৩১শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র
এম. কে. ভদ্রকুমার

ট্রাম্পের প্রভাবে লাতিন আমেরিকা ক্রমে ডানদিকে মোড় নিচ্ছে

ট্রাম্পের প্রভাবে লাতিন আমেরিকা ক্রমে ডানদিকে মোড় নিচ্ছে

আনন্দের কারণ ঘটিয়ে যখন লিমা থেকে তাঁর কাছে খবর পৌঁছাল যে, চিলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অতি-রক্ষণশীল প্রার্থী হোসে আন্তোনিও কাস্ট বিজয়ী হয়েছেন, আর্জেন্টিনার ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে রোববার সন্ধ্যায় সামাজিক মাধ্যম এক্সে দক্ষিণ আমেরিকার একটি মানচিত্র পোস্ট করেন, যার ওপরের অর্ধেক লাল এবং নিচের অর্ধেক রক্ষণশীল নীল রঙে রঞ্জিত। মিলে গর্বের সঙ্গে ক্যাপশন দিয়েছেন, বামপন্থিরা পিছিয়ে পড়ছে, স্বাধীনতা এগিয়ে যাচ্ছে।

কাস্ট ৫৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন, তাঁর কমিউনিস্ট প্রতিপক্ষ জিনেট জারা পেয়েছেন ৪২ শতাংশ ভোট। প্রকৃতপক্ষে, লাতিন আমেরিকায় মার্কিনবান্ধব নেতার সংখ্যা ক্রমাগত দীর্ঘ হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল নথিতে এই অঞ্চলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছেন।

তবে কাস্টের নির্বাচনী জয় তাঁর জনপ্রিয়তার প্রকৃত প্রতিফলন নয়। কারণ রোববারের নির্বাচন ছিল দ্বিতীয় দফার নির্বাচন, যেখানে তিনি চিলির অন্য ডানপন্থি শক্তিগুলোর ভোটও পেয়েছেন। প্রথম দফায় তাঁর অবস্থান ছিল দ্বিতীয় স্থানে, যেখানে জারা পেয়েছিলেন ২৭ শতাংশ ভোট। এতে পশ্চিম গোলার্ধে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুর ডানদিকে হেলে পড়ার বৃহত্তর বার্তাটির গুরুত্ব কমে না। লাতিন আমেরিকা একের পর এক নির্বাচনে ডানপন্থিদের বিজয় হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, কোনোটাই সামান্য ব্যবধানে নয়।

এই পরিবর্তন উনিশ শতকের মহান জার্মান রাজনীতিবিদ ও অস্ট্রিয়ান সাম্রাজ্যের কূটনীতিক, চ্যান্সেলর প্রিন্স মেটারনিচের সেই কথাটি মনে করিয়ে দেয়। তিনি বলেছিলেন ‘যখন প্যারিস হাঁচি দেয়, তখন ইউরোপ সর্দিতে ভোগে।’ গোলাপি থেকে নীল রঙে রূপান্তরের এই সময়ে ট্রাম্পের কিছু ঘটনাও লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

বলিভিয়ায় মধ্য-ডানপন্থি রদ্রিগো পাজের জয়, অক্টোবরে আর্জেন্টিনায় মিলের নিজস্ব কংগ্রেসে চিত্তাকর্ষক জয় এবং হন্ডুরাসের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নাসর আসফুরার শক্তিশালী দক্ষতা প্রদর্শনের পর কাস্ট বিজয়ী হলেন, যাকে ট্রাম্প প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিলেন। এই রাজনীতিবিদরা ইকুয়েডর, প্যারাগুয়ে ও এল সালভাদরের বর্তমান রক্ষণশীল প্রেসিডেন্টদের সারিতে যোগ দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে হিস্পানিক জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ফলে এর গভীর প্রভাব রয়েছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন লাদিন, যারা দেশটিতে বৃহত্তম জাতিগত সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। কাস্টের বিশাল বিজয় কেবল একটি রাজনৈতিক দিক থেকে বড় পরিবর্তনই নয়, বরং একটি নৈতিক পরিবর্তনও। কারণ, কাস্ট চিলির প্রয়াত স্বৈরশাসক জেনারেল অগাস্টো পিনোশের একজন অন্ধ অনুসারী এবং নির্লজ্জ রক্ষক। ১৯৭৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পিনোশে চিলিতে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। কাস্ট খোলাখুলিভাবে গর্ব করে বলেন যে, যদি এই নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক আজ বেঁচে থাকতেন, ‘তিনি আমাকে ভোট দিতেন।’

তবুও তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো আমূল পরিবর্তনের জন্য আগ্রহী একটি ক্ষুব্ধ, ক্লান্ত ও বিভ্রান্ত জাতির কাছে আবেদন জানিয়েছিল। লাখ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে বহিষ্কার করার; অপরাধ ও মাদক পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার; সরকারি ব্যয় কমানোর এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর অঙ্গীকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাস্ট ফের চিলিতে সুপ্ত পিনোশেইজমকে সক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছেন। সত্য বলতে গেলে বলতে হয়, ১৯৯০ সালে পিনোশে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পরেও কাস্ট উদার হস্তে ঘৃণ্য স্বৈরশাসকের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছিলেন। প্রশ্ন হলো, যে নৃশংস শাসনব্যবস্থার অধীনে আনুমানিক ৪০ হাজার মানুষকে নির্যাতন করা হয়েছিল এবং ৩ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল; তার একজন সমর্থককে কীভাবে চিলির জনগণ তাদের পরবর্তী নেতা হিসেবে বেছে নিল?

