১লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র

খাশোগি ‘অত্যন্ত বিতর্কিত’, যুবরাজ সালমান নির্দোষ: মানবাধিকার নিয়ে ট্রাম্পের যত বিতর্কিত অবস্থান

খাশোগি ‘অত্যন্ত বিতর্কিত’, যুবরাজ সালমান নির্দোষ: মানবাধিকার নিয়ে ট্রাম্পের যত বিতর্কিত অবস্থান

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, খাশোগি হত্যাকাণ্ড নিয়ে তিনি খুব একটা চিন্তিত নন। তবে মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) সৌদি যুবরাজের পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প যেসব মন্তব্য করেছেন, তা তার অতীতের আচরণের নিরিখেও বিস্ময়কর।

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসনের অধীন সিআইএ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিক ও মার্কিন বাসিন্দা জামাল খাশোগিকে নৃশংসভাবে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

সে সময় রিপাবলিকান নেতৃত্বাধীন সিনেট সর্বসম্মতিক্রমে যুবরাজের নিন্দা জানিয়ে ভোট দেয়। এমনকি একজন রিপাবলিকান সিনেটর মন্তব্য করেছিলেন, বিষয়টি যদি কোনো জুরির সামনে যেত, তবে ৩০ মিনিটের মধ্যেই যুবরাজ দোষী সাব্যস্ত হতেন।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, খাশোগি হত্যাকাণ্ড নিয়ে তিনি খুব একটা চিন্তিত নন। তবে মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) সৌদি যুবরাজের পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প যেসব মন্তব্য করেছেন, তা তার অতীতের আচরণের নিরিখেও বিস্ময়কর।

ট্রাম্প এদিন খাশোগি হত্যাকে কেবল খাটো করেই দেখেননি, বরং যুবরাজের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন (যিনি ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন)। এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুবরাজ দোষী কি না তা হয়তো আমরা কখনোই নিশ্চিতভাবে জানতে পারব না। কিন্তু এবার তিনি জোর দিয়ে বললেন, ‘প্রিন্স বিন সালমান এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না’।

অতীতে ট্রাম্প রক্ষণশীলদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে খাশোগির সঙ্গে ইসলামপন্থী আন্দোলনের কথিত সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করতেন (যদিও প্রমাণ বলে খাশোগি সেই পথ ত্যাগ করেছিলেন)।

কিন্তু এবার ট্রাম্প কার্যত বলেই দিলেন যে, এই সাংবাদিকের পরিণতি তার নিজের কর্মফল। খাশোগিকে ‘অত্যন্ত বিতর্কিত’ আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘তাকে আপনার পছন্দ হোক বা না হোক, এমন ঘটনা ঘটেই থাকে।’ তার এই মন্তব্যে মনে হয়েছে, হাড় কাটার করাত দিয়ে কাউকে টুকরো টুকরো করে ফেলার মতো নৃশংস ঘটনা যেন নিছকই একটি দুর্ঘটনা।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল, যখন ট্রাম্প যুবরাজের উপস্থিতিতে এ বিষয়ে প্রশ্ন করায় এক সাংবাদিককে ধমক দেন। ওভাল অফিসে ট্রাম্প বলেন, ‘এমন প্রশ্ন করে আমাদের অতিথিকে বিব্রত করার কোনো প্রয়োজন নেই।’

ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের জবাবে খাশোগির স্ত্রী হানান এলাত্র খাশোগি সিএনএনকে বলেন, ‘সাংবাদিকের অতীত “তাকে হত্যা”র কোনো যৌক্তিকতা হতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘জামাল একজন ভালো, স্বচ্ছ এবং সাহসী মানুষ ছিলেন।’

অবশ্য কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক কারণে সৌদি আরবের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন। উভয় দলের প্রেসিডেন্টরাই নির্বাচনী প্রচারণায় সৌদিদের বিরুদ্ধে কঠোর কথা বললেও ক্ষমতায় গিয়ে সুর নরম করেছেন। কিন্তু ট্রাম্পের স্বাতন্ত্র্য হলো, তিনি মানবাধিকারের বিষয়টিকে সমীকরণে রাখার ভানটুকুও করেন না। বরং মঙ্গলবার যুবরাজের সঙ্গে বৈঠকের শুরুতে তিনি বলেন, ‘মানবাধিকার এবং অন্যান্য বিষয়ে তিনি (এমবিএস) যা করেছেন তা অবিশ্বাস্য।’

জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ট্রাম্পের গত এক দশকে মানবাধিকার নিয়ে এমন অবজ্ঞাসূচক আচরণ একটি ধ্রুব সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিচে তার প্রথম মেয়াদে মানবাধিকার এবং অভিযুক্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের নিয়ে করা কিছু উল্লেখযোগ্য মন্তব্য তুলে ধরা হলো:

২০১৭: ভ্লাদিমির পুতিনের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের তুলনা : ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই তৎকালীন ফক্স নিউজ উপস্থাপক বিল ও’রাইলি তাকে বলেন যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ‘একজন খুনি’। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘অনেক খুনিই আছে। আপনি কি মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র খুব নির্দোষ?’

