৩১শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বাংলাদেশ

‘মেডিক্যাল স্লো পয়জনিংয়ের’ শিকার খালেদা জিয়া, চিকিৎসা নিয়ে তদন্ত দাবি

‘মেডিক্যাল স্লো পয়জনিংয়ের’ শিকার খালেদা জিয়া, চিকিৎসা নিয়ে তদন্ত দাবি

গত ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘদিনের জটিল অসুস্থতা, কারাবাস ও গৃহবন্দিত্বের কষ্ট এবং মৃত্যুর আগে টানা এক মাসেরও বেশি সময় হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকার পর তার এই বিদায় স্বাভাবিকভাবেই জাতিকে গভীর শোকে আচ্ছন্ন করে। তবে শোকের আবহ কাটতে না কাটতেই জনমনে দানা বাঁধতে শুরু করে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন, তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী কি কেবলই বার্ধক্য ও রোগের স্বাভাবিক পরিণতিতে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, নাকি এই মৃত্যুর আড়ালে লুকিয়ে ছিল আরও গভীর, আরও সুপরিকল্পিত কোনো অদৃশ্য নীল নকশা?

গত শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এক নাগরিক শোকসভায় দেওয়া বক্তব্যে বেগম জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক দলের প্রধান অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী সেই সন্দেহের আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলে দেন। তার ভাষ্যে, বেগম খালেদা জিয়াকে পরিকল্পিতভাবে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধের ভুল প্রয়োগ ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যার চূড়ান্ত পরিণতি তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, যা তিনি রূপক অর্থে ‘স্লো পয়জনিং’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

নিজের বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ‘মেথোট্রেক্সেট’ নামের একটি নির্দিষ্ট ওষুধের নাম উল্লেখ করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় মেথোট্রেক্সেট একটি শক্তিশালী ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট এবং কেমোথেরাপি ড্রাগ, যা সাধারণত রিউমাটয়েড আর্থাইটিসের তীব্রতা নিয়ন্ত্রণে এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত বেগম খালেদা জিয়ার হাত ও পায়ের জয়েন্টে মারাত্মক ব্যথা ও কার্যক্ষমতার অবনতি ঘটেছিল, যার চিকিৎসায় এই ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছিল।

তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতিমালা অনুযায়ী, মেথোট্রেক্সেট ব্যবহারের আগে এবং ব্যবহারের পুরো সময়জুড়েই রোগীর লিভার বা যকৃতের অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা বাধ্যতামূলক।

কারণ এই ওষুধটি ‘হেপাটোটক্সিক’, অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে লিভারের কোষে মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে। বেগম খালেদা জিয়া আগে থেকেই ‘ফ্যাটি লিভার ডিজিজে’ আক্রান্ত ছিলেন, যে অবস্থায় এই ওষুধের ব্যবহার বিশেষ সতর্কতা ও নিয়মিত পরীক্ষা ছাড়া মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

ডা. সিদ্দিকীর অভিযোগ অনুযায়ী, যখন তার লিভার ফাংশন টেস্টের রিপোর্ট খারাপ আসতে শুরু করে, তখনো তৎকালীন সরকারি চিকিৎসকরা বেগম খালেদা জিয়াকে এই ওষুধ দেওয়া বন্ধ করেননি। ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত একজন রোগীকে নিয়মিত মেথোট্রেক্সেট দেওয়া হলে তা অত্যন্ত দ্রুত লিভার সিরোসিসে রূপ নেয় বলে জানান তিনি।
ডা. সিদ্দিকী একেই ‘স্লো পয়জনিং’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

বেগম খালেদা জিয়ার প্রকৃত শারীরিক অবস্থা দেশবাসীর সামনে প্রথম স্পষ্টভাবে আসে ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে, যখন তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী জানান, সেই সময় বর্তমান মেডিকেল বোর্ড তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা স্তম্ভিত হয়ে যান। দীর্ঘ সময় ধরে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন থাকার সময় তাকে যে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল, সেখানে তার লিভারের এই ভয়াবহ অবস্থার কোনো উল্লেখ ছিল না। এরপর মেডিকেল বোর্ডের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে যে, মেথোট্রেক্সেটের প্রভাবে তার ফ্যাটি লিভার ইতোমধ্যেই লিভার সিরোসিসে রূপান্তরিত হয়েছে।