একটি অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৮৮ সালে গণভোটে হেরে গেলেও পিনোশে ৪৪% ভোট পেয়েছিলেন। স্বৈরশাসকের বিদায়ের পর তাঁর নির্বাচনী এলাকা বা ভিত্তি এলাকাগুলো কেবল অন্য রক্ষণশীল দলগুলোর মধ্যে বিশেষ করে ইউনিয়ন ডেমোক্র্যাটা ইনডিপেনডেন্ট (ইউডিআই) স্থানান্তরিত হয়, যেটি ক্ষমতায় ছিল। কাস্ট নিজেই ইউডিআই থেকে বেরিয়ে আসেন। কারণ তিনি দেখতে পান যে, এটি দলের কর্তৃত্ববাদী শিকড়কে নিয়ন্ত্রণ করছে।

এটি ছিল একটি ধূর্ত পদক্ষেপ। সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপ অনুসারে, চিলির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ পিনোশেকে ‘দেশের ইতিহাসের সেরা রাজনৈতিক নেতাদের একজন’ বলে মনে করেন। তারা বিশ্বাস করেন যে, যদি রাজনীতিবিদরা তাঁর ধারণা অনুসরণ করেন, তাহলে দেশটি ‘বিশ্বে তার স্থান পুনরুদ্ধার করবে’।

এসব সত্ত্বেও বলা দরকার, মুদ্রাস্ফীতি ও অপরাধের মতো ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বোরিকের বামপন্থি সরকারের ব্যর্থতা এবং এর দুর্বল অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতার জন্য কাস্ট অনেকাংশে জয় নিশ্চিত করতে পেরেছেন। বাস্তবে ২০১৮ সাল থেকে চিলির অর্থনীতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। ইতোমধ্যে জাতীয় নিরাপত্তাহীনতা এবং অনিবন্ধিত অভিবাসনও প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা কাস্ট প্রচারণাকালে সামাজিক ইস্যুতে তাঁর অত্যন্ত রক্ষণশীল, ঐতিহ্যবাহী অবস্থান এবং পিনোশেপন্থি দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও শক্তিশালী করার জন্য কাজে লাগিয়েছিলেন।

যুক্তিসংগতভাবে, কাস্ট এমন কিছুর প্রতিনিধি, যা কেবল লাতিন আমেরিকাজুড়ে নয়, ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য অংশেও ঘটছে, মধ্য-ডানপন্থিদের অনেক বেশি ইতিবাচক ডানপন্থিদের দ্বারা স্থানচ্যুত হচ্ছে। এখন, নতুন ডানপন্থা কী রূপ নেবে তা অনেকটাই নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের ওপর। আর্জেন্টিনায় এটি স্বাধীনতাবাদী; এল সালভাদরে এটি অত্যন্ত কর্তৃত্ববাদী; বলিভিয়ায়, যেখানে রদ্রিগো পোজ সম্প্রতি নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন, এটি আদর্শিক নয় বরং সংস্কারবাদী।

লাতিন আমেরিকার বাইরে, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়া একটি নতুন ডানপন্থি রূপের প্রতিনিধিত্ব করে, যা জাতীয়তাবাদী ও গোষ্ঠীবাদী; ফ্রান্স এবং জার্মানিতে এটি বিশ্ববাদবিরোধী; পোল্যান্ডে এটি ‘চীনপন্থি’; হাঙ্গেরিতে এটি ‘রাশিয়াপন্থি’ এবং ভারতে এটি নৃতাত্ত্বিক পরিচয়কেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদের ডানায় চড়ে।

কাস্টের অর্থনৈতিক এজেন্ডা আর্জেন্টিনার মিলের মতোই সরকারকে ছোট করার প্রতিশ্রুতি; বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য লিথিয়াম উন্মুক্ত করা; রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তামার জায়ান্ট কোডেলকোকে বেসরকারীকরণ ইত্যাদি। তিনি অভিবাসীদের বহিষ্কার এবং স্থানীয়দের স্বার্থ অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য ট্রাম্পের আহ্বানের সঙ্গে একমত, কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিপরীতে তিনি একজন মুক্ত-বিপণনকারী। তবে, তাঁর নেতৃত্ব খুব কার্যকর হতে হবে, যেহেতু সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই তার এবং চিলিতে দলীয় শৃঙ্খলা নিয়ে কুখ্যাতি বেশি।

নিশ্চিতভাবেই অতি-ডানপন্থিরা পৃথিবীর কোথাও বেইজিং থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; চিলি ভবিষ্যতে লাতিন আমেরিকায় প্রভাব বিস্তারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ওয়াশিংটনে উদ্বেগের জন্ম দেয়, যা যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করে। কিন্তু অন্যান্য বৃহৎ শক্তির বিপরীতে, চীন যা প্রচার করে তা অনুশীলন করে এবং মূলত একটি সভ্য রাষ্ট্র হিসেবে থাকবে, যা সম্প্রসারণবাদী নয় বা প্রভাববলয়ের পেছনে আকাঙ্ক্ষা করে না; বরং সমান খেলার ক্ষেত্র নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে–যেমন দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতা সাক্ষ্য দেয়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, ডানপন্থিদের উত্থানের বেশির ভাগ কারণ বিদেশি নয় বরং লাতিন আমেরিকার ভেতরে পরিবর্তিত বাস্তবতা থেকে উদ্ভূত। লাতিন আমেরিকার কোথাও অতি ডানপন্থিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়, তারা সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ভোটার, তবে তাদের রাজনৈতিক সমর্থন রয়েছে এবং এটি স্পষ্টতই চিলিতে কাস্টকে সাহায্য করেছে। এম কে ভদ্রকুমার: ভারতের সাবেক কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; ইন্ডিয়ান পাঞ্চলাইন থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম