীক্ষায় অনেকেই সফল হতে পারছে না।

দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষায় যে ধস নেমেছে তা বেশ কয়েক বছর ধরেই লক্ষ্য করছি। আর এটি হয়েছে সরকারের নীতির কারণেই। কী পরিমাণ ধসে গেছে এর প্রমাণ ভর্তি পরীক্ষার এই ফল। এই দায় এককভাবে কারো নয়, আবার এ দায় সবারই।

শিক্ষার মানের কতটুকু উন্নতি ঘটলো, এটা বোঝাতে আমাদের দেশে সাধারণভাবে পাসের হারকে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু পাসের হার যে শিক্ষার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না, এর প্রমাণ ভর্তি পরীক্ষায় এই ফল বিপর্যয়। শিক্ষার্থীকে বুঝতে হবে পরীক্ষায় পাশের পড়া একরকম, আর কোথাও নির্বাচিত হওয়ার জন্য পড়া আরেকরকম।

কঠিন কঠিন নানা তত্ত্ব জানলেই হবে না, একে যথাযথ জায়গায়, যথাভাবে উপস্থাপন করতে হবে। অনেকে মূল বিষয়টা না বুঝেই পরীক্ষার খাতায় লিখে ফেলে। প্রাসঙ্গিক নয়, এমন বিষয়ও তুলে ধরে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রশ্নোত্তরের বিষয়বস্তুর প্রেক্ষিত খুব গুরুত্বপূর্ণ।

চিন্তা প্রক্রিয়ার দক্ষতা ও স্বচ্ছতা ছাড়া কোনো জ্ঞান আদতে জ্ঞান নয়। ছাত্র-ছাত্রীদের তাদের বোঝার ও লেখার সক্ষমতা বাড়াতে হবে, শুধু মুখস্থ বিদ্যা নয়। আধুনিক যুগে ছাত্র-ছাত্রীদের দৃষ্টিভঙ্গি, জানার পরিধি বিস্তৃত ও বিজ্ঞানসম্মত হতে হবে।

আমাদের শিক্ষার দুর্বলতা বুঝাতে আফ্রিকার কঙ্গোর কেঙ্গা নামে এক জাতিগোষ্ঠীর এই গল্পটি উল্লেখ করছি: আফ্রিকার কঙ্গোর উত্তরে গভীর ইতুরি রেইন ফরেস্টের ভেতরে বাস করে ব্যাম্বুতি পিগমি জাতি, যারা এখনও মূলত শিকারি সংগ্রাহক। এদের সারা জীবন এমন একটি গভীর জঙ্গলে কাটে, যেখানে গাছের কারণে ১০-১৫ ফুটের বেশি কোনো দিকেই দৃষ্টি যায় না। তাই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এরা কখনও এর চেয়ে বেশি দূরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেনি।

১৯৫০-৬০ এর দিকে কলিন টার্নবুল নামে এক ব্রিটিশ-আমেরিকান অ্যানথ্রোপোলজিস্ট (নৃবিজ্ঞানী) ইতুরি রেইন ফরেস্টের ভেতরে বাস করা ব্যাম্বুতি পিগমিদের নিয়ে গবেষণা করতে যান। কেঙ্গা নামে একজন তরুণ ব্যাম্বুতি পিগমিকে গবেষক টার্নবুল তার সহকারী নিযুক্ত করেন। একদিন টার্নবুলের সাথে কেঙ্গা বনের প্রান্তে চলে আসে যেখান থেকে দূরের পাহাড় দেখা যায়। কোনোদিন দূরের পাহাড় না দেখা কেঙ্গা পাহাড় দেখে প্রশ্ন করে, ‘মেঘগুলো মাটিতে নেমে গেছে কেন?’

আর একবার খোলা জায়গায় গিয়ে কেঙ্গা দেখে দূরে কতগুলো মহিষ চরছিল। কেঙ্গা সেগুলো দেখে প্রশ্ন করে, ‘এগুলো কি পোকা?’ সারাজীবন যারা ১০-১৫ ফুটের বেশী দেখেনি, তাদের ব্রেইন পার্সপেক্টিভ (মস্তিষ্কের দৃষ্টিকোণ)থেকে দূরত্ব পরিমাপের ‘সিনারজিস্টিক’ প্রক্রিয়াকরণ শেখেনি। টার্নবুল বলেন, ‘এগুলো পোকা নয় এগুলো মহিষ, দূরে আছে তাই এগুলো ছোট দেখাচ্ছে।’ কেঙ্গা সেটা বিশ্বাস করতে চায় না।

কেঙ্গার ভুল ভাঙাতে টার্নবুল যখন তাকে হাঁটিয়ে মহিষগুলোর কাছে নিয়ে যায়, তখন বিস্মিত হয় কেঙ্গা। সে বলে, ‘কোন জাদুর বলে তুমি পোকাকে মহিষ বানিয়ে ফেললে?’ দূরের জিনিস দেখেনি বলে কেঙ্গার মস্তিস্কে দৃষ্টিকোণ (পার্সপেক্টিভ) ও দূরত্ব নিয়ে স্থির চিন্তা (কনসিসটেন্সি) তৈরি হয়নি। (সূত্র: গবেষক সিরাজুল হোসেন)

সেই ব্যাম্বুতি পিগমিদের মতো দৃষ্টিসীমার মধ্যে যেটুকু দেখা যায়, বা যতটুকু দেখা যায়, সেটুকু দেখলে চলবে না। জ্ঞানের জগৎটা অনেক বড়, বিশ্বজুড়েই জ্ঞানের এই জগৎ বিস্তৃত। নিজের মাথা খাটাতে না পারলে এবং মস্তিষ্ককে দক্ষ করতে না পারলে কেঙ্গাদের মতোই অবস্থা হবে সবার।

স্কুল-কলেজে আমাদের কিছু জ্ঞান দেওয়া হয়, কিছু তত্ত্ব শেখানো হয়। কীভাবে পড়বো, লিখবো, কীভাবে বেশি নাম্বার পাবো, তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরবো তা শেখানো হয়। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা কিন্তু কিছুটা অন্যরকম। কোনো একটি তত্ত্ব বা পদ্ধতি শেখানো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মূল কাজ নয়। অনেককিছু শিখে নিজের মতো করে গ্রহণ করাই হলো উচ্চশিক্ষা। আর সেই পরিসরে পা রাখতে চাইলে সেভাবেই নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।

যথাযথভাবে শিক্ষিত হতে হলেও ভালো শিক্ষাব্যবস্থা ও ভালো স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন। প্রায় চার হাজার বছর আগে ঈশোপনিষদে বলা হয়েছিল, ‘যারা অবিদ্যা অনুশীলন করে, তারা অজ্ঞানের ঘোর ও অন্ধকারময় লোকে প্রবেশ করে।’

আসল সত্য হচ্ছে জ্ঞান, যা অনেক বিস্তৃত। টিকতে হলে সেই জ্ঞানের দিকেই আমাদের যেতে হবে। এই ফল বিপর্যয়ের গলদও হচ্ছে ওই অবিদ্যা ও অজ্ঞানতা। শিক্ষাব্যবস্থার এই গলদটা যতদিন পর্যন্ত না চিহ্নিত করা যাবে, ততদিন অবস্থার কোনো উন্নতি হবে না।