লিভার সিরোসিস এমন এক পর্যায়, যেখানে যকৃতের স্বাভাবিক টিস্যুগুলো ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় এবং লিভার রক্ত পরিশোধন ও হজমের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ডা. সিদ্দিকীর মতে, সরকারি চিকিৎসকরা লিভার ফাংশন টেস্টের রিপোর্ট দেখেও কেন একটি সাধারণ আল্ট্রাসনোগ্রাম করার নির্দেশ দেননি, তা একটি বিশাল রহস্য। এমন কী তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও তাকে সেই সময় সঠিক রোগ নির্ণয় ও আধুনিক পরীক্ষা থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। এই ঘটনা কি কেবলই চিকিৎসকদের অযোগ্যতা ছিল, নাকি ওপর মহলের কোনো অলিখিত নির্দেশ- সেই প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের সর্বোচ্চ একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বাংলানিউজকে বলেন, “মেথোট্রেক্সেট ঔষধ মানুষের শরীরের সেলগুলো ডিভাইডেড হতে দেয় না, পাশাপাশি এটা ইনফ্লামেশন দূর করে। সাধারণত এটা হাই ডোজে এন্টি ক্যান্সার ডোজ হিসেবে ব্যাবহার করা হয় কিন্তু খালেদা জিয়ার মনে হয় না ক্যান্সার ছিলো। ফলে ওনাকে (খালেদা জিয়াকে) সম্ভবত আর্থ্রাইটিসের জন্য এটা ব্যাবহার করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “সাধারণত আর্থ্রাইটিসের জন্য ডোজ হচ্ছে ১২ থেকে ২৫ মিলিগ্রাম, ১৫ মিলিগ্রাম হচ্ছে বেঞ্চমার্ক। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যদি এটা হাই ডোজে ব্যবহার করা হয় তাহলে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, যেমন এটা লিভারে ফ্যাটিলিভার ডিজিজ তৈরি করে। ফ্যাটিলিভার হচ্ছে একিম্যুলেশন অব ফ্যাট ইন দা লিভার। এই ঔষধের পার্শপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে একটা হচ্ছে ফ্যাট মেটাবিলিজমে সমস্যা তৈরি করে। তখন ফ্যাট লিভারে জমা হতে থাকে। এটা হচ্ছে ফ্যাটিলিভার ডিজিজ, এটা যখন আরও প্রগ্রেস করে তখন ইনফ্লামেশন হয়। আবার ইনফ্লামেশন থেকে লিভার সিরোসিসের দিকে অগ্রসর হয়। যদি মেথোট্রেক্সেট লং টার্মে হাইডোজে ইউজ করা হয়, তাহলে ফ্যাটিলিভার থেকে লিভার সিরোসিসে যেতে পারে। এটাই হচ্ছে মূল ব্যাখ্যা। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার সাথে কি হইছে সেটা আমি বলতে পারছি না।”

বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা যখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৌঁছায়, তখন তার মেডিকেল বোর্ড বারবার পরামর্শ দিয়ে আসছিল- বাংলাদেশে লিভার সিরোসিসের উন্নত চিকিৎসা সম্ভব নয়, তাকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা জার্মানিতে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। বিএনপি এবং খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বিদেশে চিকিৎসার জন্য অন্তত ২৭ বার সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবারই সেই আবেদন আইনি মারপ্যাঁচে ফেলে প্রত্যাখ্যান করা হয়। এই ২৭ বার আবেদন প্রত্যাখ্যান করাকে এখন ‘ইচ্ছাকৃত অবহেলা’ বা ‘উইলফুল নেগলিজেন্স’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

শোকসভায় ডা. সিদ্দিকী যে তিনটি সুনির্দিষ্ট পয়েন্ট তুলে ধরেছেন, তা যে কোনো সভ্য সমাজের বিচার ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। প্রথমত, তিনি প্রশ্ন তুলেছেন বিএসএমএমইউতে গঠিত তৎকালীন সরকারি মেডিকেল বোর্ডের সদস্যদের যোগ্যতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে। কেন তারা লিভার ফাংশন খারাপ হওয়ার পরও ক্ষতিকর ওষুধ চালিয়ে গেলেন? দ্বিতীয়ত, কেন একজন জাতীয় নেত্রীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছিল? চিকিৎসাশাস্ত্রে রোগীর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে চিকিৎসকের ওপর আস্থা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বেগম জিয়া যখন সরকারি চিকিৎসকদের ওপর আস্থা হারিয়েছিলেন এবং নিজের পছন্দের চিকিৎসকদের দিয়ে পরীক্ষার দাবি জানিয়েছিলেন, তখন কেন তাকে সেই অধিকার দেওয়া হয়নি- এমন প্রশ্নও তিনি করেছেন।

ডা. সিদ্দিকীর ভাষ্যমতে, বেডসাইডে ‘পয়েন্ট অব কেয়ার আল্ট্রাসাউন্ড’ করার মতো আধুনিক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা করা হয়নি। এই ধরনের অবহেলা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় কেবল ভুল নয়, বরং এটি একটি ‘অপরাধ’। ডা. সিদ্দিকী সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, এটি ছিল বেগম খালেদা জিয়াকে হত্যার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ।

সাধারণ মানুষের ধারণা ‘স্লো পয়জনিং’ মানে খাবারে বা ইনজেকশনের মাধ্যমে বিষ প্রয়োগ করা। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘মেডিকেল স্লো পয়জনিং’ আরও সূক্ষ্ম ও ভয়ংকর হতে পারে। যদি কোনো রোগী আগে থেকেই লিভার বা কিডনির মতো অন্য কোনো অঙ্গে সমস্যায় ভোগেন, তবে তাকে এমন কোনো ওষুধ নিয়মিত দেওয়া যা সেই অঙ্গটিকে ধীরে ধীরে অকেজো করে দেয়, তাকেও এক প্রকার স্লো পয়জনিং বলা হয়। বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও ঠিক এটিই ঘটেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। মেথোট্রেক্সেট ওষুধটি বাতের ব্যথার জন্য উপকারী হলেও লিভার সিরোসিসের রোগীর জন্য তা প্রাণঘাতী।

