৩১শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র

তেল, সোনা ও বিরল খনিজ: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক সংকটের নেপথ্যে

তেল, সোনা ও বিরল খনিজ: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক সংকটের নেপথ্যে

তবে এখন দেখা যাচ্ছে, ভেনিজুয়েলার বিশাল সম্পদই এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার অন্যতম ভিত্তি। বিষয়টি বুঝতে পেরে বিরোধী দলীয় নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো সম্প্রতি ‘ল্যান্ড অব গ্রেস’ নামে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। সেখানে তিনি ভেনিজুয়েলার খনিজ সম্পদ কাজে লাগিয়ে দেশকে দেউলিয়া দশা থেকে উদ্ধারের স্বপ্ন দেখিয়েছেন।

ভেনিজুয়েলার বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের পেছনে সাধারণত দুটি কারণ সামনে আনা হয়। এক, মাদুরো সরকারের সঙ্গে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও অপরাধী চক্রের কথিত যোগাযোগ। দুই, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এর সঙ্গে তৃতীয় একটি কারণ যুক্ত করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই ভেনিজুয়েলার তেল ও জ্বালানি সম্পদের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ভেনিজুয়েলা একসময় মার্কিন কোম্পানি এক্সন মোবিলের কাছ থেকে জ্বালানি অধিকার ও সম্পদ কেড়ে নিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন, তারা আমাদের সব জ্বালানি অধিকার নিয়ে নিয়েছিল। বেশি দিন আগের কথা নয়, তারা আমাদের সব তেল নিয়ে নিয়েছিল। আমরা এখন তা ফেরত চাই।’

অনেকে মনে করতেন না যে এই সংকটের পেছনে প্রাকৃতিক সম্পদ মূল কারণ। তবে এখন দেখা যাচ্ছে, ভেনিজুয়েলার বিশাল সম্পদই এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার অন্যতম ভিত্তি। বিষয়টি বুঝতে পেরে বিরোধী দলীয় নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো সম্প্রতি ‘ল্যান্ড অব গ্রেস’ নামে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। সেখানে তিনি ভেনিজুয়েলার খনিজ সম্পদ কাজে লাগিয়ে দেশকে দেউলিয়া দশা থেকে উদ্ধারের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তিনি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দেশটির বিশাল সম্পদের সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

গত এক দশকে দেশটির অর্থনীতি পুরোপুরি ধসে পড়েছে। এটি একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি। একদিকে প্রচুর সম্পদ, অন্যদিকে দেশটি অচল হয়ে পড়েছে। দারিদ্র্যের মধ্যে এই প্রাচুর্য ‘দরিদ্র অথচ সমৃদ্ধ দেশ’-এর এক মিথ তৈরি করেছে, যা ভেনিজুয়েলার জন্য বড় যন্ত্রণার কারণ।

ভেনিজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলের মজুদ রয়েছে। গ্যাসের মজুদে তারা বিশ্বে ষষ্ঠ। ল্যাটিন আমেরিকার সবচেয়ে বেশি সোনা এখানেই আছে। এছাড়া লোহা, বক্সাইট ও হীরারও বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। বিশেষ করে ‘রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস’ বা বিরল খনিজ উপাদানের কথা বলতে হয়। কলটান ও থোরিয়ামের মতো এসব উপাদান আধুনিক প্রযুক্তির জন্য খুব জরুরি। মোবাইল ফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, অস্ত্র এবং নবায়নযোগ্য শক্তি তৈরিতে এগুলো লাগে। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থানও বেশ সুবিধাজনক।

২০১৪-১৫ সালে তেলের দাম কমে গেলে এবং দেশে খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিলে সরকার খনিজ সম্পদের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। ২০১৬ সালে নিকোলাস মাদুরো ‘অরিনোকো মাইনিং আর্ক’ নামের একটি বিশাল এলাকা ঘোষণা করেন। এটি দেশের মোট আয়তনের ১২ শতাংশ। সরকার দাবি করে, এখানে ৮ হাজার টনের বেশি সোনা এবং প্রচুর হীরা, নিকেল ও তামা আছে।

কিন্তু এক দশক পর দেখা যাচ্ছে, এটি উন্নয়নের বদলে অপরাধ, রাজনৈতিক দুর্নীতি ও চোরাচালানের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সেখানে কোনো বড় আকারের নিয়মতান্ত্রিক খনন হচ্ছে না, বরং বিশৃঙ্খলভাবে সম্পদ লুট হচ্ছে। এর ফলে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ও ঘটছে।

সোনা ব্যবসার জন্য ভেনিজুয়েলা তুরস্ক ও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে জোট করেছে। তবে খনি এলাকাগুলোতে কলম্বিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী ইএলএন, ফার্ক এবং ‘ট্রেন দে আরাগুয়া’-এর মতো অপরাধী চক্র সক্রিয়। সরকারি হিসাবে ২০২৫ সালের মধ্যে সেখান থেকে ৭৯ টন সোনা পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এর বড় অংশই পাচার হয়ে যায়। ট্রান্সপ্যারেন্সি ভেনিজুয়েলার তথ্যমতে, ২০২৪ সালে উত্তোলিত খনিজের মাত্র ১৪ শতাংশ অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা হয়েছে। বাকিটা অপরাধী চক্র ও তাদের সহযোগীদের পকেটে গেছে।

২০২৩ সালে সরকার প্রযুক্তি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিরল খনিজ উপাদান উত্তোলনের ঘোষণা দেয়। এই ‘কালো বালু’ বা খনিজ বাজারের বড় অংশ চীনের দখলে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিতে চান। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভেনিজুয়েলা থেকে এসব খনিজ অবৈধভাবে কলম্বিয়ায় পাচার হয়। সেখানে ‘বৈধ’ তকমা লাগিয়ে সেগুলো শেষ পর্যন্ত চীনের কোম্পানিগুলোর হাতেই পৌঁছাচ্ছে।