২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর সময় পশ্চিমা নেতারা যখন রাশিয়ার আগ্রাসনের নিন্দা জানাচ্ছিলেন, তখন ট্রাম্প পুতিনের এই পদক্ষেপকে ‘জিনিয়াস’ এবং ‘চতুর’ বলে প্রশংসা করেছিলেন। (অবশ্য যুদ্ধ চলতে থাকায় ট্রাম্প পরে বলেছিলেন তিনি রুশ নেতার প্রতি ‘খুবই হতাশ’।)

২০১৮: উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন সম্পর্কে মন্তব্য : ফক্স নিউজের আরেক উপস্থাপক যখন উল্লেখ করেন যে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন অনেক মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, তখন ট্রাম্প উত্তর দেন: ‘তিনি একজন শক্ত ধাতের মানুষ।’

কিম ‘খুবই খারাপ কিছু কাজ’ করেছেন—এ বিষয়ে চাপ দেওয়া হলে ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, কিন্তু অন্য অনেকেই অনেক খারাপ কাজ করেছেন। আমি এমন অনেক দেশের নাম বলতে পারি যেখানে অনেক খারাপ কাজ করা হয়েছে। তবে সব মিলিয়ে উত্তর হলো—হ্যাঁ (তিনি করেছেন)।’

২০১৬: বিচারবহির্ভূত হত্যার জন্য সাদ্দাম হোসেনের প্রশংসা : তৎকালীন ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন সম্পর্কে প্রেসিডেন্সিয়াল প্রার্থী ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘তিনি খারাপ লোক ছিলেন, সত্যিই খুব খারাপ। কিন্তু জানেন তিনি কোন কাজটি ভালো করতেন? তিনি সন্ত্রাসীদের হত্যা করতেন। তিনি সেটা খুব ভালো করতেন। তাদের কোনো অধিকার শোনা হতো না, তারা কথা বলতে পারত না। তারা সন্ত্রাসী ছিল—ব্যাস, শেষ।’

বাস্তবে সাদ্দাম হোসেন কেবল কথিত সন্ত্রাসী নয়, বিনা বিচারে অনেক মানুষকে হত্যা করেছেন। ২০০২ সালের মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাদ্দাম মনে করতেন কারও রাজনৈতিক বিশ্বাস, ধর্ম, জাতিগত পরিচয় বা পারিবারিক অবস্থান তার ক্ষমতার জন্য হুমকি, তাই তিনি তাদের হত্যা করতেন।

২০১৭: ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের মাদক যুদ্ধের প্রশংসা : ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের মাদকবিরোধী যুদ্ধে ব্যাপক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। এ সম্পর্কে মানবাধিকার সংস্থাগুলো ব্যাপকভাবে নিন্দা জানায়। ট্রাম্প এর নিন্দা তো করেনইনি, বরং এক পর্যায়ে দুতার্তের প্রশংসা করেন।

২০১৭ সালের ২৯ এপ্রিল এক ফোনালাপে ট্রাম্প দুতার্তেকে বলেন, ‘আমি আপনাকে অভিনন্দন জানাতে চাই কারণ আমি শুনেছি মাদক সমস্যা মোকাবিলায় আপনি অবিশ্বাস্য কাজ করছেন।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘অনেক দেশেরই এই সমস্যা আছে, আমাদেরও আছে। কিন্তু আপনি দুর্দান্ত কাজ করছেন এবং আমি ফোন করে আপনাকে সেটাই বলতে চেয়েছিলাম।’

(সে সময় এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেছিলেন, ট্রাম্প মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মাদক সমস্যার কথা স্বীকার করছিলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা সহিংসতাকে সমর্থন করছিলেন না।)

২০১৯: চীনের উইঘুর ডিটেনশন ক্যাম্পকে সমর্থনের অভিযোগ : ট্রাম্পের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন তার ২০২০ সালের বইয়ে জি-২০ সম্মেলনের একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। সেখানে ট্রাম্প ও চীনা নেতা শি জিনপিং পশ্চিম চীনে উইঘুর মুসলিমদের জন্য ডিটেনশন ক্যাম্প নিয়ে আলোচনা করছিলেন।

বোল্টন লিখেন, ‘কেবল দোভাষীদের উপস্থিতিতে শি ব্যাখ্যা করেছিলেন কেন তিনি শিনজিয়াংয়ে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প তৈরি করছেন। ট্রাম্প বলেছিলেন যে শি-এর উচিত ক্যাম্প তৈরির কাজ চালিয়ে যাওয়া এবং ট্রাম্প মনে করেন এটিই সঠিক কাজ।’

বোল্টন আরও উল্লেখ করেন, ২০১৭ সালে চীন সফরের সময়ও ট্রাম্প একই ধরনের কথা বলেছিলেন বলে তাকে জানিয়েছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের শীর্ষ এশিয়া বিষয়ক কর্মকর্তা ম্যাথিউ পটিংগার।

তবে তৎকালীন ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ রবার্ট লাইটহাইজার এই বর্ণনা অস্বীকার করে একে ‘সম্পূর্ণ অসত্য’ এবং ‘পাগলামি’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

২০২৫: বেলারুশের প্রেসিডেন্টের প্রশংসা : গত আগস্টে এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ট্রাম্প বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাসেনকোকে ‘অত্যন্ত সম্মানিত প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

লুকাসেনকোর বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল ধরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। পররাষ্ট্রনীতি পর্যবেক্ষকরা তাকে প্রায়ই ‘ইউরোপের শেষ স্বৈরশাসক’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।