ডা. সিদ্দিকীর তথ্য অনুযায়ী, যখন মেডিকেল বোর্ড তাকে প্রথমবার সিরোসিস আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করে, তখনই দেখা যায় যে তার শরীরে লিভারের কার্যকারিতা প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। অথচ সরকারি রেকর্ডে তাকে কেবল ‘আর্থ্রাইটিস’ ও ‘ডায়াবেটিস’ এর রোগী হিসেবে দেখানো হয়েছিল। এই তথ্য গোপন করা এবং ভুল ওষুধ চালু রাখা একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক দল এখন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটির দাবি জানাচ্ছেন। অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী দাবি করেছেন যে, বিএসএমএমইউতে থাকা বেগম জিয়ার সমস্ত চিকিৎসার নথি অবিলম্বে আইনি প্রক্রিয়ায় জব্দ করতে হবে। ওই সময় যারা তার চিকিৎসার দায়িত্বে ছিলেন, তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারিরও দাবি উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একজনের মৃত্যু নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রতীককে শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা ছিল কি না, তা উদঘাটন হওয়া প্রয়োজন। যদি প্রমাণিত হয় যে, তাকে বিদেশে যেতে না দিয়ে এবং ভুল চিকিৎসা দিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তবে তা হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবথেকে জঘন্য ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’।

বেগম খালেদা জিয়াকে ‘স্লো পয়জনিং’ বা ধীরগতির বিষপ্রয়োগের মাধ্যমে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগটি বিএনপির পক্ষ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে তোলা হচ্ছে। এই আশঙ্কার সূত্রপাত হয় ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর, যখন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক সমাবেশে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কারাগারের স্যাঁতসেঁতে ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের বর্ণনা দিয়ে খালেদা জিয়াকে সেখানে স্লো পয়জনিং করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে জনসমক্ষে প্রশ্ন তোলেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর রাজবাড়ীর এক সমাবেশে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান অভিযোগ করেন যে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিহিংসাবশত তাকে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে চেয়েছে।

গত বছর ২৩ নভেম্বর বেগম খালেদা জিয়া শেষবারের মতো অসুস্থ হয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হলে একই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসসহ অন্যান্য সিনিয়র নেতারা। তবে এত দিন বিষয়টি রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, গত ১৬ জানুয়ারি যখন একজন চিকিৎসক সুনির্দিষ্ট ওষুধের নাম ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাসহ এই অভিযোগের সপক্ষে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন, তখন তা কেবল রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় থাকেনি, বরং সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর সংশয় ও বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এই অভিযোগের বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে বেগম খালেদা জিয়ার আরেক ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বাংলানিউজকে বলেন, “আমরা বরাবরই বলে এসেছি, বেগম খালেদা জিয়াকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। মিথ্যা মামলায় কারাগারে তাকে দুর্বিষহ সময় কাটাতে হয়েছে। তার যেই চিকিৎসা প্রয়োজন ছিল, সেটা তাকে দেওয়া হয়নি।”

তিনি আরও বলেন, “স্লো পয়জনিংয়ের অভিযোগ তো আমরা বরাবরই করে এসেছি। এর সুষ্ঠু তদন্ত হলেই বের হয়ে আসবে ব্যক্তিগত হিংসার বশবর্তী হয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনা ম্যাডামকে কতটা যন্ত্রণা দিয়েছে, নির্যাতিত করেছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণসমেতই ম্যাডামের মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা অনেক আগে থেকেই এই অভিযোগ করে এসেছেন।”

২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়া যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন তিনি কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক দীর্ঘ লড়াইয়ের নাম। বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. সিদ্দিকীর এই বিস্ফোরক বক্তব্য পুরো পরিস্থিতিকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। বাংলাদেশের হাজারও সাধারণ মানুষ আজ জানতে চায়, ২৭ বার আবেদন করার পরও তাকে বিদেশে যেতে দেওয়া হলো না কেন? কেন লিভারের প্রাণঘাতী ক্ষত লুকিয়ে রাখা হলো? মেথোট্রেক্সেট কি আসলেই তাকে মারার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল?

এই প্রশ্নের উত্তরগুলো কেবল একটি স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব। ইতিহাসের পাতায় বেগম খালেদা জিয়া হয়তো একজন আপসহীন নেত্রী হিসেবে অমর হয়ে থাকবেন, কিন্তু তার এই অকাল মৃত্যু এবং চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীকে ইতিহাসের কঠিনতম কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। ন্যায়বিচারে বিলম্ব মানেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া, ডা. সিদ্দিকীর এই শেষ কথাটিই এখন বেগম খালেদা জিয়াকে ভালোবাসা প্রতিটি মানুষের মনের কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।