১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ফিকে হয়ে আসছে বাংলাদেশের ‘সেরা’ নির্বাচনের অঙ্গিকার

বাংলাদেশের অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত এক মাসে অন্তত তিনটি বৈঠকে ইতিহাসের সর্বকালের সেরা নির্বাচন উপহার দেওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। আর তিনটি রাত পেরিয়ে যে সকাল হবে সেই সকালেই শুরু হবে সারা দেশে বহু কাঙ্ক্ষিত ভোট। ইতিহাসের সর্বকালের সেরা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করার কথা ছিল তা এখনও চোখে পড়ছে না। উপরন্তু নানা কর্মকাণ্ডে জনমনে একধরনের দ্বিধার সৃষ্টি হচ্ছে। আদৌ কি নির্বাচন উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক কিংবা ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হবে—সে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সর্বগ্রহণযোগ্য তিনটি এবং মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের কথা বলা হয়ে থাকে। এর বাইরেও আরও আটটি নির্বাচন হয়েছে। সে নির্বাচন ঘিরে কোনো না কোনোভাবে বিতর্ক রয়েছেই।

গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলতে, ’৯০-এর স্বৈরাচার এরশাদের পতন-পরবর্তী ’৯১-এর পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ওয়ান ইলেভেনের পটপরিবর্তনের পরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দেশের সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর এই প্রথমবারের মতো কোনো জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। সংবিধানে এই সরকারের কোনো বিধান না থাকলেও সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শে গঠিত এই সরকারের অধীনেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনাররা প্রধান সাক্ষাৎ করতে গেলে প্রধান উপদেষ্টা হলেন, জাতিকে একটি সুন্দর নির্বাচন দিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জাতিকে আমরা ইতিহাসের সেরা নির্বাচন উপহার দেওয়ার প্রত‍্যয়ে এগিয়ে চলছি। গত ১২ জানুয়ারি নরওয়ের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকেও তিনি বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নির্বাচন। সরকার আগামী সাধারণ নির্বাচনকে ঐতিহাসিক এবং দৃষ্টান্তমূলক করতে চায়।

এদিকে গত ২ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নির্বাচনকে ঘিরে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৭৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে নির্বাচন ঘিরে ভীতি দেখানো বা আক্রমণাত্মক আচরণের ঘটনা ঘটেছে ১৬টি, প্রার্থীর ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে ১৫টি, হত্যাকাণ্ড ঘটেছে পাঁচটি, প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৮৯টি এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে তিনটি।

এ ছাড়া হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে ৯টি, প্রচার কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ২৯টি, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অফিস ও প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ২০টি, অবরোধ ও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে ১৭টি, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে ১টি এবং অন্যান্য ঘটনা ঘটেছে ৭০টি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলা হয় ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে। ওই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৬ কোটি ২১ লাখ ৮১ হাজার ৭৪৩। ৭৫টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। অন্যান্য দলের মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৮৮, জাতীয় পার্টি ৩৫, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ১৮, সিপিবি ৫, বাকশাল ৫, জাসদ (সিরাজ) ১, ইসলামী ঐক্যজোট ১, ওয়ার্কার্স পার্টি ১, এনডিপি ১, গণতন্ত্রী পার্টি ১, ন্যাপ (মোজাফফর) ১ ও অন্যান্য দল ৩টি আসন পায়। মোট ভোট গৃহীত হয়েছিল ৫৫.৪৫ শতাংশ। এই সংসদেই সবচেয়ে বেশি দলের প্রতিনিধি সংসদে গিয়েছিল।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ৫ কোটি ৬৭ লাখ ১৬ হাজার ৯৩৫ জন। অংশগ্রহণ করে ৮১টি রাজনৈতিক দল। বিজয়ী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পায় ১৪৬টি, বিএনপি ১১৬টি, জাতীয় পার্টি ৩২টি, জামায়াতে ইসলামী ৩টি আসন। সংসদ নেতা হন শেখ হাসিনা।

২০০১ সালের পয়লা অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ৭ কোটি ৪৯ লাখ ৪৬ হাজার ৩৬৪। অংশগ্রহণ করে ৫৪টি দল। বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পায় ১৯৩টি আসন। আওয়ামী লীগ ৬২টি, জামায়াতে ইসলামী ১৭টি, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যফ্রন্ট ১৪টি আসন।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বও অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এতে ভোটার সংখ্যা ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৩ জন। নির্বাচনে ৩৮টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে এবং ভোট প্রদানের হার ছিল ৮৭.১৬ শতাংশ। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয় হয়। তারা পায় ২৩০টি আসন। বিএনপি মাত্র ৩০টি, জাতীয় পার্টি ২৭টি আসন। এই নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ যেমন কম ছিল তেমনি ব্যাপক কারচুপিরও অভিযোগ উঠেছিল। এর পরের তিনটি নির্বাচন ছিল ষড়যন্ত্রের ও একতরফা নির্বাচন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করতে পারছে না। তবে নতুন রাজনৈতিক শক্তি এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এই জোটকে বিশেষ আনুকূল্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির পক্ষ থেকে। এরই মধ্যে এই নির্বাচনের প্রশাসনিক ক্যু হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে তারা। দলের একাধিক সিনিয়র নেতা অভিযোগ করেছেন, সরকার দুটি দলকে (জামায়াত ও এনসিপি) ক্ষমতায় আনার জন্য ‍নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেষ্টা করছে।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এই নির্বাচনে ২৯৮টি আসনে ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মোট ১,৭৩২ জন প্রার্থীসহ সর্বমোট ১,৯৮১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটারদের মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন; নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১,২৩২ জন। জামায়াতের প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। সংস্কারের ইস্যুতে এবার সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘হ্যাঁ-না’ ভোট অনুষ্ঠিত হবে।

নির্বাচনের আগে সহিংসতা, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস, পরস্পরের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়ি, নির্বাচন ঘিরে ষড়যন্ত্রসহ নানা কারণে এবারের নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি, নারীর অংশগ্রহণ, সংখ্যালঘুদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতির ওপর নির্ভর করবে নির্বাচন ‘ইতিহাসের সেরা’ হবে কি না।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, তারা ভোট নিয়ে আতঙ্কিত। ভোট নিয়ে এই আতঙ্ক অতীতের নির্বাচনগুলোতেও ছিল। আওয়ামী লীগের আমলে পরপর তিনটি নির্বাচন যেহেতু একতরফা হয়েছে। যেহেতু বাস্তব কোনো নির্বাচন হয়নি। তাই সেখানে খুব বেশি আতঙ্ক ছিল না। কারণ অধিকাংশ মানুষের ভোট দেওয়ারই প্রয়োজন পড়েনি। এবার মানুষ একটা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে পারবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল।

এদিকে নির্বাচনের ব্যালট পেপার, গণভোট ও পোস্টাল ব্যালট প্রথমে আলাদা করা হবে। তারপর শুরু হবে গণনা। ফলে ভোট গণনায় বিলম্ব হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যেও ষড়যন্ত্র দেখছে রাজনৈতিক দলগুলো। নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি বলেন, এবার সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিন অনুষ্ঠিত হবে। ভোটগ্রহণ শেষে গণভোটটা আলাদা গণনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি জাতীয় সংসদের ভোট গণনা করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তা পোস্টাল ব্যালটগুলো গণনা করে ফেলবেন। তাহলে খুব একটা বেশি সময় লাগবে বলে মনে হয় না। তিনি আরও বলেন, ফলাফল দিতে যত দেরি হবে, তত উত্তেজনা বাড়বে। যেহেতু আস্থাহীনতার একটা ব্যাপার রয়েছে, এজন্য সহজে কারচুপির অভিযোগ উঠতে পারে।

‎‎ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, ভোট গণনা যেন স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হয়, যেখানে সব দলের প্রতিনিধিরা থাকবেন। ফলাফল ঘোষণায় অনিয়মের সুযোগ রোধ করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে যেন কোনো ধরনের গুজব ছড়িয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টি না হয় সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে। সংবাদসুত্র দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